সংস্করণ
Bangla

দেবীশঙ্করের টালির ঘরেই সুন্দরবন প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র

tiasa biswas
10th Apr 2016
Add to
Shares
5
Comments
Share This
Add to
Shares
5
Comments
Share


ছোটবেলায় পড়তে বসে ইতিহাস বাইটার দিকে চোখ চলে যেত বারবার। বইয়ের লাইনগুলি টেনে নিয়ে যেত মাঠে-ঘাটে, জনপদে যেখানে মাটির নীচে অথবা ওপরে অযত্নে অবহেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস। কুড়িয়ে এনে ঘরে তুলে রাখতেন দেবীশঙ্কর মিদ্যা। মথুরাপুরের কাশীনগরের সরবেড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা দেবীশঙ্করের সেই অভ্যেসেই নিজের ছোট্ট অপরিসর বসতবাড়িতেই গড়ে উঠেছে ‘সুন্দরবন প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র’।

image


জেদটা চেপেছিল মিশন স্কুলে পড়ার সময়ে। একবার প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এলাকার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে নিজের বক্তব্য লিখে হ্যাটা হতে হয়েছিল শিক্ষক, বিচারক এমনকী সহপাঠীদের কাছে। কারণ, বক্তব্যের পক্ষে কোনও প্রমাণ সেদিন দিতে পারেনি স্কুল পড়ুয়া দেবীশঙ্কর। প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টার সেই শুরু। ঐতিহাসিক কঙ্কনদিঘিতে পারিবারিক লাটবাড়ি ও খামারে বেড়াতে এসে ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করা শুরু করলেন তিনি। শুরু হল আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা। ১৯৮৫ সাল থেকে লাগাতার কাজ করে যাওয়া দেবীশঙ্করবাবুর সংগ্রহে আছে বিভিন্ন ধরনের মৃৎ পাত্র, জলনালীযুক্ত পাত্র, লিপি-খোদাই করা পাত্র, হাতির শুঁড়ে ধরা পদ্মফুল-সহ ঢাকনাযুক্ত পাত্র, পেয়ালা-মাপক-অর্ঘ্য-ধুনুচি-প্রদীপ, অসংখ্য মুণ্ডমূর্তি, পক্ষীচঞ্চু-যুক্ত নারী মূর্তি, বিচিত্র ধরনের পশুপক্ষীর মূর্তি, শিশু কোলে মাতৃকা মূর্তি, পাথর-শিং-হাড়ের হাতিয়ার, পোড়ামাটির যন্ত্রপাতি। মাকু, বিভিন্ন পাথরের পুতি, সিলমোহর, মুদ্রা, উদ্ভিন্নযৌবনা যক্ষিণীর মূর্তি-সব মিলিয়ে বিরাট সম্ভার।

স্কুলজীবন থেকে নিজের এলাকার ইতিহাসের খোঁজ নিতে শুরু করেছিলেন নেহাতই কৌতূহলবশত। সেই কৌতূহলই এক সময়ে নেশা হয়ে দাঁড়ায়। চারদিকে অবহেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা রাজ্যের অমূল্য প্রত্নসম্পদ ও সংস্কৃতির নিদর্শন সংগ্রহ করে নিজের বাড়িরই অপরিসর ঘরে ‘সুন্দরবন প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র’ গড়ে তুলেছেন দেবীশঙ্কর মিদ্যা। যেখানে স্থান পেয়েছে কয়েক হাজার প্রত্নবস্তু। সরকারিভাবেও সে সব নিবন্ধীকৃত। যার ভিত্তিতে প্রাচীন বঙ্গের অবস্থান ও তার সংস্কৃতির রূপরেখা নির্ণয়ে গবেষণার ফলে ইতিহাসের নবদিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। কেন্দ্রটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী গবেষণা কেন্দ্র হিসাবে কাজ করছে।

বাড়ির তিনতলায় টালির ছাদের তলায় দু’টি ঘরে রয়েছে ওই প্রত্নসামগ্রী। অকৃতদার দেবীবাবু বলেন, ‘তাপ, আর্দ্রতা ও নোনা বাতাসে বস্তুগুলির ক্ষয় হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ঔজ্জ্বল্য, রং। ভয় রয়েছে চুরির। সরকারি ভাবে অর্থ সাহায্য না পেলে যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ সম্ভব নয়। কিন্তু বারবার আবেদন করেও কিছু পাইনি’। এক সময়ে নিজের জমিতে সরকারি অর্থে সংগ্রহশালা ও গবেষণাকেন্দ্র গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। পেয়েছিলেন আশ্বাস। কিন্তু অর্থ পাননি।

দেবীশঙ্করবাবুর কথায়, ‘শুধু জেলা নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রত্ন গবেষকদের সঙ্গে সেতু রচনা করে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমার এই সংগ্রহেই প্রমাণিত, সুন্দরবন প্রত্নতত্ত্বে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী অঞ্চল। এর সংস্কৃতি প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা’। মিদ্যা জানান, এই কেন্দ্রের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন বাংলার বাইরের গবেষকেরাও।

image


২০০৮ সালে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজ্য সরকারের কাছ থেকে সংবর্ধিত হয়েছেন দেবীশঙ্করবাবু।কয়েক হাজার বছরের অসাধারণ বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রত্নসম্পদ ওঁর সংগ্রহে আছে। অনেক প্রত্ন সামগ্রী তিনি সরকারের হাতেও তুলে দিয়েছেন। প্রতিটি প্রত্নবস্তু নিয়ে তাঁর গবেষণালব্ধ তত্ত্ব-তথ্য-ব্যাখ্যা ইতিহাস চর্চায় গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে দুই ২৪ পরগনার আদি ঐতিহাসিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ইতিহাসের নানা তথ্য উঠে এসেছে দেবীশঙ্করবাবুর গবেষণায়।

বেহালা মিউজিয়ামে রয়েছে তাঁর সংগ্রহ করা অনেক প্রত্ন সামগ্রী। দেবীশঙ্করবাবুর স্বপ্ন, সরকারি সাহায্য পেলে তিনি নবকলেবরে সংগ্রহশালা গড়ে গবেষক ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করবেন। কালের গ্রাসে হারিয়ে যাওয়া এইসব ইতিহাস টেনে আনবে পর্যটকদেরও।

Add to
Shares
5
Comments
Share This
Add to
Shares
5
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags