সংস্করণ
Bangla

দরিদ্র মানুষের কাছে দাতাকর্ণ ৭৭ বছরের পরিতোষ

17th Mar 2016
Add to
Shares
8
Comments
Share This
Add to
Shares
8
Comments
Share

দান চাইলেই ‌উপু‌ড়হস্ত বেলেঘাটার পরিতোষ কুমার রাহা। সে নগদ টাকাই হোক কিংবা একটি অ্যাম্বুল্যান্স অথবা হুইলচেয়ার কিংবা হাসপাতালের ওয়ার্ডে রোগীর খাটবিছানার মতো দাবি। যাই হোক না কেন, পরিতোষ‌বাবুর কাছ থেকে দান চাইতে এসে এপর্যন্ত কারুক্কেই খালি হাতে ফিরে যেতে হয়নি। চাইলেই তিনি দেন। তবে পরিতোষবাবুর কাছে এমন কিছু চাইতে হবে যাতে দরিদ্র বা অসহায় মানুষ সত্যিকারের উপকৃত হন। বহু বছর হয়ে গেল পরিতোষবাবুর এই দান করার প্রবৃত্তি। দানবাবদ বছরে অন্তত আট-দশ লাখ টাকা খরচ করেন তিনি।

image


পরিতোষবাবু পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তিন ছেলেমেয়েরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সকলেই সুখী আছেন। তবে স্ত্রী নীলিমা রাহা কয়েক বছর আগে মারা গিয়েছেন। স্বামীর দানধ্যান নিয়ে তাঁরও কখ‌নও কোনও আপত্তি ছিল না। এখনও প্রায় প্রত্যেক দিনই কেউ না কেউ এসে পরিতোষবাবুর কাছে হাত পাতেন। পরিতোষবাবু বললেন, আগে অনেক মানুষকে নগদ টাকাও দিয়েও সাহায্য করেছি। পরে কেউ কেউ ধরা পড়ে গিয়েছেন, যাঁরা মিথ্যে বলে আমার কাছ থেকে দান আদায় করেছেন। এখন আর কাউকে তাই নগদ টাকা দিই না। কাজের জিনিস কী লাগবে‌ তার ফর্দ দিতে বলি। তারপর লোক দিয়ে কিনে দিই।

এভাবে পরিতোষবাবু যে এপর্যন্ত কত টাকা দান করেছেন, তার কোনও ইয়ত্তা নেই‌! কলকাতার বহু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা যারা দুঃস্থ মানুষের জন্য কাজ করেন, তাঁদের অর্থসাহায্য করা ছাড়াও পরিতোষবাবুর দানের তালিকায় রয়েছে ক্লাব, সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ইত্যাদি। এলাকায় তাঁর পরিচয় দাতাকর্ণ পরিতোষ নামে। তবে এই দানের নেপথ্যে অন্য এক কাহিনিও আছে। সে কাহিনি আত্মজৈব‌নিক। ওঁর মুখ থেকেই শোনা গেল সেই গল্প।

বাংলাদেশের বরিশালে জন্ম পরিতোষবাবুর। বাবা হেড ক্যাশিয়ারের চাকরি করতেন। দেশটা যে আচম্বিতে ভাগ হয়ে যাবে, তা অনেকের মতো অকল্পনীয় ছিল পরিতোষবাবুর বাবারও। ফলে, দেশভাগের পর অনেকগুলি নাবালক সন্তানকে নিয়ে প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় বাবা-মা-ভাইবোনেদের সঙ্গে উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন পরিতোষবাবু। বললেন, দেশভাগের পরে বাবার মনটা একেবারেই ভেঙে গিয়েছিল। এপারে এসে কাজকম্মো তেমন কিছু জোটাতে পারেননি। ফলে, মা, ভাইবোনেদের সঙ্গে কৈশোরে দারিদ্রের জ্বালা ভোগ করেছেন।

পরিতোষবাবুর কথায়, ওই বয়সেই সঙ্কল্প করেছিলাম, যদি কখনও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, তাহলে গরিব মানুষের জন্যে কিছু কাজ করব, যাতে ওঁরা উপকৃত হন। কীভাবে কাজটা করব স্কুলে পড়াকালীনই তার একটা প্ল্যান তৈরি করেছিলাম। ঠিক করেছিলাম, জীবনে যা রোজগার করব, তার ১০ শতাংশ দান করব।

পরিতোষ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। পাশাপাশি অত্যন্ত উদ্যোগী ধরনের পুরুষ। স্কুল ফাইনাল পা‌শ করার আগেই মাথায় ঢুকে গিয়েছিল, দারিদ্রের পাশ থেকে যত শীঘ্র সম্ভব মুক্ত হতে হবে। তবে সততাকে বিসর্জন দেব না। স্কুল ফাইনালের পরে সরকারি বৃত্তি পেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন কলকাতায়। তারপর নিজের ব্যবসাবুদ্ধি কাজে লাগাতে দুজন সহযোগীর সঙ্গে কারখানা খোলেন। পরিতোষবাবু জানালেন, বাঙালির ব্যবসা না হওয়ার প্রধান কারণ হল- বাঙালি জাতটা আসলে কাঁকড়ার মতো। কেউ ওপরে উঠলেই তাঁকে টেনে নামাবে। কারখানাটা চালাতে গিয়ে ঠকলাম। আর্থিকভাবেও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম। পরে ব্যবসাটা কষ্ট করে দাঁড় করিয়ে ফেলি। আমায় আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

সার্ভেয়ারের কাজের একটি কোম্পানির মালিক পরিতোষবাবু। কলকাতায় মেট্রো চলাচলের নেপথ্যে তাঁর কোম্পানির অবদান রয়েছে। জমি মাপার কাজটা করেছেন ওঁরা। পরিতোষবাবু জীবনে প্রথম রোজগার করেছিলেন ৪০ টাকা। সঙ্কল্পমতো তার ১০ শতাংশের হিসাবে ৪ টাকা জমিয়েছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে রোজগার বেড়ে লক্ষ লক্ষ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। পরিতোষবাবুর কথায়, আমি জানতাম আমার মোট রোজগারের ১০ শতাংশ টাকা আমার নিজের নয়। ও টাকাটা গরিব মানুষের। সঞ্চয়ের ওই টাকায় আমি কখনও হাত দিইনি।

১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত এভাবে টাকা জমিয়েছেন একটি বড়সড় বাজারের ব্যাগে। সেইসঙ্গে পরোপকারও চলছিল। স্ত্রী নীলিমাদেবীর পরামর্শে একদিন ওই বাজারের ব্যাগ উপুড় করে স্বামী-স্ত্রী মিলে সারা রাত টাকা গুনলেন। দেখা গেল, প্রায় সাত লক্ষ টাকা জমেছে। ও টাকাটা ডাকঘরে রাখতে গিয়েছিলেন। পরিতোষবাবুর মনে আছে, একসঙ্গে অত টাকা দেখে ডাকঘরের কর্মীরাও খুব অবাক হয়েছি‌লেন। এরপর ও টাকাটা ক্রমান্বয়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

কয়েক বছর আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পরে নীলিমাদেবীর আলমারি থেকে নগদ আরও প্রায় সাত লক্ষ টাকা মেলে। পরিতোষবাবু বললেন, আসলে ওঁকে যে টাকাটা হাতখরচ হিসাবে দিতাম, তা নীলিমা খরচ করত না। তাতে নীলিমাকে দেওয়া হাতখরচের টাকা ও আগে জমানো টাকার যোগফল দাঁড়ালো প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা।

ছেলেমেয়েরাও কখনও বাবার এই বিপুল দানের স্বভাব নিয়ে আপত্তি জানাননি। বরং ব্যাপারটা তাঁদের কাছে যেন শিক্ষণীয়। পরিতোষবাবু বলছিলেন, অনেকেই আমায় ঠকিয়ে টাকা আদায় করেছে। তাই ছেলেরা বলল, ৪০ লক্ষ টাকা দিয়ে মায়ের নামে একটা সোসাইটি করো। সোসাইটির মাধ্যমে দান করাটা নিরাপদ। সেইমতো তৈরি করা হয়েছে লেট নীলিমা রাহা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি।

আশি বছরের ‌বছরের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন পরিতোষ কুমার রাহা ওরফে বেলেঘাটার দাতাকর্ণ। নিজে বহু লড়াই লড়ে দারিদ্রকে পরাস্ত করে জীবনযুদ্ধে একজন জয়ী সেনাপতি তিনি।

দাতাকর্ণ জানালেন, সদিচ্ছাই তাঁকে মানুষের মতো মানুষ হতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

এলাকায় মানুষও পরিতোষবাবুকে নিয়ে গর্বিত। হাতের কাছে অ্যাম্বুল্যান্সই হোক কিংবা শববাহী গাড়ি অথবা দরিদ্র মানুষজন টাকার অভাবে চশমা কিনতে না পারলে কিংবা অর্থাভাবে মেয়ের বিয়ে আটকে গেলে, পরিতোষবাবুর দান করা টাকায় সমস্যা মিটে যাচ্ছে।

তবে অনেক ঠকার অভিজ্ঞতায় আর কাউকে নগদ দিতে রাজি নন দাতাকর্ণ। তাঁর উপ‌লব্ধি, বেশিরভাগ মানুষই টাকার ব্যবহার জানেন না। ফলে নষ্ট হয় টাকার মতো দামী এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। 

Add to
Shares
8
Comments
Share This
Add to
Shares
8
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags