সংস্করণ
Bangla

চৌষট্টি খোপের দুনিয়ায় রাজা হতে চান দীপ্তায়ন

Sukhendu Sarkar
2nd Apr 2016
Add to
Shares
4
Comments
Share This
Add to
Shares
4
Comments
Share

বয়স মাত্র সতেরো বছর। বাংলার কনিষ্ঠতম গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে নজির গড়েছে ছেলেটা। নাম দীপ্তায়ন ঘোষ। ভিয়েতনামে এইচডি ব্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল চেস টুর্নামেন্টে তৃতীয় তথা শেষ নর্ম পেয়ে বাংলার সপ্তম গ্র্যান্ডমাস্টার দীপ্তায়ন। ২০১৩ সালে দুবাই এবং ২০১৫ সালে চেক প্রজাতন্ত্রে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার প্রথম ও দ্বিতীয় নর্ম পেয়ে যায় সাউথ পয়েন্ট স্কুলের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া এই দাবাড়ু। হালতুর ফ্ল্যাটে মুখোমুখি বসে (দাবার বোর্ড ছিল না) অজানা অচেনা দীপ্তায়নকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু দীপ্তায়নের জীবন সাদা-কালো ৬৪ খোপের বৃত্তেই আবর্তিত।

image


ছোট্ট থেকেই বড্ড ঘরকুনো। দীপ্তায়নের শিশু মন কখনও ব্যাট-বল কিংবা ফুটবলকে আকৃষ্ট করেনি। তখন ও নার্সারিতে পড়ে। ঠাকুমা ঝর্না ঘোষের সঙ্গে দাবা খেলত ও। ঠাকুরমার ঝুলি ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি কিংবা পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্রের গল্প ওকে টানত না বরং টানত রাজা-প্রজাদের নিয়ে হাতি-ঘোড়া-নৌকো নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। সতেরোর দীপ্তায়নের দীপ্ত চোখে জবাব, ‘মাইন্ডগেম ভালোবাসতাম’। ঠাকুমার কাছেই দাবার হাতেখড়ি দীপ্তায়নের। বলা ভালো দাবার A B C D শেখা। সেই শুরু। তখন অবশ্য পড়ার ফাঁকে দাবা খেলা হত। দাবার বোর্ডে ছেলের এমন আকর্ষন দেখে লেকটাউন কালচারাল চেস অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দিলেন বাবা সন্দীপ ঘোষ। কিন্তু সাউথ পয়েন্টে ভর্তি হতেই দমদম থেকে দীপ্তায়নদের ঠিকানা বদলে হল হালতু। আর দাবা শেখার পাঠশালাও তখন বদলে গেল গোর্কি সদনের অ্যলেখিন চেজ ক্লাব। তখন ২০০৪। 

অভিজিৎ মজুমদার, নীলাদ্রি বিশ্বাসদের তত্বাবধানে তখন দাবার পাটিগণিত শেখা চলছে। অ্যালেখিন চেস ক্লাবের গুডরিক চেজ অ্যাকাডেমি থেকে দাবার বীজগণিত, জ্যামিতি, পরিমিতি, ত্রিকোনমিতি থেকে ম্যাট্রিক্স শেখা দীপ্তায়নের। দাবার গানিতিক পাঠ নিতে নিতেই ২০০৭ এ জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। ২০০৮ এ তেহরান আর ২০০৯ এ দিল্লিতে ইয়ুথ চেস চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সকলের নজরে তখন ক্ষুদে দাবাড়ু দীপ্তায়ন৷ ২০১২ তে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার হওয়ার পরেই দীপ্তায়নের সামনে তখন গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার হাতছানি। হাতছানি নয়, বলা ভাল স্বপ্ন দেখা শুরু। স্কুলের পড়ার সঙ্গে সমান তালে তাল রেখে প্রথমে প্রয়াত শঙ্কর রায় ও পরে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার রক্তিম বন্দ্যোপাধ্যায়ের তালিমে এগিয়ে চলল দীপ্তায়ন।২০১৩ তে দুবাইয়ে গ্র্যান্ড মাস্টারের প্রথম নর্ম সহজে পার করলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় নর্ম পেতে একটু সময় লেগে গেল। দীপ্তায়ন নিজেই বলছিল, ‘‘অনেক আগেই গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ছোটখাট ভুলের জন্য সেটা হচ্ছিল না।২০১৪তে বেশ কয়েকটা নর্ম পাওয়ার সুযোগ ফস্কেছিলাম। তারপর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য সে ভাবে মন দিতে পারিনি দাবায়।’’ তাই তো উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর সাত দিনের প্রস্তুতি নিয়েই ভিয়েতনামে সাউথ ইস্ট এশিয়ার সবচেয়ে কঠিন টুর্নামেন্টে কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ন হয় দীপ্তায়ন। সাফল্যের সেই মুহূর্তে বাবা-মা র সঙ্গ খুব মিস করেছে। কথাগুলো বলার সময় দীপ্তায়নের উজ্জ্বল চোখ বলে দিচ্ছিল আরও অনেক কথা।

পড়াশোনা-দাবার বাইরে আর কী কী পছন্দ দীপ্তায়নের? অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেত চায়। টার্গেট সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ। ভবিষ্যতে অধ্যাপনা বা শিক্ষকতায় মন সায় দেয় না। দীপ্তায়ন চায় গবেষনামূলক কিছু কিংবা ইকোনমিক্যাল অ্যানালিস্ট হতে। দাবার বাইরে ক্রিকেট কিংবা ফুটবল খেলা না হলেও মন দিয়ে টিভিতে ক্রিকেট আর ফুটবল দেখে। প্রিয় ক্রিকেটার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট আর সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। তাই তো একবার মহারাজের থেকে পুরস্কার নিতে যাওয়ার সময় মন উতলা হয়ে উঠেছিল। এখন অবশ্য দীপ্তায়ন মজে বিরাট কোহলিতে। পছন্দের ফুটবলার অবশ্য ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, আর প্রিয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ । অনলাইন চেজের সঙ্গে তাই ফিফাগেম নিয়ে বেশ জমিয়ে পিসি-র সামনে বসে পরে দীপ্ত। শার্লক হোমসের রহস্যরোমাঞ্চে পাতা উল্টে মগজাস্ত্রে শান দিয়ে নেয় সে। অরিজিৎ সিংয়ের গান আর মিশন ইম্পসিবলের মতো মুভি জমিয়ে দেখে। মা (অরুনা ঘোষ)চাঁদের পাহাড় দেখার কথা বললে নাক সিটকায়। দুধে-ভাতে, মাছে-ভাতে লালিত দীপ্তায়নের পছন্দের তালিকায় প্রথমেই বাঙালি খাবার। তার পরেই আসে চাইনিজ। তবে চকোলেট আর কোল্ড ড্রিঙ্কসের পোকা। থাম্বস আপের তুফানি চুমুকে রিফ্রেশমেন্ট। “খেতে বড্ড ভালোবাসি”, নিজেই হাসতে হাসতে বলছিল দীপ্তায়ন। মনখারাপের বিকেল বলে কিছু নেই ওটা তো বোরের চাল।

এসব বলতে বলতেই ফিরে এল দাবার প্রসঙ্গ। তেহরানে ইয়ুথ চেস চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বিশ্বনাথন আনন্দের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল সেই গল্পে। দীপ্তায়নের আইডল অবশ্য নরওয়ের ম্যাগনাস কার্লসেন। কঠিন গেমে যখন চাপে পরে যায় তখন দীপ্তায়ন কিভাবে মনোসংযোগ করে জানেন? এখন আর চাপ মনে হয় না, অভ্যাস হয়ে গেছে। না হলেই আদ্যা মায়ের শরনাপন্ন হয়। স্কোর শিটেও লেখা থাকে আদ্যা মায়ের নাম। মনোসংযোগ বাড়াতে তাই নিয়ম করে রোজ মিনিট দশেক আদ্যা মায়ের সামনে মেডিটেশন। আদ্যা মা যেন দীপ্তায়নের জিওনকাঠি। লক্ষ্যে স্থির। টার্গেট যত দ্রুত সম্ভব রেটিং (২৫৬১) বাড়ানো। রেটিং পয়েন্ট ২৬০০ করতে হবে তাড়াতাড়ি। আত্মবিশ্বাসী দীপ্তায়ন। বলছে, এগিয়ে যেতে হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিকে ........... শেষে জানতে চেয়েছিলাম মনের মানুষ কেউ আছে কিনা ? লাজুক হাসি আর ছোট্ট উত্তর, “চেকমেট” !!! 

Add to
Shares
4
Comments
Share This
Add to
Shares
4
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags