সংস্করণ
Bangla

অনলাইন বাণিজ্যে সাফল্য যেন পর্বতশৃঙ্গ জয়ঃ পুণিত সোনি

YS Bengali
7th Dec 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

‘সামিট দেখা যাচ্ছিল। সাফল্যে পৌঁছানোর ধাপগুলি একেবারে চোখের সামনে। মাত্র ৭০০ ফুট দূরে। ঠিক এখানে দাঁড়িয়ে এমন এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হত, যা হয়ত আরও কোনও পর্বতারোহীদের কখনও নিতে হয়নি। সামনে যাব নাকি বেস ক্যাম্পে ফিরে যাব? দলের এক সদস্যের পালমোনারি এডিমা বা ফুসফুসের সমস্যা শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাকে ফিরে যেতেই হত, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হত আমাদের’-

image


কোটোপাক্সির সামিটে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন পুণিত সোনি। ইকুয়েডোরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৯ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় পৃথিবীর উচ্চতম সক্রিয় আগ্নেগিরি অভিযানে গিয়েছিলেন । সাধারণ মানুষের কাছে পুণিত হলেন ভারতের অন্যতম বড় স্টার্টআপ, ১৫ বিলিয়ন ডলারের সংস্থা ফ্লিপকার্টের সিপিও। মুম্বইয়ের বাবা অ্যাটমিক সেন্টারের বিজ্ঞানীর ছেলের এ এক লম্বা যাত্রা। পুণিতের কাছে এটা শুধু কটোপাক্সি বা পর্বতারোহণ অথবা সামিটে পৌঁছানো নয় বরং ক্ষমতার পরীক্ষা নেওয়া। আসল পরিস্থিতিতে নিজেকে বোঝা। ফ্লিপকার্টের সিপিও হিসেবে পুণিত বিশ্বাস করেন, ই কমার্স বিশ্বে একছত্র আধিপত্য পাওয়ার সঙ্গে সামিট তুলনায় কম কিছু নয়। প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। হতে পারে বিগ বিলিয়ন ডে তেমনই একটা ঘটনা। নিজের ব্লগে পুণিত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। বলেন, ‘আমার মনে আছে, ওই পাঁচ দিনে ১৫ ঘণ্টা মাত্র ঘুমোতে পেরেছিলাম। মধ্যরাত জুড়ে কাউন্টডাউন আর বিনব্যাগে দুপুরের হালকা ঘুম থেকে একটু বদল হয়েছিল বটে। বেঙ্গালুরুর সূর্যের তেজ থেকে বেরিয়ে ভালোই লাগছিল। ৬ ঘণ্টার ঝড়ে আমি চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, ইঞ্জিনিয়ার, রাজমিস্ত্রী, ডেলিভারি শ্রমিক, বাড়ির কাজের লোক, বাচ্চা, নিরাপত্তারক্ষী সবার সঙ্গে দেখা করেছি। গোডাউন, কনস্ট্রাকশন সাইট স্কুল, ফার্নিচার স্টার্টআপ এবং কিছু অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে গিয়েছি’।

image


সবসময় পুণিত নতুন কিছু শিখছে। নিজের ক্ষমতা যাচাই করে নিচ্ছে। আরামের জীবন ছেড়ে বেরিয়ে আসার কথা ভাবতেই শুরু হয়ে যায় নতুন যাত্রা। আমেরিকার উমিং ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর হন। সমুদ্রপৃষ্ঠের ব্যস্ত শহর থেকে পাথুরে পাহাড়ে ঘেরা মালভূমি উমিং পুণিতের জীবনের মানেটাই পালটে দিয়েছিল। ‘আমার মনে আছে নিজের আইডি নিতে গিয়ে ইউনিভার্সিটির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক পথচারী হেঁসেছিলেন। আমার কাছে সেটা ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। মনে হয়েছিল, যদি মোট জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ এক একটা রিজিওনে থাকে তাহলে সবাই সবাইকে চিনবেন’, বলেন পুণিত। স্নাতকের পর যখন চাকরি খুঁজছিলেন, বুঝতে পেরেছিলেন তাঁকে আরও বেশি কিছু করতে হবে। দারুণ জিআরই এবং জিম্যাট স্কোর, ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ড এবং বে এরিয়ায় কাজ করার পরও আর দশজন ভারতীয় মতো তিনি মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। নিজেকে সবসময় জিজ্ঞাসা করতেন কী করতে পারতেন আর কী করতে চাইছেন। ‘আমি জানি আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। কিন্তু সবচেয়ে ভালো ম্যানেজমেন্টে স্কুলে যোগ দিতে চাই এবং কিছু ভালো ভালো শিক্ষামনষ্ক লোকের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলাম। তাই হোয়ারটন বিজনেস স্কুলে ভর্তির সিদ্ধান্ত নিই’, বলেন পুণিত। নিজের ক্ষমতা বিচারের এই অভ্যেসই পুণিতকে পর্বতারোহণের দিকে ঠেলে দেয়। হোয়ারটনে লিডারশিপ প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে মাউন্টেনিয়ারিংয়ে যোগ দেন।

সহযাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় সামিটের একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে কতগুলি বিকল্প উঠে আসছিল। এক, সামিট করে যারা নেমে আসছিলেন তাদের সঙ্গে নীচে পাঠিয়ে দেওয়া। দুই, হাইক্যাম্পে ছেড়ে যাওয়া, যেখানে বাকিরা সামিট শেষ করে ফিরে আসবে। তিন, অভিযান শেষ না করে ওখান থেকেই ফিরে আসা। চার এবং শেষ বিকল্প হল, অসুস্থ সহযাত্রীকে ফেলে রেখে এগিয়ে যাওয়া। একেবারে অপারগ পরিস্থিতিতে সাধারণত এই বিকল্পের কথা ভাবা হয়। তবে একটা ব্যাপার আগে থেকেই ঠিক ছিল। একজন সামিট করতে না পারলে বাকিরাও নয়। অসুস্থ সহযাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন পুণিতরা। বন্ধুকে নামিয়ে আনার জন্য একপ্রেস ইঞ্জিন তৈরি করার কথা ভাবা হল। কী এই এক্সপ্রেস ইঞ্জিন? একজন দড়ির ছোট প্রান্ত ধরে থাকবে অন্য জন লম্বা প্রান্তটি ধরে থাকবে। যিনি লম্বা প্রান্ত ধরে টানবেন আর অন্যরা অসুস্থ ব্যক্তিকে নামার সময় দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করবেন। ‘পাহাড়ে আমি বহুবার হেরেছি। আর সেই হারা মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। তার থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তারমধ্যে একটা হল-হার বলে কিছু নেই। অন্যটা হল, কীভাবে সবার সঙ্গে জুড়ে থাকতে হয়। সেটাও একটা বড় শিক্ষা। যদি লিডার হন,জানবেন একটা দলের চেষ্টায় আপনিও এগিয়ে যাচ্ছেন। আর তৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার শিক্ষা দেয় পর্বতারোহণ’, বলেন পুণিত। হেরে গেলে কীভাবে উঠে দাঁড়াতে হয় এই শিক্ষা পুণিত শুধু পর্বতারোহণ থেকেই নেননি বরং কর্পোরেট দুনিয়ার উত্থান-পতন থেকেও অনেক কিছু শিখেছেন।

image


কিন্তু পর্বতারোহণ বা কটোপাক্সি পুণিতের চলার পথের কিছু বাঁক মাত্র। যখনই পুণিত নিজের ক্ষমতা বিচার করার চেষ্টা করছেন, প্রতিবারই নতুন কিছু চেষ্টা করছেন। ম্যারাথন দৌড় বা পর্বতারোহণ তার এক একটা ধাপ। শিশু মনোবিজ্ঞান পড়া হল আরেকটা ধাপ। ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে মনোবিজ্ঞান? পুণিত বলেন, মনোবিজ্ঞান তাঁকে বেশ টানে। নিজেকে আরও জানতে মনোবিজ্ঞানের কোর্সে ভর্তি হয়ে যান। এখানে সাত বছরের শিশু ডমিনিকের সঙ্গে আলাপ হয় পুণিতের। স্পেনীয় বংশদ্ভুত এক শিশুর সঙ্গে ভারতীয় এক ইঞ্জিনিয়ার-অদ্ভুত পরিস্থিতি। ‘আমার কাছ থেকে বাচ্চাটা কিছু শেখার চেয়ে আমিই বরঞ্চ ওর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখে নিচ্ছিলাম’, বলেন পুণিত। এখনও ডমিনিকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। ‘আমার কাছে এটা একটা বড় প্রাপ্তি। ডমিনিকের জন্য অন্য ধরনের টান অনুভব করি’, বলেন পুণিত। এভাবে নানা বিষয়ে পুণিতের চেষ্টা জারি ছিল। বলেন, ‘ঘোরাটোপে বসে থাকব,তেমন লোক নই আমি। মনের ডাকে সাড়া দিই। ৮০ শতাংশ ঠিক হবে, ২০ শতাংশ হয়ত ভুল। ঠিক আছে। কিছু না করে বসে থাকার চাইতে, ভুল থেকে শুধরে নেওয়া ভালো’।

অনেকে ভাবেন পরীক্ষা দিচ্ছেন। পুণিতের মতে, এভাবে দেখা উচিত নয়। আসল হল, নিজের নিজের ঢাক পেটাতে যাওয়া। ‘যেখানই যাওয়া হোক না কেন, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। হতে পারে স্টেজে দাঁড়িয়ে হাজার দর্শকের সামনে কিছু বলা বা ইন্টারভিউ দিতে যাওয়া অথবা টিম মিটিং। নিজেকে ছাপিয়ে অনেক বেশি জানতে হবে। মনে রাখতে হবে এগুলি এক একটা উপলক্ষ নিজের সেরাটা বের করে আনার’, নিজের জীবন থেকে উপলব্ধি ফ্লিপকার্ট সিপিওর। কটোপাক্সির সামিট হয়ত অনেক দূরে। কিন্তু সেই অভিযান যা শিখিয়েছিল, কোনও ক্লাসরুমই হয়ত সেই শিক্ষা দিতে পারত না।

লেখক-সিন্ধু কাশ্যপ

অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags