সংস্করণ
Bangla

বিপর্যয় মোকাবিলায় দ্রোণের নজরদারি

11th Dec 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

চেন্নাই এর বন্যা প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার সঠিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটা স্টার্ট আপ এই পরিষেবা দিতে এগিয়ে এসেছে। উত্তরাখণ্ডের ২০১৩-র বন্যা হোক বা এই বছরের গোড়ার নেপালের ভূমিকম্প প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় তারা নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগিয়েছে। এই সব স্টার্ট আপদের সুলুকসন্ধান করল ইয়োর স্টোরি। যারা প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় বিশেষ করে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে প্রশাসনকে সাহায্য করে।

image


সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলিতে অসামরিক বিমান পরিষেবা ক্ষেত্রের স্টার্ট আপগুলি নিরাপত্তারক্ষীদের সহায়তা করেছে। হেলিকপ্টারের পক্ষে যখন বিপর্যয়গ্রস্থ জায়গায় গিয়ে পৌঁছনো সম্ভব নয়, তখন সেসব দুর্গম জায়গায় সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে দ্রোণ। উন্নত মানের ছবিও পাঠাচ্ছে।

মুম্বই-এর একটি দ্রোণ পরিষেবা সংস্থা এয়ার ফিক্স এর সহ প্রতিষ্ঠাতা শিনিল শেখর বলেন,"বিপর্যয় মোকাবিলায় দ্রোণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আমরা আর পাঁচটা স্বাভাবিক কাজের মতই দ্রোণকে কাজে লাগাই,তাতে প্রশাসন ও লোকজনের খুব সুবিধা হয়।"

আনম্যানড এরিয়াল ভেহিক্যাল বা UAV যেসব ছবি বা তথ্যের যোগান দেয় তা দুর্গম এলাকাগুলি সন্মন্ধে আমাদের স্পষ্ট ধারণা তৈরী করতে সাহায্য করে। আইডিয়া ফোর্জ এর সহ- প্রতিষ্ঠাতা অঙ্কিত মেহতা বললেন, "আমরা ২০১৩ এর উত্তরাখণ্ডের বন্যার সময় UAV দিয়ে আমাদের দুটি টিম পাঠিয়েছিলাম। রাজ্য প্রশাসনের কাছে যথেষ্ট পরিকাঠামোও ছিলনা তাছারা তারা যে পরিস্থিতির সামনে পরেন শুধু তার মোকাবিলায় তাদের সময় কেটে যায়। আমরা বিদ্ধস্ত জায়গার গোটা এলাকাজুড়ে নজরদারি চালাতে পারি, এমনকি ধ্বংসস্তুপের যেসবযায়গায় কারও নজর যায় না সেগুলিও আমাদের নজরে আসে।"

২০১৩ এর উত্তরাখণ্ড বিপর্যয়ের সময় আইডিয়া ফোর্জ জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর(NDRF) সঙ্গে যৌথভাবে উদ্ধারকাজ করেছিল।

নেক্সগিয়ারের প্রতিষ্ঠাতা অমরদীপ সিং,উনি আগে আইডিয়া ফোর্জে ছিলেন, জানালেন এই প্রযুক্তির ব্যবহারে সময় আর পরিশ্রম দুইই বাঁচানো সম্ভব। তিনি জানালেন,"স্বানীয় প্রশাসন অনেকগুলি এজেন্সির সঙ্গে কাজ করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল । আমাদের UAV ধংসস্তুপে জীবিত লোকের সন্ধান করত,জীবিত মানুষের সন্ধান পেলে সেখানে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো হত।"

২০১৪ তে NDF নিজেদের দ্রোণ কিনে নিয়েছিল।পুনের কাছে মালিন জেলায় ধ্বসে যখন ২০০ জন আটকে পড়ে তখন আইডিয়া ফোর্জ আবার তাদের সঙ্গে উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছিল। অমরদীপ জানালেন , "দ্রোণ ওড‌়ালে সহজেই বোঝা যায় কোন দিক দিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব।"

দ্রোণ অ্যাভিয়েশনের সিইও অপূর্ব গোডবোলেরও একই মত।যদিও গোডবোলের কোম্পানি এখনো কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উদ্ধারকাজ কউরেনি তবে তারা মুম্বই এর ফায়ার ব্রিগেডের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেছে।এছারা তারা কিছু সরকারি দপ্তরের সঙ্গে কিভাবে উদ্ধারের কাজে দ্রোণ এর ব্যাবহার সম্ভব তা নিয়েও আলোচোনা চালাচ্ছে। অপূর্বর মতে বিপর্যয় মোকাবিলায় আরও অনেক প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। তার কোম্পানী বেশ কয়েকজন দমকল কর্মীকে কিভাবে দ্রোণ ওড়াতে হয় তার প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আমরা সরকারি সংস্থার সঙ্গে একসাথে কাজ করছি যতক্ষণ না এর ব্যবহার সন্মন্ধে সরকারের কি নীতি তা ঠিক না হচ্ছে।এখন মূলত নজরদারি আর তথ্য সংগ্রহের কাজেই দ্রোণ ব্যাবহার হয়।

প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা

উত্তরাখণ্ডে বন্যার সময় এয়ার পিক্সের দ্রোণ কাজ করেছিল। নলিনীর মনে আছে,"কদিন পরই মিডিয়ার নজর আর বন্যার উপর ছিল না,ফলে এনজিও গুলোর উদ্ধারকাজ চালানোর ফান্ডেও টান পড়তে শুরু করেছিল।আমরা সেসময় দূর্গম এলাকাগুলোর তথ্য সরবরাহ করতাম।"বৃস্টির সময় দ্রোণ খূব একটা কাজে আসে না কারণ সেসময় দৃশ্যমানতা কমে আসে। তবে বৃস্টির পরে আবার ছবি তোলা সম্ভব ,তাতে বন্যাবিধ্বস্ত এলাকার ক্ষয়ক্ষতি বোঝা সম্ভব।আমরা দ্রোণের ছবি দিয়ে এলাকার একটি থ্রী ডি ম্যাপ বিনিয়ে জলে বের করার পরিকল্পনা করতে পারি ।" বলে জানালেন শালিনী । তবে প্রযুক্তিগত এত উন্নতি সত্বেও চেন্নাই এর এবারের বন্যা এতটাই ভয়াবহ ছিল এই সব কোম্পানী একসঙ্গে হয়েও তা সামাল দিতে পারেনি।সেকারণে তারা নিজেদের প্রযুক্তিগত উন্নতির দিকে আরও নজর দিয়েছে।এয়ার পিক্স তাদের নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হয়েছে ।আর আইডিয়া ফো়র্জ তাদের মূল প্রোডাক্ট নেত্রর সাহায্যে কিভাবে আরও বড় এলাকায় নজরদারি চালান সম্ভব তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে।

আইডিয়া ফোর্জ এর সহ প্রতিষ্ঠাতা অঙ্কিত মেহতা বললেন,"এখন আমাদের ৫ কিলোমিটার উঁচুতে ৫০ মিনিট পর্যন্ত উড়তে পারে।আমরা এখন পুলিশ বাডিনীর জন্য স্থল আর আকাশ পথে নজরদারির প্রযুক্তির উপর কাজ করছি। "

কিন্তু আগে আমাদের এজেন্সি গুলিকে আগে ঠিক করতে হবে তারা কিভাবে এই প্রযুক্তি কাজে লাগাবে। এর অভাবে চেন্নাই এর বন্যায় দ্রোণ কিভাবে ব্যাবহার করা হবে আতা ঠিক করতেই বহু সময় চলে গেছিল।অঙ্কিত জানালেন জরুরী পরিস্থিতিতে কিভাবে কাজ শুরু করতে হবে তার নির্দিষ্ট গাইড লাইন নেই। এর ফলে প্রচুর অসুবিধা হয়।

এছারাও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবের ফলে উদ্ধার বাহিনি ও সেনা বাহিনির কাজ করতে অসুবিধা হয়।অমরদীপের পরামর্শ," টেলিকম কোম্পানীগুলি দ্রুত টাওয়ার বসিয়ে টেলি সিগন্যাল চালু করতে পারে। তাহলে উদ্ধারকাজে সাহায্য হয়। "

তথ্য সরবরাহ সংস্থা সোশ্যাল ক্রপের প্রতিষ্ঠাতা প্রকল্পা শঙ্কর জানালেন,''এই সমস্যা কাটাবার জন্যা আমরা কালেক্ট অ্যাপ তৈরী করেছি । এর সাহায্যে ইন্টারনেট ছাড়াই যোগাযোগ সম্ভব।এর সাহায্যে কমদামি ফোন ব্যবহার করেও দূর্গম এলাকায় তথ্য আদান প্রদান করা সম্ভব।''

প্রকল্পা আবার ত্রাণ সামগ্রী পৌছনোর সমস্যার সমাধানে জোড় দিলেন। "আমাদের ই কমার্সে পন্য পরিবহন খুব উন্নত। আমাজন মহারাষ্টের অজ পাড়াগায়েও মালের ডেলিভারি দেয়।সেই প্রযুক্তির ব্যাবহার করা সম্ভব। "

সোশ্যাল ক্রপ ১২০ টা সংস্থার সঙ্গে কাজ করে।সরকারি সংস্থা, এন জিও কর্পোরেট সবাই সেই টীমে আছে।প্রকল্পার মত, "আমরা সঠিক তথ্য পেলে অনেক ভাল কাজ করতে পারব।আমাদের প্রায় চার কোটি ডাটা পয়েন্ট আছে । সেখানে আমাদের নিজস্ব কর্মীরাএ রয়েছেন। তাদের থেকে আমরা দূর্গম এলাকা থেকেও তথ্য পাই ।''

চেন্নাই এর বন্যার সময় সোশ্যাল কর্পের ডাটা পয়েন্টগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল।এর ফলে স্বেচ্ছাসেবকদের কোথায় ক্ষয়ক্ষতি সবচাইতে বেশী,তা বুঝতে সুবিধা হয়েছিল। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ভুমির সঙ্গে তারা একযোগে চেন্নাই এর বিপর্যয়ের মোকাবিলায় তথ্যের আদান প্রদানে সাহায্য করছে।প্রকল্পার জানালেন,''এই তথ্য চেন্নাই এ একটি লাইভ ম্যাপে ফুটে উঠছে। কি সমস্যা আছে ,ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কি তাও জানা যাচ্ছে এছারা ভুমিরস্বেচ্ছাসেবকরা কোথায় উদ্ধার কাজ চালাচ্ছেন তাও জানা যাচ্ছে। ''

ইয়োর স্টোরির মতামত

চেন্নাই এর বন্যা একটি জরুরি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।প্রাকৃতিক দূর্যোগ বিপর্যস্ত হওয়ার পর তা মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া, সঠিক সমাধান নয়। অমরদীপের মত প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিপর্যয় মোকাবিলার স্ট্রাটেজী গুলো NDRFএর হেডকোয়ার্টোরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। স্থানীয় স্তরেও সেই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে।

পুনের বিপর্যয় মোকাবিলা ও সরঞ্জাম বিশেষজ্ঞ রাজেন্দ্র লডকট এর মতে , বাচ্চারও বিপর্যয় মোকাবিলার সরঞ্জাম বানাতে পারে।শুধু সচেতনতা আর জ্ঞান দরকার।''স্কুল আর অফিসগুলিকে বন্যা, ধ্বসের মত পরিস্থিতির মোকাবিলায় আমাদের কি করতে হবে ,সেই সচেতনতা বাড়াবার জন্য ক্যাম্প করতে হবে। চেন্নাই এ তা করা হলে আমাদের এত ক্ষয়ক্ষতি হত না। কমকরে বাড়িতে অন্তত বিপর্যয়ের মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় জিনিসের থাকত।'' রাজেন্দ্রর 'সঞ্জীবনি ' কিট জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সদস্যরা নাসিকের কুম্ভ মেলা, উত্তরাখণ্ডের বন্যা ও নেপালে ভূমিকম্পের সময় ব্যবহার করেছে।এই কিটের কার্বন মাস্ক, ঘাড়ের বেল্ট এ সাকশন কিট স্বেচ্ছাসেবকরা ব্যবহার করেন।এছারাও এতে ভাসমান স্ট্রেচারও রয়েছে । এর সাহায্যে মৃতদেহ একদম ঢেকে বহন করা যায়,তাতে দূর্গন্ধ ছড়ায় না।এই ধরণের সামগ্রীর আরও বহুল প্রচার প্রয়োজন।একমাত্র সরকারি সংস্থার পক্ষেই সেটা করা সম্ভব। স্টার্ট আপেরা নিজেদের উদ্যোগে কাজটা শুরু করেছেন। বাকিটা সরকারকেই করতে হবে। সরকার পক্ষ কি সেটা দেখতে পাচ্ছে?

(লেখা আথিরা আর নায়ার অনুবাদ সুজয় দাস )

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags