সংস্করণ
Bangla

দরিদ্রের পাশে সুফিয়ার সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

25th Aug 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
সুফিয়া খাতুন

সুফিয়া খাতুন


সালটা ২০১২, সোশ্যাল নেটওয়র্কিংএ স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছে ভারত, সেই সময়ই এক বৃ্দ্ধাকে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখে ফেসবুকের দেওয়ালে তুলে দিয়েছিলেন সুফিয়া খাতুন। সাড়া মিলেছিল আশাতীত। দুঃস্থ সেই বৃদ্ধাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন ফেসবুকের চেনা অচেনা বন্ধুরা। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর এহেন ক্ষমতা ভাবাচ্ছিল সুফিয়াকে, আর এই ভাবনা থেকেই জন্ম ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড, আওয়ার ইনিশিয়েটিভ’-এর। দরিদ্র প্রান্তিক পরিবারের শিশু ও বৃদ্ধদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়াই প্রাথমিক লক্ষ্য।

“বর্তমানে সবাই খুব ব্যস্ত, কিন্তু পাশের মানুষটার জন্য, গরীব দুঃস্থ মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছেটা কিন্তু রয়েছে। সময় বা যোগাযোগের অভাবে করা হয়ে ওঠেনা। ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড, আওয়ার ইনিশিয়েটিভ’-এ এই যোগাযোগ স্থাপনের কাজটাই আমরা করি। সমাজের নানা অংশের, নানা পেশার মানুষ আমাদের এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা তাঁদের সময় সুযোগ অনুযায়ী কোনও নির্দিষ্ট উদ্যোগে যুক্ত হন, আবার ফিরে যান নিজের কর্মজীবনে। আমাদের মধ্যে রযেছেন আইনজীবী, চিকিৎসক, ছাত্র, কর্পোরেট চাকুরে, গৃহবধূ, অবসরপ্রাপ্ত প্রৌঢ়প্রৌঢ়া সকলেই। আর এই পুরো যোগাযোগটা হয় ফেসবুকের একটি পাতার মাধ্যমে,” জানালেন সুফিয়া।

কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে সেই কথা জানিয়ে দেওয়া হয় ফেসবুকের পাতাটিতে। ইচ্ছুক ব্যক্তিরা যোগাযোগ করে যুক্ত হতে পারেন একটি নির্দিষ্ট উদ্যোগের সঙ্গে। ভলান্টিয়ার নিয়োগ থেকে আর্থিক অনুদান সংগ্রহ, পুরো কাজটাই পরিচালনা করেন সুফিয়া নিজে।

বছর ১২-এর অঞ্জলির ঠিকানা দক্ষিণ কলকাতার একটি ঘিঞ্জি বস্তি। স্থানীয় একটি স্কুলে পড়াশোনা। আর্থিক অবস্থার কারণে পড়াশোনাটুকু চালিয়ে যাওয়াই কঠিন। “আমরা নানা ছোট ছোট খেলা খেলেছিলাম দিদির কাছে, খেলতে খেলতেই অনেক কিছু শিখে গেছিলাম, ডাক্তারবাবুরাও এসেছিলেন আমাদের কর্মশালায়, কীভাবে নিজের খেয়াল রাখব, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকব শিখিয়েছিলেন। সিঙ্গাপুর থেকে একজন এসেছিলেন, আত্মরক্ষার ট্রেনিং দিতে। আগে পড়তে পারতাম না ভাল করে, এখন পারি,” হাসি মুখে জানাল অঞ্জলি। কী করতে সবচেয়ে বেশি ভাললাগে? খানিক থমকাল অঞ্জলি, তারপরই লাজুক মুখের জবাব, “ছবি আঁকতে, আগে তো খাতা রং কিনতে পারতাম না, এখন দিদি দেয়, আঁকার ক্লাসও হয়”।


image


কাজটা সহজ ছিলনা। কিছু একটা করতে হবে, অভাব, অনটন, দারিদ্র্যের মধ্যে দিন গুজরান করা মানুষগুলোর জন্য, এটুকুই ছিল ভাবনা। “কাজটা শুরুর সময় কীভাবে কী করব কিছুই জানতাম না, বলতে পারেন খানিকটা আবেগের বশেই শুরু করা। একটা বিশ্বাস ছিল, উদ্দেশ্য যখন সৎ, তার ফল পাবোই। মানুষকে জড়ো করা, প্রজেক্ট প্ল্যান করা, আর্থিক অনুদান সংগ্রহ, সেই টাকা ঠিকভাবে ব্যবহার- প্রচুর ধৈর্য্য আর সময়ের প্রয়োজন। চটজলদি কিছুই হয়না, সময় দিতে হয়, লেগে থাকতে হয়। এই কাজ করতে এসে আমি এটাই শিখেছি। প্রচুর অভিজ্ঞতা হয়েছে, খুবই ভাল অভিজ্ঞতা, যেসব ভলান্টিয়াররা আমাকে সাহায্য করছেন, যারা আর্খিক অনুদান দিয়ে উদ্যোগগুলিকে বাস্তব রূপ দিতে সাহায্য করেন, তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আওয়ার ওয়ার্ল্ড আওয়ার ইনিশিয়েটিভের চালিকাশক্তি তাঁরাই,” বললেন সুফিয়া।

কলকাতার কালীঘাট এলাকার এক বস্তির বাসিন্দা ১৮ বছরের প্রিয়া শর্মা. আরও অনেকের মতোই, স্কুলের পর আর পড়াশোনা চালাতে পারেনি প্রিয়া। ওইদিনটা আমার এখনও মনে আছে, দিদিরা যেদিন প্রথম আমাদের স্কুলে এল। সুন্দর সুন্দর কার্ড বানাতে শিখিয়েছিল দিদিরা। আমি এখনও বানাই ওই কার্ড, পাড়ার একটা দোকান ওই কার্ড কিনবে বলেছে। স্পোকেন ইংলিশ ক্লাসও হতো আমাদের, আমি এখন ইংরিজিও বলেতে পারি। বাড়িতে খুব অভাব, আমার আর বোনের বই খাতা আর স্কুলের অন্যান্য খরচ দিদিই দেয়”। আর পড়াশোনা করবে না? খানিক ম্লান হয়ে যায় প্রিয়া, “দিদি বলছে করতে, কিন্তু বাড়িতে যা অবস্থা, দিদি বলেছে সবরকম সাহায্য করবে, একটা সেলাই স্কুলেও ভর্তি করে দেবে, আমি তাহলে নিজের একটা দোকান খুলতে পারব”।

শিক্ষা, হাতের কাজ, কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার পাঠেরও আয়োজন করে ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড, আওয়ার ইনিশিয়েটিভ’। ঋতুকালীন পরিচ্ছনতা, স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের প্রয়োজনীতা ইত্যাদি নানা বিষয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হয় নিয়মিত. স্যানিটারি প্যাডও সরবরাহ করা হয়। সারাবছরই চলে নানা উদ্যোগ আয়োজন। বস্তি ও নানা হোমে বসবাসকারী শিশু-কিশোর-কিশোরীদের স্বনির্ভরতা প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মশালার আয়োজন করা হয় ‘লিড দ্য ওয়ে প্রজেক্টে’। ‘বিউটিফুল স্মাইল’ আক্ষরিক অর্থেই বিভিন্ন অনাথ আশ্রম আর হোমে থাকা শিশুদের একটি হাসিখুশি দিন উপহার দেওয়ার উদ্যোগ, একদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যাওয়া, হাসি খেলায় কাটে দিনটা। কিছুদিন আগেই আশিয়ান হোমের শিশুদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসা হল নিকোপার্ক। প্রতিবছর বড়দিনের সময় জামাকাপড়, খাবার, পেস্ট্রি ও খেলনা দেওয়া হয় কলকাতার পথশিশু ও বয়স্কদের, প্রজেক্টের নাম, ‘সান্তা অন দ্য ওয়ে’।


image


শিশুরাই অনুপ্রেরণা। সুফিয়া বলেন, এইসব শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি। পরিবার,ঘর, শিক্ষা, মূল্যবোধ - জীবনে যা কিছু ভাল সব আমরা পেয়েছি। অন্যদিকে ওদের দেখুন, কিচ্ছু নেই, রাস্তায় চূড়ান্ত লাঞ্ছনার জীবন কাটায়, দিনের পর দিন। ওদের পড়াতে প্রচুর ধৈর্য্যের প্রয়োজন। সত্যি কথা বলতে ওরা তো পড়াশোনায় সেভাবে আগ্রহী নয়, স্বাভাবিকভাবেই চটজলদি কিছু টাকা রোজগারের দিকেই ঝোঁক বেশি। কিন্তু আমি জানি ওরা পারবে, ওদের মধ্যে ওই ইচ্ছেটা ঢুকিয়ে দিতে হবে, আকাঙ্ক্ষা জাগাতে হবে, জীবনের এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে একটা সুস্থ জীবনের আকাঙ্ক্ষা। বিশ্বাস করুন এটা সম্ভব,” বললেন আত্মবিশ্বাসী সুফিয়া। যে আত্মবিশ্বাস তাকে এতটা পথ নিয়ে এসেছে সেই বিশ্বাস

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags