সংস্করণ
Bangla

নীরবতার সুর আঁকেন রন ট্যান

Tanmay Mukherjee
19th Sep 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

পৃথিবী যেন একটু একটু করে শব্দহীন হয়ে আসছে। মনের আনন্দে গান গায় রবিন পাখি, কিন্তু তা কানে এসে পৌঁছয় না। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ কিংবা বর্ষার আকাশে মেঘের হুঙ্কার – সব যেন প্রায় নিঃশব্দ। সুরশিল্পী বিঠোফেন বেশ বুঝতে পারেন যে তিনি বধির হতে বসেছেন। রাতের অন্ধকারে পিয়ানোয় বসে, তিনি ডুব দিলেন কল্পনার জগতে। মনের ক্ষোভ, বিক্ষোভ, হতাশা, বিষাদ, প্রেমের আকুল আহ্বান যেন সুর হয়ে ভেসে বেড়াতে লাগল। জন্ম নিল ‘‘অলৌকিক সিম্ফনি’’। গোটা বিশ্ব যাঁকে চেনে ‘‘মুনলাইট সোনাটা’’ নামে। কিন্তু যে মানুষটা প্রায় বধির, নিজের পিয়ানোর সুর নিজেই শুনতে পাননি ঠিকমতো, তাঁর পক্ষে এমন সিম্ফনি তৈরি করা কী করে সম্ভব? সঙ্গীত রসিকরা এ প্রশ্নের উত্তর আগেও খুঁজেছেন, হয়তো ভবিষ্যতেও খুঁজবেন। কিন্তু যাঁর পিয়ানো বিঠোফেনের স্মৃতি জাগায় বারবার, সিঙ্গাপুরের সেই তরুণ শিল্পী রন ট্যান বলেন, ‘‘কানের থেকে অনেক বেশি শোনে হৃদয়’’।

image


রন জন্ম বধির। শ্রবণ ক্ষমতা কুড়ি শতাংশেরও কম। কিন্তু সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল চাঙ্গি ভিলেজ হোটেলে বসে বছর তেইশের ছেলে যখন নিমগ্ন হয়ে পিয়ানো বাজান, তখন কে বুঝবে সে বধির। হয়তো রন হৃদয় দিয়ে শোনেন। যেমন শুনতেন বিঠোফেন।

পিয়ানো বাজানোর এক ফাঁকে রন শোনাচ্ছিলেন তাঁর জীবনের গল্প। ছোটবেলার নানান হবি, সঙ্গীত প্রেম। না, কেউ তাঁক পিয়ানো শেখায়নি। বরং পিয়ানোর নেশা দেখে অনেকেই বলেছিল ‘‘এটা তোমার কম্ম নয় ছেলে। কানে শুনতে পাও না, পিয়ানো বাজাবে কী করে।’’ বাধ্য হয়ে পিয়ানো সে নিজে-নিজেই শিখেছে। কিন্তু কানে হিয়ারিং এইড, অসুবিধা হয় না বাজাতে? প্রশ্নের উত্তরে রন জানান, ‘‘হিয়ারিং এইড এবং কানে শোনার মধ্যে তফাতটা অনেক।’’ অর্থাৎ, সুরের চড়াই-উতড়াই রনের কানে যতটুকু পৌঁছয়, শ্রোতার কানে পৌঁছয় অনেক বেশি এবং নির্ভুলভাবে। এই তফাতটা বুঝতে লেগে গেল বেশ কয়েকটা বছর। ট্রায়াল অ্যান্ড এরর পদ্ধতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সাফল্য মিলল। রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে চাঙ্গি ভিলেজ হোটেলে পিয়ানো বাদকের কাজও পেলনে রন।

নিজে প্রতিবন্ধী। রন তাই বোধহয় বোঝেন যে, সফল হতে গেলে একজন প্রতিবন্ধীকে ডিঙোতে হয় অদৃশ্য সব হার্ডল। উপহাসের জীবনে তীক্ষ্ণ বাণে হৃদয়ে রক্ত ঝরবে। হতাশা গ্রাস করবে। ‌জীবনের নির্মম যুদ্ধে লড়তে থাকা প্রতিবন্ধী শিল্পীদের প্রচারের আলোয় তুলে আনবার জন্য তিনি গড়লেন ইনক্লুসিভ আর্ট মুভমেন্ট নামের (IAM) সংস্থা। রিপাবলিকান পলিটেকনিকে পড়ার সময় বন্ধুত্ব হয়েছিল মহম্মদ ড্যানিয়েল বিন হামদানের সঙ্গে। রনের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও, ড্যানিয়েল কিন্তু রনের উদ্যোগের শরিক। ‘‘রন প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাবে। কাজ করে। ওর সঙ্গে কাজের সুযোগ পেয়ে আমি প্রতি মুহূর্তে সমৃদ্ধ হই।’’ জানায় ড্যানিয়েল।

সিঙ্গাপুরে বধিরদের সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে রনের সংস্থা। প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রতিভা থাকলে, প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মেলে মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ। রনের কাছ থেকে শোনা গেল এক কিশোরর গল্প। জন্ম থেকে তার হাত দুটো অস্বাভাবিক ছোট। কিন্তু সে ড্রাম বাজাতে চায়। প্রতিবন্ধী ছেলেকে তালিম দিতে চায়নি কোনও স্কুল। সে এল রনের স্কুলে, গুরু রনের পাঠশালায় তালিম নিয়ে সে এখন দক্ষ ড্রাম বাদক। মঞ্চে পারফর্ম করে। মাতিয়ে রাখা শ্রোতাদের।



ফিরে আসা যাক বিঠোফেনর কথায়। জীবনের শেষবেলায় বধির বিঠোফেন নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছিলেন চার দেওয়ালের অন্দরে। আত্মীয়, বন্ধুদের কাছে লেখা চিঠিতে ধরা পড়ত বিষণ্ণতা। পাঠক, পিয়ানোয় মিল থাকলেও রন এবং বিঠোফেনের মধ্যে তুলনা হয় না। হয়তো হবেও না। কিন্তু পিয়ানোয় মগ্ন রনকে দেখে বারবার মনে পড়ছে বিঠোফেনের কথা। মনে হচ্ছে, মৃত্যুর পরও যদি চেতনা অবশিষ্ট থাকত কিছুমাত্র, তবে হয়তো জন্মবধির রনের পিয়ানো শুনে খুশি চলকে পড়ত বিঠোফেনের মুখে। হয়তো তিনি বলতেন, ‘‘কানে না শুনলেও, শুনে নেওয়া যায় হৃদয় দিয়ে’’। সেই হৃদয়ের ক্ষমতায় রনই যেন বিঠোফেন। আবার বিঠোফেনই রন।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags