সংস্করণ
Bangla

কথা ছিল 'মা' হবেন, হয়ে গেলেন 'উদ্যোগপতি'

YS Bengali
24th Nov 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

এমন একটা সময় যখন অধিকাংশ মহিলাই কাজ থেকে বিরতি নিয়ে মাতৃত্বের সৌন্দর্য উপলব্ধি করেন, ঠিক সেই সময়ে শ্রদ্ধা সুদের জীবনে এল তাঁর দুই স্টার্ট আপ। প্রথমটি তাঁর সদ্যোজাত কন্যাসন্তানের মা হিসেবে; এবং দ্বিতীয়টি, ব্যবসার দুনিয়ায় তাঁর প্রথম পদক্ষেপ - 'Mamacouture', যা এখন একটি প্রসিদ্ধ হাই-ফ্যাশন মেটারনিটি ওয়্যার লেবেল, তার প্রতিষ্ঠাত্রী হিসেবে। 

কিন্তু অন্য কোনও সময়ে, অন্য কোনওভাবেই হয়তো উদ্যোগপতি হয়ে ওঠার সুযোগ শ্রদ্ধা পেতেন না। গর্ভবতী অবস্থায় তিনি যে সমস্যায় পড়েছিলেন, তা যেন আর কোনও মহিলাকে পড়তে না হয়, এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় শ্রদ্ধা সুদের এই উদ্যোগ। "তখন আমি আট মাসের প্রেগন্যান্ট, অফিসে পরে যাওয়ার জন্য মেটারনিটি ক্লোদ্‌স খুঁজছিলাম। কিন্তু এখনকার মহিলাদের জীবনযাত্রা বা কাজের ধরণের সঙ্গে মানানসই কোনও জামাকাপড় খুঁজে পাচ্ছিলাম না," বললেন শ্রদ্ধা। এই সময় প্রত্যেক মহিলাই চান খুশি থাকতে, নিজেকে সুন্দর দেখাতে - কিন্তু শ্রদ্ধার মতে, সুন্দর দেখতে লাগার মতো জামাকাপড়ই যখন নেই তখন কাউকে দেখতে ভালো লাগবে কী করে?

এই সময়ই নিজের জীবনের সবচেয়ে পড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন প্রাক্তন এই আইনজীবী। "গর্ভাবস্থার প্রতি আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গী তা পাল্টানোর প্রয়োজন রয়েছে। প্রেগন্যান্সি নিয়ে কাউকে যেন লজ্জিত হতে না হয়, নিজের শরীরে ঘটতে থাকা পরিবর্তনগুলোকে যেন লুকোতে না হয়। কেন এই সময় বেমানান জামাকাপড় পরবেন, বরং বরাবরের মতোই আত্মবিশ্বাসী থাকুন, সুন্দরভাবে সাজুন," সব মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলছেন শ্রদ্ধা।

image


তিনি এমন মহিলাদের কথাও জানেন যাঁরা গর্ভাবস্থায় শুধুমাত্র নিজেদের বদলাতে থাকা চেহারা এবং লুক-এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। "এই সময়টা জীবনের অন্যতম উপভোগ্য সময়। অথচ এই অবস্থায় মহিলাদের ব্যবহারের জন্য যেসব পোশাক আশাক পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। আমি তো প্রায় সব জামাকাপড়ই বিদেশ থেকে আনিয়েছিলাম। যার ফলে অহেতুক প্রচুর সময় এবং অর্থ ব্যয় হয়েছিল। "

নতুন পথচলা শুরু

শ্রদ্ধা খানিকটা মার্কেট রিসার্চ করার সিদ্ধান্ত নেন, এবং তার ফলও মেলে হাতেনাতে। ভারতে প্রতি মিনিটে যে ৫১ জন শিশু জন্ম নেয়, তার মাত্র ২০শতাংশও যদি প্রথম অথবা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হন, তাহলেই বাজারের মোট মূল্য হতে পারে ২,৫০০ কোটি টাকা। অথচ, এই বাজারের অধিকাংশই এখনও অধরা।

শ্রদ্ধা বুঝতে পারেন, এনিয়ে ব্যবসা করতে গেলে এটাই সেরা সময়। এক্ষেত্রে তাঁর গর্ভাবস্থা কোনওভাবেই বাধা হতে পারে না। "অনেক ভেবেচিন্তে এবং অনেক বড় একটা পদক্ষেপ করতে যাচ্ছিলাম আমি। কিন্তু আমার ভাবনার শক্তি এত বেশি ছিল, যে আমি জানতাম, এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা বৃথা যাবে না।"

অনেকেই তাঁর সময়জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেউ কেউ তাঁর ভাবনাচিন্তা সম্পর্কেও যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন, কিন্তু তাঁর অন্তরের চালিকাশক্তিই শ্রদ্ধাকে তাঁর স্টার্ট আপ-এর পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। "না, আমি এই কাজের জন্য অপেক্ষা করতে পারব না। এর থেকে সঠিক সময় আর হতেই পারে না। আমি জোর করে সকলকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম। আমি অনেকদিন ধরেই নিজের অন্ত্রপ্রেনারশিপ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছিলাম। কিন্তু কোনওদিন এই তাগিদটা অনুভব করিনি। আর একবার যখন সেই অনুভূতিটা হল, তখন তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইনি। অনেকের অনেক ভাবনাচিন্তা থাকে। কিন্তু তাকে বাস্তবায়িত না করার জন্য আমরা সবসময় অজুহাত খুঁজি।কিন্তু সত্যিটা এটাই - কোনও কাজ না করার অনেক কারণ থাকবে, কিন্তু সেই কাজটা কেন করবেন, সেই কারণটা আপনাকে খুঁজে নিতে হবে।"

'যমজ' সন্তান

শ্রদ্ধার উৎসাহ এতটাই ছিল, যে, তিনি যে প্রেগন্যান্ট সেই বিষয়টা কখনওই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সম্ভাব্য মা- দের সার্ভে করা থেকে শুরু করে ডিজাইনার খোঁজা এবং নিজের প্রি-লঞ্চ লাইন প্রস্তুত করা, সব কাজ একা হাতে সামলেছেন তিনি। একদিনের জন্যেও ছুটি নেন নি। কিন্তু সত্যিকারের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি শ্রদ্ধা হলেন তাঁর মেয়ের জন্মের পর।

"ও আমার জীবনে আসার পর মনে হচ্ছিল যেন আসলে আমার যমজ সন্তান। আমি আমার এই ভাবনা এবং আমার সন্তানের জন্ম একসঙ্গে দিয়েছিলাম। সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল টাইম ম্যানেজমেন্ট। এই পরিস্থিতিতে আপনি যেভাবেই কাজ করুন না কেন, সময় কম পড়বেই," 

বললেন শ্রদ্ধা। "এই সময় পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার পরিবার আমার জন্য যা করেছে তার জন্য তাঁদের ধন্যবাদ দিতেই হবে। আমার মতো করে সকলে নিজেদের জীবনকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। আমার সময় অনুযায়ী তাঁদের ঘড়ির কাঁটা চলত। সর্বক্ষণ তাঁর আমার মেয়ে এবং আমার বাড়ির খেয়াল রেখেছেন। তা নাহলে আমি তো পাগল হয়ে যেতাম।"


image


একজন মহিলা হিসেবে শ্রদ্ধা সুদ বিশ্বাস করেন, মহিলারা অধিকাংশ সময়ই সাহায্য চান না, অনেকখানি দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নেন। তাঁর মতে,"সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং তাকে মানুষ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তার উপর যদি একজন মহিলার একটা ভালো কেরিয়ার থাকে তাহলে তো পরিবারের সাহায্য চাইতেই হবে। এনিয়ে দ্বিধা রাখা উচিত নয়।"

শ্রদ্ধার ব্যবসার পরিধিও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট, জাবং, লাইমরোড, ফাসর্ট ক্রাই -এর মতো বড় ওয়েব পোর্টালগুলির মেটারনিটি কালেকশনের ৩০-৬০ শতাংশ দখল করতে পেরেছে 'Mamacouture। প্রথম মাসেই এক লক্ষ চাকার টার্নওভার এসেছে তাঁর সংস্থা থেকে। তবে শ্রদ্ধা মনে করেন, একজন নতুন উদ্যোগপতি কতটা সাফল্য পাবেন তার অনেকটাই নির্ভর করে পুরো উদ্যোগপতি সমাজের উপর। 

"এই জগৎ সকলকেই দু'হাত ভরে স্বাগত জানায়। মহিলাদেরকেও। প্রয়োজনীয় সবরকম সাহায্য তারা করেন এবং সবচেয়ে বড় কথা নবাগতদেরকেও নিজেদের সমতুল বলেই মনে করে।"

শ্রদ্ধার 'দুই' সন্তানই বেশ ভালো আছে। তারা বড় হচ্ছে। কিন্তু তিনি যে কত সহজে কত বড় একটা কর্মকাণ্ড সামলে চলেছেন, তা কি আদৌ উপলব্ধি করতে পারেন শ্রদ্ধা? মৃদু হেসে তাঁর উত্তর, "ছোট্ট ছোট্ট পায়ে এগিয়ে চলুন, তাহলেই সব সম্ভব।"

লেখা - বিঞ্জল শাহ

অনুবাদ - বিদিশা ব্যানার্জী

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags