সংস্করণ
Bangla

মধুময় মধুরার সঙ্গে আলাপ ও বিস্তার

Bidisha Banerjee
9th Mar 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

টেলিভিশন হোক বা বড়পর্দা, আপনার রোজকার জীবনে যাঁদের আনাগোনা লেগেই থাকে তাঁদের মধ্যে ইনি একজন। এই মুহূর্তে বাংলা টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিকগুলির অধিকাংশের নেপথ্যেই এঁর কণ্ঠ রয়েছে। 'আরশিনগর', 'কী করে তোকে বলব', বা 'তুই যে আমার' এর মতো সদ্য মুক্তি পাওয়া ছবিগুলিতেও নায়িকাদের হয়ে প্লেব্যাক ইনিই করেছেন। মধুরা ভট্টাচার্য। যার কণ্ঠের মধুরতা নিয়ে আমাদের নতুন করে কিছুই বলার নেই।

ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে কেরিয়ার - সব দিক থেকেই এপ্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় এবং প্রতিভাবান এই শিল্পীকে আরও খানিকটা কাছ থেকে চেনার চেষ্টা করল ইওর স্টোরি।

image


ইওর স্টোরি : তোমার ছোটবেলা কেমন কেটেছে? সঙ্গীত জগতের হাতেখড়ি কীভাবে?

মধুরা : আমার ছোটবেলা নিয়ে বলার মতো বিশেষ ঘটনা নেই। খুব শান্তশিষ্ট ছিলাম। ইন্ট্রোভার্ট। এখনও সেটা আছি যদিও। সঙ্গীত আমার শিরা, ধমনিতে বলা যায়। গানের পরিবেশেই বেড়ে ওঠা। মা-এর কাছে প্রথম সঙ্গীতের হাতেখড়ি। আধো আধো কথা বলা আর গান একই সময়ে। মা যখন রেয়াজ করতেন, আমি হারমোনিয়াম বা তবলার উপর বসে থাকতাম! দাদু খুব ভালো গাইতেন। এখন বয়স হওয়ায় আর তেমন গাইতে পারেন না। মা-এর ঠাকুমা শ্রীমতি শান্তিময়ী দেবী সেই সময়েও খুব আধুনিক ছিলেন। নিজে লিখতেন, সুর করতেন এবং গাইতেন।

ইওর স্টোরি : অনেকেই হয়তো জানেন না, ছোটবেলা থেকেই তোমার নাম মধুরা তা নয়। কয়েক বছর আগে নিজের নাম পরিবর্তন করে তুমি মধুরা রাখার সিদ্ধান্ত নাও। ঠিক কী কারণে এই সিদ্ধান্ত? নাম বদলের সাথে সাথে ব্যক্তি মধুরার মধ্যে কোনও পরিবর্তন এসেছে কী?

মধুরা : নাম বদলের সিদ্ধান্তটা আসলে হঠাৎ-ই নেওয়া। আমার এক শুভাকাঙ্খী আমাকে নাম পরিবর্তনের বিষয়টা বলেন। তিনি নিজেও তাঁর নাম পাল্টেছিলেন। আমার বিষয়টা বেশ ভালো লেগে যায়। তারপরই নাম বদলের সিদ্ধান্ত। তবে এটা আমার জীবনের অন্যতম বড় একটা সিদ্ধান্ত। এবং এটা নিয়ে আমার একটা ভালো লাগা আছে। নিজের নাম কজনই বা নিজে রাখার সুযোগ পায় ! সেদিক দিয়ে আমি ভাগ্যবান। তবে আমার প্রথম নামের মতোই এই নামটাও মা-বাবাই রেখেছে।

আর তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নটার ক্ষেত্রে বলব, 

মানুষ তো পাল্টায় না, চিন্তাভাবনাগুলো পাল্টায়। তবে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক এবং আত্মবিশ্বাসী আমি। আমি সবসময়ই খুব চাপা স্বভাবের, তবে এখন নিজের প্রয়োজন বা প্রাপ্যের কথাটা নিজের মুখে অন্তত বলতে পারি। আগে স্টুডিওয় খিদে পেলে সেটাও মুখ ফুটে বলতে পারতাম না। এখন সেটা পারি।

ইওর স্টোরি : সঙ্গীত, গানবাজনা এ তো তোমার রক্তে রয়েছে। সেটাই কী পেশা হিসেবেও মিউজিক বেছে নেওয়ার কারণ?

মধুরা : গান আমার নেশা। সেখান থেকে পেশা হিসেবে নেওয়াটা ছোটবেলার স্বপ্ন বলা যায়। তখন অত বুঝতাম না। স্বপ্ন ছিল পর্দার পিছনে যে গান হয় (প্লেব্যাক) সেটা গাইব। তার সাথে অবশ্যই বাবা মা এবং দিদিভাইয়ের সাপোর্ট। 

কখনও কোনও কিছুতে জোর করেনি ওরা। সবসময় উৎসাহ জুগিয়েছেন। সেই কারণেই ক্লাস টেন থেকে এমএ পর্যন্ত টানা আটবছর নিজের পড়াশুনো এবং পেশা একসঙ্গে চালিয়ে যেতে পেরেছি। রেজাল্ট ও খুব একটা খারাপ হয়নি। গ্র্যাজুয়েশেন এবং মাস্টার্স এ ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি সবার আশীর্বাদে।

ইওর স্টোরি : ইন্ডিয়ান আইডল-এর মতো জনপ্রিয় শো থেকে প্রথম দশ-এ পৌঁছনোর আগেই বাদ পড়ে গিয়েছিলে। কোথাও মনোবল ধাক্কা খায়নি? এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যাঁরা এধরণের রিয়্যালিটি শো থেকে ছিটকে গিয়ে আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন নি। তাঁদেরকে কী বলবে?

মধুরা : হ্যাঁ। তখন আমি ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। অনেক ছোট ছিলাম। তখন একটু খারাপ লেগেছিল ঠিকই, তবে এখন তার বিন্দুমাত্র নেই।

 ২০০৭ সালে আমাকে না নেওয়ার কারণ হিসেবে উদিত জী (উদিত নারায়ণ) বলেছিলেন,"তোমার বয়সটা আসলে খুব কম। সেই কারণেই..." 

আমার বদলে পাঞ্জাব থেকে একটি মেয়েকে নেওয়া হয়েছিল। সে আমারই বয়সী, সেই রাউন্ডে গাইতে গাইতে গানের কথা ভুলে গিয়ে কাঁদতে শুরু করছিল বেচারি।

image



তবে মজার ব্যাপার, সিনেমায় আমার প্রথম প্লেব্যাক উদিত জী-র সঙ্গেই 'মহাকাল' ছবিতে। আমার গান শুনে মুম্বাই থেকে ফোন করে আশীর্বাদ করেছিলেন অনেক। ওটাই তখন আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। এতো কথা এই কারণেই বললাম, যে একটা প্রতিযোগীতায় না জেতা সাময়িক দুঃখ দিলেও, থেমে যেতে নেই কখনওই।

ইওর স্টোরি : সিরিয়াল, মেগাসিরিয়াল থেকে শুরু করে আজকের সিনেমায় প্লেব্যাক। প্রথম প্লেব্যাক থেকে শুরু করে এই পুরো মিউজিক্যাল জার্নিটা মধুরার কাছে ঠিক কী রকম?

মধুরা : ২০০৫-এ 'বহ্নিশিখা' নামের একটি সিরিয়ালে আমার প্রথম প্লেব্যাক। পরিচালক দেবাংশু দাশগুপ্ত এক জায়গায় আমার গান শোনেন। তারপরই ওনার ধারাবাহিকে দেবজিৎ রায় এর সুরে গান গাই প্রথম। তাও মাধ্যমিক-এর টেস্ট পরীক্ষা শুরুর দু-দিন আগে। সেই থেকে এম.এ. পর্যন্ত পরীক্ষার সঙ্গে আমার গানের রেকর্ডিং বা অনুষ্ঠানের বিশেষ যোগ ! সবসময় একসঙ্গে সব পড়ত। আর আমি বেশ মজাও পেতাম।

তবে এই পুরো জার্নিটা খুব সহজ ছিল না। এখনও নয়। তার কারণ ৪৬-৪৭ টা সিরিয়ালে প্লেব্যাক সত্ত্বেও সিরিয়ালে গায়ক-গায়িকার নাম না দেওয়া বা শুরু এবং শেষে টাইটেল সং না বাজানোর রীতি চালু হওয়ায়, খুব বেশি মানুষ গায়ক বা গায়িকাদের চেনেন না। গানগুলি চিনলেও কে গেয়েছে সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জানতে পারেন না। অনেকটা সেভাবেই প্রায় ৩৩-৩৪টি ছবিতে গান গাওয়া সত্ত্বেও 'আরশিনগর'- এর পর "এটাই কী তোমার প্রথম সিনেমায় গাওয়া গান?" এই প্রশ্নটা এখন একটু কমেছে (হাসি)।

ইওর স্টোরি : সিঙ্গার নয়, মানুষ হিসেবে আমরা তোমাকে অত্যন্ত নম্র, মৃদুভাষী এবং অবশ্যই বিনয়ী বলেই জানি। এতটা পথ এত সাফল্যের সঙ্গে পেরিয়ে এসেও মধুরা মাটির এত কাছের মানুষ কী করে?

মধুরা : কোথায়! এখানে তো আমি কত কিছু বলে ফেললাম! না, আসলে আমি এরকম বহু বিখ্যাত মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি, যাঁরা নিজেরাই এক একজন নাম। আমি তো কিছুই না। তাঁদের কাছ থেকেই শেখার চেষ্টা করি।

প্রত্যেকটি মানুষকে সম্মান করা এবং ভালোবাসা - এটাই নিজের ভালো থাকা এবং সকলকে ভালো রাখার জন্য যথেষ্ট।

ইওর স্টোরি : গান গাওয়ার স্বপ্ন তো পূরণ হয়েছে। কিন্তু এমন কোনও স্বপ্ন যা অপূর্ণ থেকে গেছে...

মধুরা : হ্যাঁ, তা আছে। কোনও মানুষ যেন খিদেতে না থাকেন কোথাও। 'ক্ষুধার রাজ্য' যেন না থাকে। 'পূর্ণিমার চাঁদ'-এর সৌন্দর্য যেন সকলে সমানভাবে উপভোগ করতে পারেন। খুব কঠিন একটা স্বপ্ন। জানি না এই স্বপ্ন পূরণ করতে পারব কি না? যারা সত্যি অসহায় তাদের পাশে দাঁড়ানোর যেন সুযোগ এবং সঙ্গতি ঈশ্বর দেন।

ইওর স্টোরি : এমন কোনও ভাবনা বা ধারণা যাতে তুমি বিশ্বাস করো, যা মেনে চলার চেষ্টা করো...

মধুরা : 

Spread Love, Peace & Happiness..সবাই সবাইকে ভালোবাসুক, সবাই সবার পাশে থাকুক। মানুষ মূল্যবোধ ও চেতনা (যা আমরা দিন দিন হারাচ্ছি) ফিরে পাক।

ইওর স্টোরি : আজ তুমি যে জায়গায় পৌঁছেছো, তার জন্য কাদের ধন্যবাদ দিতে চাইবে? আর সব শেষে জানতে চাইব আমাদের এপ্রজন্মের পাঠকদের জন্য মধুরার বার্তা কী?

মধুরা : মা, বাবা, দিদি ও প্রিয় বন্ধুদের এবং সমস্ত শুভাকাঙ্খীদের আশীর্বাদ ও ভালোবাসা পেয়ে আমি ধন্য। 

যাঁরা আমার শুভাকাঙ্খী নন, তাঁদেরকেও অনেক ধন্যবাদ...এই পৃথিবীতে আমাকে এগোতে শিখিয়েছেন তাঁরা।

আর আমার ছোট ভাই-বোনেদের বলতে চাই, সঙ্গীতকে নিয়ে বাঁচতে হলে ভালোভাবে শিখে যাওয়াটা খুব জরুরি...এবং অবশ্যই প্রতিদিন রেওয়াজ কোরো...আর খুব ভালো থেকো।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags