সংস্করণ
Bangla

জলে ঝড় তুলেছেন রবিন

Tanmay Mukherjee
17th Oct 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

কিছু বোঝার আগেই বাবাকে হারান। পাঁচ ভাইয়ের সংসারে অন্নের খোঁজে তখন মায়ের অসম লড়াই চলছে। এসবই যেন মনের ভিতরের আগুনটাকে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। পুকুরে নেমে যে ঝড়টা তুলেছিলেন তা বিশালাকার ঢেউ হয়ে সব অভাব এক ধাক্কায় ঘুচিয়ে দল। সাঁতার নয়, ওয়াটোরপোলোই ছিল রবিন বোলদের ধ্যান-জ্ঞান। সেই ওয়াটোরপোলো খেলেই তিনি হলেন বাংলা টিমের অধিনায়ক, পেলেন জাতীয় দলের আর্মব্যান্ড। রেলে চাকরি। উত্থানের শৃঙ্গে উঠে পড়ার পর পূর্ণচ্ছেদ পড়েনি। বরং যে জায়গা থেকে রবিন উঠে এসেছিলেন, সেখানে শুরু হল আরও রবিন তৈরির কাজ। রবিন বোলদের হাত ধরেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার তালদি এখন সাঁতার ও ওয়াটারপোলোর পীঠস্থান হিসাবে পরিচিত। বাংলা ও ভারতীয় দলের নিয়মিত মুখ তালদির ছেলেরা। দ্রোনাচার্যের মতো পিছন থেকে কাজটা করে যাচ্ছেন এই ‘জলযোদ্ধা’।

 

image


‘কোনি’ সিনেমায় ক্ষিতিশ সিনহার কথা মনে পড়ে। যিনি ছিলেন কোনির খিদ দা। মতি নন্দীর গল্প অবলম্বনে ‘কোনি’ সেলুলয়েড ছাড়িয়ে বাস্তবেও সাবলীল। এই গল্পের খিদ দা রবিন বোলদে। ৩৪ বছরের রবিনও ভাল ওয়াটারপোলো খেলোয়াড় ‌তৈরির জন্য সব কিছু করতে রাজি আছেন। যার একটাই কথা ‘ফাইট’। কলকাতা থেকে ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে হলেও এখনও পরিকাঠামো থেকে অনেক অনেক দূরে তালদি। যে পুকুর থেকে রবিন উঠে এসেছিলেন, সেই পুকুরে এখনও পানা সরিয়ে খেলতে হয়। পুকুরে পাড় বাঁধানোর কোনও ব্যাপারই নেই। একটু বৃষ্টি হলে নোংরা জল ঢুকে পড়ে। এমন একটা জায়গা থেকেই আজ অজস্র ওয়াটোরপোলো খেলোয়াড় উঠে আসছে। রহস্যটা কোথায়। তাহলে একটু পিছনের দিকে হাঁটতে হবে।

পাঁচ ভাই ও মা-বাবাকে নিয়ে সংসার ছিল রবিন বোলদের। বাবা মাছের আড়তে সামান্য কাজ করতেন। এতে বাড়ির সাতজনের ক্ষিদেই ঠিকমতো মিটত না। নুন আনতে পান্তা ফুরনোর সংসারে রবিন পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারান। জীবন যে কত কঠিন তখন থেকেই হাড়েহাড়ি বুঝতে পেরেছিলেন। আড়তে মায়ের হাড়ভাঙা খাটুনি, তবুও পেট ভরত না। পাঁচ ভাই নানা ভাবে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করেন। জীবনযুদ্ধের মধ্যেও জলের হাতছানি এড়াতে পারতেন না রবিন। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছিল, তা থেকেই সাঁতার কাটতে এসে ওয়াটারপোলোতে মজে যান। জলে নামতে যে তেমন কিছুর দরকার পড়ে না। বাড়িতে ভাইয়েরা যে ভাবে লড়াই করতেন সেই টিমগেমের ছাপ পড়ে ওয়াটারপোলোতে। জলের ‘কোর্টে’ সব্বাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করেন তিনি। স্কুলে পড়তে পড়তে ১০ বছর বয়সে সাইতে সুযোগ পেয়ে যান রবিন। ছেলেটার লড়াইয়ের রসদ চোখ এড়ায়নি কোচ বিশ্বজিৎ দে চৌধুরীর। তিনিই রবিনকে আরও ঘষে-মেজে তৈরি করেন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলায় একের পর এক মিটে তাঁর পারফরমেন্স অনেকের চোখ কপালে তুলে দেয়। মফস্বল থেকে আসা এক ছেলের জলে এমন কেরামতিতে তাজ্জব হয়ে যান নির্বাচকরা। এরপর বাংলা টিমে নিয়মিত হওয়া, অধিনায়কত্ব, জাতীয় দলে সুযোগ, পূর্ব রেলে চাকরি। রেল টিমের ক্যাপ্টেন হয়ে টানা কয়েক বছর জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। হংকং এশিয়ান এজ গ্রুপ চ্যাম্পিয়নশিপে রানার্স। ২০০২ এশিয়ান গেমসে একটুর জন্য খেলা হয়নি রবিনদের। এশিয়াডে সুযোগ পেয়েও অজ্ঞাত কারণে সেবার ভারত টিম পাঠায়নি। ১৯৯৭ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত স্বপ্নের ফর্মে ছিলেন রবিন। সব পজিশনে খেললেও ওয়াটারপোলোয় রবিনরে প্রিয় জায়গা ছিল রাইট সাইড সাইড ডিফেন্স। টিম হারছে কয়েক গোলে। তখন বহুবার জিতিয়েছেন দলকে। পিছিয়ে থেকেও এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল তাঁর মজ্জাগত।


image


রবিনের মতো তাঁর দাদা-ভাইয়েরাও নিজের জায়গায় সফল। অভাবের দুনিয়া থেকে আসা রবিন অতীতকে কোনওভাবেই ভোলেননি। রেলে ও ভারতীয় দলে খেলার সুবাদে নানা বেসরকারি ক্যাম্প থেকে কোচিং-এর জন্য ভাল অফার পেয়েছিলেন। সব সরিয়ে তালদির কথাই ছিল তাঁর মাথায়। যে জল তাঁকে এত কিছু দিয়েছে তাকে ফিরিয়ে দিতে শুরু হয় অন্যরকম লড়াই। ২০০৬ সালে তৈরি করেন তালদি সুইমিং ক্লাব। সেই থেকেই এই ক্লাবই দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাঁতারুদের একমাত্র সাপ্লাই লাইন। রবিন জানতেন তাঁর এলাকার ছেলেদের প্রতিভা আছে। শুধু পাশে থাকতে হবে। ভরসা দিতে হবে। এই যেমন তাপস‌ মণ্ডল। পেট চালাতে রঙের কাজ করতেন। তাঁকে ধরেবেঁধে নিয়ে এসে রবিন তালদির পুকুরে প্রশিক্ষণ দেন। সেই ছেলেই হন ভারতীয় দলের অধিনায়ক। সালাউদ্দিন মোল্লা পূর্ব রেলে চাকরি করেন। কুনাল ভঞ্জ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বড় পদে কর্মরত। এখনও পর্যন্ত রবিনের ১০জন ছাত্র ভারতীয় টিমে খেলেছে বা খেলছে। কেউ আবার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ছাপ রেখেছে।

রেলে মোটা বেতন। মাঝেমধ্যে বিদেশ সফর। ফাইভ স্টার হোটেলে থাকা। বিমানে যাতায়াত। পাঁকের মধ্যে থেকে উঠে এসে যে এভাবে উত্থান সম্ভব তা সালাউদ্দিন, পিন্টু, তাপসদের বোঝাতে পেরেছেন রবিন। আরও রবিনের খোঁজ করতে গিয়ে কখনও কখনও অপদস্থ হতে হয়েছে। হেনস্থারও শিকার হয়েছেন। রবিন এখন বাংলা ওয়াটারপোলো স্কুল টিমেরও অন্যতম নির্বাচক। কয়েক দিন আগে টিমের নির্বাচনে তালদির এক কিশোর সুযোগ পাননি। রাগে সেই খেলোয়াড়ের বাবা তাঁর দলবল নিয়ে এসে রবিনকে মারধর করেন। এরপরও একটুও দমেননি রবিন। তাঁর কাজ যে অনেক বাকি।

৮২ এশিয়ান গেমসে ওয়াটারপোলোয় শেষ বার ব্রোঞ্জ পায় ভারত। তারপর দেশ শুধুই পিছোচ্ছে। রবিনরা এই জায়গাটা ধরতে চাইছেন। ওয়াটারপোলোর মতো প্রচার থেকে অনেক দূরে থাকা এই খেলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নীরবে তালদির কোচিং সেন্টারে কাজ করে চলেছেন। তালদির এই জল তাঁকে যে অনেক কিছু দিয়েছে যে।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags