সংস্করণ
Bangla

যত মাছ তত আঁশ, তত আমিরুলদের আশা

18th Dec 2015
Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share

নদী-নালা এলাকার মানুষ। মাছের সঙ্গে ঘর-বাড়ি। অথচ মাছের মধ্যে যে এত গুণ তা বোধহয় ছেলেবেলায় টের পাননি আমিরুল মল্লিক। এলাকার অন্যদের মতো রুটিরুজির টানে লক্ষ্মীকান্তপুর থেকে চলে গিয়েছিলেন ‌অচেনা পার্ক সার্কাসে। সেখানে দিন-রাত জরির কাজ। শাড়ি বা চুড়িদারের ওপর প্রতিদিন চুমকি বুনতে বুনতে ক্লান্ত হয়ে ওঠা মন আচমকাই অন্য স্বাদের সন্ধান পায়। মাছের আঁশ যে তাঁর মনের খিদে মেটাবে তা বুঝে গিয়েছিলেন আমিরুল। আর পিছনে ফেরা নয়, মাছের আঁশ দিয়ে নানা সামগ্রী বানিয়ে তাঁর এখন যত হাতযশ। পেয়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সেরা হস্তশিল্পীর সম্মান।

image


মাছ উৎপাদনে দেশে প্রথম। অসংখ্য নদী, খাল, পুকুর। প্রতিদিন রাজ্যের বাজারে টন টন মাছ। যত মাছ, তত আঁশ। আর এই রাশি রাশি আঁশ অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশ দূষণে ইন্ধন যোগায়। উন্নত দেশগুলিতে আঁশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হলেও আমাদের দেশে এখনও তেমন কিছু গড়ে ওঠেনি। তবে এই আঁশ দিয়েও যে পরিবেশবান্ধব নানা সামগ্রী তৈরি করা যায় তা নিজেদের মতো করে চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুরের হাতিরামপুরের আমিরুল মল্লিক এমনই একজন। বছর দেড়েক আগেও তিনি ছিলেন নেহতাই এক জরি শিল্পী। দীর্ঘ দিন এর পিছনে দোড়ে পেট ভরলেও জরির কাজ মন ভরাতে পারেনি আমিরুল সাহেবের। সংসার ছেড়ে পার্ক সার্কাসে এই কাজ করতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল দোয়েল সরকার নামে একজনের সঙ্গে। যিনিই প্রথম আমিরুলকে দেখিয়েছিলেন নতুন পথের ঠিকানা। মাছের আঁশ দিয়ে কত কী করা যায় তার সুলুকসন্ধান দিয়েছিলেন দোয়েল। হাতে করে শিখিয়েছিলেন কাজ। শিল্পী হিসাবে রেজিস্ট্রেশনেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। গুরুর আর্শীবাদ নিয়ে চেনা জরির কাজ ছেড়ে মাছের আঁশ‌ নিয়ে কারুকাজ এখন হয়ে উঠেছে আমিরুলের ধ্যান-জ্ঞান।

image


রাজ্যের অন্যতম বড় আঁশের বাজার উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে। সেখান থেকে কেজি প্রতি ১০০ টাকায় আঁশ কিনে আনেন আমিরুল। বাড়িতে আঁশ ঝাড়াই-বাছাই করতে হয়। এরপর অ্যাসিড জলে ধোয়ার পর ফের কোনও ডিটারজেন্ট দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। ধোয়াধুয়ি মিটলে ভাল করে শুকিয়ে কাগজ দিয়ে ঘষে নিলে আঁশের জেল্লা দেখলে অবাক হতে হয়। নতুন রূপে ধরা দেওয়া সেই আঁশ উজ্জ্বলতায় অনেক কিছুকে টেক্কা দিতে পারে। নিজের হাতে তৈরি করেন, নিজেই বিক্রেতা। নিজের পায়ে দাঁড়াতে তাই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সরকারি মেলা ও প্রদর্শনীতে পৌঁছে যান আমিরুল। এবার মিলন মেলায় প্রথমবার এসে তাঁর দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমিরুলের কথায়, ‘‘ভেবেছিলাম হয়তো হাজার দশেক টাকার বিক্রি হবে। কিন্তু মেলা শেষে দেখলাম প্রায় ৩৫ হাজার টাকার বিক্রি হয়েছে। এত বিক্রি উত্সাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। এবার শিলিগুড়ি যাব।’’ সাফল্যের সরণির খোঁজ পেয়ে রীতিমতো আত্মবিশ্বাসী লক্ষ্মীকান্তপুরের এই তরুণ শিল্পী। শূন্য থেকে শুরু করলেও এখন মেলা, প্রদর্শনীতে গিয়ে মাসে কয়েক হাজার রোজগার করেন তিনি।

image


ভরসা জোগানোর কাজটা অবশ্য কয়েক মাস আগে শুরু হয়েছিল। গত নভেম্বরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বালিগঞ্জে হস্তশিল্পীদের এক প্রদর্শনীতে সেরা শিল্পীর পুরস্কার পেয়েছেন আমিরুল মল্লিক। তাঁর মাছের আঁশের তৈরি রাধাকৃষ্ণ ছিনিয়ে নেয় সেরা‌র সম্মান। গণেশ, ময়ূর, হরিণের মতো শো-পিস থেকে মহিলাদের নানারকম অলঙ্কারের নেপথ্যে থাকে মাছের আঁশ। এই আঁশের সামগ্রী এতটাই শক্ত যে ভাঙবে না। আঁশের সঙ্গে সামান্য আঠা লাগিয়েই এই অপরূপ কাজ করে চলেছেন আমিরুল। আপাতত নিজেই সব সামলালেও তাঁর এলাকার বেকার যুবকদের এই কাজে শিখিয়ে-পড়িয়ে কর্মংস্থানের কথা ভাবছেন এই তরুণ শিল্পী। মেলা, প্রদর্শনীতে গিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন কাজ করে গেলে পয়সার অভাব হবে না। বাংলার এই হস্তশিল্পের প্রসারের জন্য তিনি ওয়েবসাইট করতে চাইছেন। আর একটু পুঁজি জোগাড় হলে দেশের বিভিন্ন মেলায় তাঁর স্বপ্নের ঝুলি নিয়ে পৌঁছে যেতে চান বছর ত্রিশের এই স্বপ্নসন্ধানী।

Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags