সংস্করণ
Bangla

খেলার ছলে শেখা সুব্রতর আজব পাঠশালায়

tiasa biswas
13th Oct 2015
Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share

চোখের সামনে ক,খ, গ, ঘয়েদের সারি। এদিক ওদিক এ, বি, সি, ডি। শুধু কী তাই? ওই যে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬ পিঠোপিঠি করে ওরাও সব ঝুলছে। দেওয়ালের ক্যানভাসে রং বাহারি উড়ন্ত পাখি। কোথাও ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার, এই বুঝি হালুম করে। পাশে বসে রোয়াবে তাকেই দেখে চলেছে দশাসই কলো ভালুক-সব যেন জ্যান্ত। চাঁদ, সূর্য, তারারা এক্কেবারে মাটির কাছে, হাত দিলেই ছোঁয়া যায়- এ এক অন্য জগৎ। এটাই সুব্রত মাস্টারের পাঠশালা। সালানপুরের বারাভুঁই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

image


শহরের উন্নতমানের আধুনিক স্কুলগুলিতে প্লেগ্রুপ থেকে প্রজেক্টর, কম্পিউটার আর নানা প্রযুক্তির ব্যবহারে পড়শোনাকে যতভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা যায় তার নিরন্তর চেষ্টা চলে। কিন্তু কুলটির সালানপুরের মতো গ্রামের ছোট্ট স্কুলে হত দরিদ্রের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা। স্কুলের পোশাকটুকুও গয়ে চড়ে না অনেকের। যেখানে শুধু স্কুলে ছোটছোট ছেলেমেয়েদের নিয়মিত হাজিরাই বিরাট কিছু, সেখানে পড়াশোনা উন্নত ব্যবস্থা ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখার মতো। অথচ সেই স্বপ্নই দেখেছেন সুব্রত রায়। শুধু স্বপ্নই দেখেননি। একটু একটু করে তাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।

খেলতে খেলতে পড়া। খেলার ছলে শেখা। পড়াশোনার প্রচলিত ধারাই পালটে গিয়েছে সালানপুরের বারাভুঁই স্কুলে। গতে বাঁধা বইয়ের পড়া, বাড়ি ফিরে হোমটাস্ক একদম না পসন্দ সুব্রত মাস্টারের। ঠিক করেই নিয়েছিলেন, খুদে পড়ুয়াদের পড়াবেন মাস্টারমশাই হয়ে নয়, খেলার সাথী হয়ে। তাই ক্লাসঘরও সাজিয়েছেন এমনভাবে দেখলে মনে হবে ঠিক যেন খেলাঘর। স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে আঁকা নানা ছবি, খোদাই করা বর্ণমালা। এখানে ওখানে কাগজের বোর্ড বা টিনের পাত কেটে বাঘ, ভালুক, পাখির নানা মডেল। ক্লাসে ঢুকতেই শুরু খেলা, থুড়ি পড়া। খেলার ছলে পড়া। সুব্রত বলেন, ‘শিশুরা এখানে খেলতে আসে। খেলতে খেলতেই দেওয়ালে আঁকা অক্ষরে পেন্সিল বুলিয়ে লিখতে শেখে। জানতে শেখে পাখি কেমন দেখতে। ছবি দেখতে দেখতেই চিনে নেয় বাঘ, ভালুক, গরু, ছাগল নানা জন্তু জানোয়ার। আর নানা রঙের কাগজ কেটে রঙ চেনার খেলা তো আরও মজাদার’।

একটু বড়দের জন্যও অন্যরকম খেলা-আসলে পড়া। টিনের পাত কেটে তৈরি চাঁদ-তারাদের মডেল ওদের চিনিয়ে দেয় মহাকাশের অজানা জগৎটাকে। নদী, পাহাড়, জঙ্গল যেমন আছে তেমনি নদীতে বাঁধ দিয়ে চাষের জমিতে সেচ, পাহাড় থেকে নেমে আসা জল কীভাবে মিশে যাচ্ছে নদীতে-এই সবকিছু চোখের সামনে, হাত বাড়ালেই ধরা যায়। আসল নয়। এই সবকিছু মডেলের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে স্কুলের ৯৮ জন পড়ুয়ার সামনে। সুব্রত বলেন, ‘স্কুলে যাওয়ার ভীতি কোনও দিনই ওদের কচি মনে বাসা বাঁধেনি। বরং খেলতে খেলতে আনন্দে কোথায় যে সময় কেটে যায়, কত কিছু শিখে ফেলা যায় বুঝতেই পারা যায় না’।

image


প্রধান শিক্ষক সুব্রত রায় পথ দেখিয়েছেন। সেই পথ ধরে হাঁটছেন স্কুলের বাকি শিক্ষকরাও। সবাই মিলে গড়ে তুলছেন অন্যরকম শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষকরাই জানান, ‘স্কুলের প্রায় দেড় হাজার মডেল তৈরি করতে গিয়ে বিশেষ কোনও যে সামগ্রী ব্যবহার হয়েছে তা কিন্তু নয়। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা জিনিস দিয়ে তৈরি হয়েছ মডেলগুলি’। সামান্য যা পয়সা খরচ হয়েছে শিক্ষকরা নিজেরাই তার ব্যবস্থা করেছেন। খেলার ছলে পড়াতে পড়াতে নিজেদের স্কুলকে জেলার মডেল স্কুলের জায়গায় তুলে আনতে পেরেছেন বারাভুঁই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। পড়ানোর অভিনব পদ্ধতির জন্য এই স্কুলকে মডেল স্কুল হিসেবে ঘোষণা করেছে বর্ধমান জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ। বর্ধমানে ৩৩টি শিক্ষাচক্রের অন্তত একটা করে স্কুলকে এই ধাঁচে যাতে গড়ে তোলা যায় তার পরমর্শ দিয়েছেন অতিরিক্ত জেলাশাসক(সর্বশিক্ষা অভিযান) রুমেলা দে ও জেলার প্রথমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি অচিন্ত্য চক্রবর্তী। আর সুব্রতর মডেল স্কুলকে মডেল করে আর দশটা স্কুলও যদি প্রত্যন্ত গ্রামে গড়ে ওঠে, খেলার ছলে পড়া যে শুধু রাজ্যে নয়, গোটা দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন দিশা দেখাবে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags