সংস্করণ
Bangla

গেছোদাদার CarToon গাড়িতে তোলপাড় কলকাতা

4th Feb 2018
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

আস্ত বাগান মাথায় করে কলকাতার রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় একটা ট্যাক্সি। সে অনেকদিন ধরেই চলছে। একবার ধর্মতলায় তার সঙ্গে দেখা। খুব তাড়া ছিল। আমি একটি ওলায় করে ছুটছিলাম বেহালার দিকে। রেড রোড ধরে ওটাও ছুটে আসছিল আকাশবাণীর দিকে হুস করে ছুটে গেল। ফলে আলাপ হয়নি। কিন্তু ওর গাড়িটি দেখে চক্ষু ছানাবড়া। মাথায় সবুজ ঘাসের গালিচা। কাচের ভিতর থেকে দেখা যাচ্ছে সিটের পিছনে রাখা বনসাই। ড্রাইভারের সামনে বাঁদিকেও গাছ পালা। হলুদ রঙের সবুজ ট্যাক্সি। তখন থেকেই লোকটিকে খুঁজছি। এই বিশাল শহরে লক্ষ লক্ষ ট্যাক্সির মধ্যে কোথায় যে খুঁজে পাবো। একে তাকে জিজ্ঞেস করায় জানা গেল শহরের প্রায় সব ট্যাক্সিওয়ালাই ওকে চেনেন। মুখে মুখে ফেরে বাপিদার নাম। ফেসবুকে একবার সার্চ করতেই ভেসে উঠল বেশ কয়েকটা পোস্ট। পাওয়া গেল একটা দিশা। জানতে পারলাম লোকটির নাম ধনঞ্জয় চক্রবর্তী। টালিগঞ্জ করুণাময়ী স্ট্যান্ডে গেলে দেখা হতে পারে। বার দুয়েক ট্রাই নিয়ে বুঝলাম লোকটা রীতিমত গেছো দাদা। ফাঁক ফোঁকড় গলে কোথায় যে পালিয়ে যান তা বোঝা দায়। এখন অবশ্য গেছো দাদাদের পাকড়াও করার জন্যে মুঠো ফোন থাকে। কিন্তু কী মুশকিল সেটাও অধিকাংশ সময় নট রিচেবল। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে ফাইনালি পাওয়া গেল। গেছো দাদা। ওরফে বাপি দা। থুরি ধনঞ্জয় বাবুকে।

image


এবার অন্য একটি গাড়ি দেখালেন। সাদা। সারা গায়ে আঁকিবুঁকি। গাড়ির নাম রেখেছেন ‘Car-toon’। ওই অ্যাম্বাসেডরের ছাদেও বাপিদার ট্রেডমার্ক ঘাসের আস্তরণ। গায়ে আর ভিতরে বাইরে নানান কমিক চরিত্র, ডুডুল, বাঙালি জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকা নানাকিছুর মোটিফ, প্রকৃতি রক্ষার শ্লোগান, ডুডুলের ভিড়ে হঠাৎ ব্যঙ্গভরা মুখে উঁকি মারছেন বিগ বি, বাঙালির ফুটবল জ্বর আর রসিক বাঙালির লালসার রসগোল্লা। সব পাবেন গ্রাফিত্তিতে। বাপিদার ‘Car-toon’ চলমান অভিজ্ঞতাই বটে!

টালিগঞ্জ করুণাময়ী ট্যাক্সি স্ট্যাঅন্ডে ঘাসের ছাদ দেওয়া বাপিদার ‘গ্রিন’ হলুদ ট্যাক্সি ইতিমধ্যেই হিট। ছোটবেলা থেকে গাছ ভালোবাসেন। বাড়ির আশেপাশে বাহারি গাছ লাগানোই ছিল নেশা। বছর পাঁচেক আগে রাস্তায় ‘গ্রিন’ ট্যাক্সিটি নামিয়েছিলেন। একটা খালি মদের বোতল পেয়ে তাতে‍ পাতাবাহার রেখে দিয়েছিলেন ট্যাক্সিতে। কদিন পর দেখলেন বেশ বড় হচ্ছে গাছটা। তখনই ট্যায়ক্সিতে বাহারি গাছ রাখার কথা ভাবেন, নতুন ‘Car-toon’ রাস্তায় নামিয়েও পুরনো হলুদ ট্যাক্সিটার সঙ্গ ছাড়তে চান না। নতুন ‘Car-toon’ ক্যাবের কথা বলতে গিয়েও মাঝে মাঝে পুরনোতেই ফিরে যান বাপি। নতুন ‘Car-toon’ ক্যাবটি প্রাইভেট কার যাকে কলকাতায় হেরিটেজ টু‍রে ব্যবহার করতে চান। ‘বহু পুরনো অজানা লুকোনো ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে এই শহরের আনাচে কানাচে। ওর স্বপ্ন সেই ইতিহাসকে খুঁচিয়ে বের করে সবার সামনে মেলে ধরা’, নতুন পরিকল্পনার ঝাঁপি খুলে বসলেন বাপি দা।

মোবাইলের যুগে মজাদার সব কার্টুন চরিত্র হারিয়ে যেতে বসেছে বলে মনে করেন তিনি। ‘বাচ্চারা এখন আর মোটেও কার্টুন দেখে না। হাঁদাভোঁদা, বাটুল দি গ্রেট, নন্টে ফন্টে এসবও তো আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ সেই থেকেই ভাবনা শুরু। নতুন বড় গাড়ি কেনার টাকা নেই। অত বড় গাড়ি ওর পক্ষে এঁকে সাজিয়ে তোলাও সম্ভব নয়। শিল্পী প্রদীপ মৈত্র গাড়িটি ওকে উপহার দেন। তাছাড়া Cartoodal নামে একটি গ্রুপ এগিয়ে এসে বিনা খরচায় ওর গাড়িটি ডুডুলে ভরিয়ে তোলে। তাই ওই গোষ্ঠীর কাছে ভীষণই কৃতজ্ঞ বাপি দা। বলছিলেন তিনি শুধু কার্টুনেই সন্তুষ্ট নন। নানা পরিকল্পনা ঘুরে বেড়ায় মাথায়। এবার ভেবেছেন বাচ্চাদের জন্য ছোট লাইব্রেরিও রাখবেন গাড়ি ভিতর।

দিনভর রাস্তায় থাকেন গাড়ি নিয়ে। ট্যাক্সি রিফিউজাল একদম মানতে পারেন না। মিটারে যা ওঠে তাতেই সন্তুষ্ট। বাড়তি ভাড়া চাওয়ার মানেই নেই। যদিও বারবার পেট্রোল, ডিজেলের দাম বাড়লেও ট্যাক্সি ভাড়া বাড়েনি অনেকদিন তা নিয়ে উদ্বেগও আছে বাপিদার। তবে পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগটাই সব থেকে বেশি। বলছিলেন এত দূষণ দুনিয়াটার যে কী হবে তা কি কেউ জানে। গাছ লাগানোটা খুব জরুরি। রাস্তার দুধারে গাছ থাকুক চান এই পরিবেশবিদ ট্যাক্সিওয়ালা। চান লোকের বাড়ির সামনের সামান্য জায়গাটুকুতেই বরং একটা গাছ হাত পা মেলুক না। তাই পরিকল্পনা করেছেন ওর গাড়িতে চড়লেই ভ্রমণ শেষে প্রত্যেককে একটি করে গাছের চারা দেবেন বাপি দা। এমনই অভিনব সব আইডিয়া মাথার ভিতর ঘোরে লোকটার। সব আইডিয়ার কেন্দ্রেই পরিবেশ রক্ষার তাগিদ মুচকি হাসে। ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদও টের পান খুব বেশি না লেখা পড়া শেখা অথচ অনেকের থেকে অনেক বেশি শিক্ষিত এই ট্যাকক্সিচালক। স্টিয়ারিং হাতেও তিনি উন্নত ভারতের স্বপ্ন দেখেন। ওর বাড়ির সবাই ওকে পাগল ভাবেন। বেশ বিরক্ত। বলেন এসব করে লাভটা কী? উত্তর একটাই, মানসিক শান্তি। হেসে ফেলেন বাপিদা।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags