সংস্করণ
Bangla

গঙ্গা বাঁচাতে মারথান-ভালির লড়াইয়ে নাসিরুদ্দিন শাহ

26th Aug 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

গঙ্গায় স্নান করলে নাকি সব পাপ ধুয়ে যাবে। রীতি মেনে আজও তাই চলে আসছে পূণ্যতিথিতে পূণ্যস্নান। কিন্তু যারা পূণ্যলাভের আশায় গঙ্গায় ডুব দিচ্ছেন তারা কি জানেন পাপ ধোয়ার হিড়িকে প্রতিনিয়ত কতটা কলঙ্কিত হচ্ছেন মা গঙ্গা-হিন্দু সম্প্রদায়ের সবেচেয় পবিত্র নদী?

image


লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণভোমরা গঙ্গা। অথচ একের পর এক জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হওযার পর গতি ব্য়হত হযেছে গঙ্গার। তার ওপর তো দূষণ, আবর্জনা ফেলে ফেলে নদিটার প্রাণ ওষ্ঠাগত। অনেক জায়গাতেই গঙ্গার গতিপথ শুকিয়ে কাঠ। দূষণের তালিকায় বিশ্বের পাঁচটি নদীর মধ্যে ভারতের গঙ্গাই দীর্ঘতম। গঙ্গার দূষণ নিয়ে নানা খবর, গবেষণা, দিস্তা দিস্তা রিপোর্ট, দূষণ রোধে পরিকল্পনা, সংরক্ষণের ভাবনা আর এইসব নিয়ে খবরের কাগজে পাতার পর পাতা ছাপা হয়ে যাচ্ছে। নিউজ চ্যানেলের গুরুত্বপূর্ণ স্লটে আলোচনার পর আলোচনা চলছে। কিন্তু কোথায় কী, ভবি ভোলার নয়। গঙ্গা যে কে সেই। আমরা যারা এই নদীর উপর নির্ভরশীল,নদীর আশেপাশে বাসকরি তাদের একটা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন মনষ্কদেরও একই রকম বক্তব্য রয়েছে গঙ্গার দূষণ নিয়ে। এর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই অযাচিত ভাবে নাক গলিয়ে ফেলেছেন রাজনীতিবিদ এবং ধর্মীয় দলগুলি। মানুষের দাবির কাছে কোথাও চাপে আছে শক্তি উৎপাদক সংস্থাগুলি। আবার কোথাও মানুষের জীবন জীবিকাকে পণ রেখে তারাই চাপ তৈরি করছে। তাদের নানা লবি। ভূতত্ববিদ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং নদীবিশারদেরাও এই তরজায় অসহায় ভাবে হাজির। সব মিলিয়ে গঙ্গার দূষণ এখন জটিলতম সমস্যা। নানা জনের নানা কায়েমী স্বার্থ। গঙ্গা বাঁচাতে একের পর এক লোক দেখানো পদক্ষেপ, তাতে আশার আলো তো দূর, বরং দুর্নীতির অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে গঙ্গা। যত দিন যাচ্ছে পরিস্থিতির জল তত ঘোলা হচ্ছে।

শান্ত নদীটি, পটে আঁকা ছবিটি...

উদ্যোগ আছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হয়নি কোনটাই। গঙ্গার ধারা ক্রমশ শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হচ্ছে। গঙ্গা বাঁচাতে হাজারো উদ্যোগের ভিড়ে একফালি আলো, রিটার্ন অব দ্যা গঙ্গা, একটি তথ্যচিত্র।

image


তিনটি ভাগে তৈরি হয়েছে তথ্যচিত্রটি। আর তথ্যচিত্রের স্রষ্টা দুই বিন্দানা ভাই-বোন।মারথান বিন্দানা এবং ভালি বিন্দানা।‌ যাকে বলে পাগলের মতো ভালোবাসা-গঙ্গার সঙ্গে দুই ভাই-বোনের সম্পর্ক অনেকটা সেরকমই। সেই ভালোবাসা থেকে গঙ্গা বাঁচানোর ভাবনা।গঙ্গা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে তথ্যচিত্রর মাধ্যমে ক্যাম্পেইন করবেন ঠিক করলেন দুজনে। যেই ভাবা সেই কাজ।পুঁজি বলতে সামান্য টাকা আর অভিজ্ঞতার ঝুলি একেবারেই ফাঁকা।তথ্যচিত্র বানিয়ে কতটা কী লাভ হবে,খরচের টাকা আদৌ উঠে আসবে কিনা একবার ভেবেও দেখেননি। ঠিক কোন ভাবনা থেকে তথ্যচিত্রের জন্ম বলতে গিয়ে ভালি বিন্দানা জানান, ‘রিটার্ন অব দ্য গঙ্গা, তিনটি অংশে একটি তথ্যচিত্র। এখানে দেখা যাবে জল, মাটি,মানুষের মধ্যে সংরক্ষণ এবং শোষণের অবিরাম সংঘাত।তথ্যচিত্রটির মূল অংশ জুড়ে আছে কীভাবে বাঁধগুলি শুষে নিচ্ছে গঙ্গাকে। আমরা দেখানোর চেষ্টা করেছি কীভাবে গঙ্গার ওপর নির্মিত ৬০০র বেশি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব থেকে তাকে বাঁচানো যায়। উঠে এসেছে বদলে যাওয়া পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের চাওয়া পাওয়ার বদল, দ্রুত বদলে যাওয়া অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে বেঁচে থাকার পথ তৈরি করার নিরলস প্রচেষ্টা’।

মারথান বিন্দানা এবং ভালি বিন্দানার উদ্যোগের পাশে দাঁড়িয়েছেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ

মারথান বিন্দানা এবং ভালি বিন্দানার উদ্যোগের পাশে দাঁড়িয়েছেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ


মারাথান এবংভালির অজানার পথে অথচ রোমাঞ্চকর যাত্রা, শুরু হয়েছিল ২০১২র সেপ্টেম্বরে। প্রথমেই গবেষণার কাজ সেরে নেন। তারপর স্ক্রিপ্ট লেখা।এবার শুরু আসল কাজ, ঘুরে ঘুরে শুটিং। এখনও শুটিং চলছে,সঙ্গে এডিটিং বা সম্পাদনা এবং সর্বশেষ এবং সবচেয়ে জরুরি প্রচারের কাজ। কিন্তু মাঝপথে টাকায় টান পড়ল। এতটা এসে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। টাকার অভাবে প্রডাকশন প্রায় বন্ধ। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ভালি শোনালেন অন্য গল্প। 

রিটার্ন অব দ্যা গঙ্গা ব্যাপকভাবে পাশে পেয়েছিল ভারতের এবং পরে আন্তর্জাতিক সংরক্ষণবাদীদের। যদিও, ‘পরিবেশ,গ্রামোন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রক দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। আমরা চেয়েছিলাম সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞরা আসুন,তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন। কিন্তু এখনও সেই সৌভাগ্য হয়নি। তবে হাল ছাড়িনি,চেষ্টা চালিয়ে যাচ্চি’, বললেন ভালি। ফান্ড জোগাড় করা ভালই মুশকিলের হয়ে দাঁড়াল এবার। বুঝতে পারছিলেন সময় লাগবে। একই সঙ্গে আবার চাইছিলেন বর্ষার ঠিক পরে, শ্রীনগর ডোবার মুখে সেই সময়টায় তথ্যচিত্র প্রকাশ করতে।এতগুলো টাকা একসঙ্গে সেই সময়টায় পাওয়া গেল না এবং তথ্যচিত্রও থমকে গেল।খানিকটা নিমরাজি হয়েই এবার চাঁদা তোলা শুরু হল। যেখান থেকে যা পাওয়া যাচ্ছিল তাই সই। এরমধ্যে তথ্যচিত্রর কাজ এগোচ্ছিল অন্যভাবে। গঙ্গা নিয়ে আরও অনেক তথ্যসংগ্রহ শুরু করলেন। কথা বললেন এক য়ুগ ধরে যাঁরা নিরলসভাবে এই কাজটাই করছিলেন সেই সব বিশেষজ্ঞদের কাছে। ‌যন্ত্রপাতি যোগাড় করে এগুলি কীভাবে ব্যাবহার করা যায় তার অনুশীলণ করে যাচ্ছিলেন। তখনও কিছু শুটিং বাকি, প্রয়োজন লাখ খানেক টাকা, হেসে বললেন ভালি। 

গঙ্গা বাঁচানোর এই উদ্যোগ মারথান এবং ভালির জন্য একটা অন্যরকম আবেগের। তথ্যচিত্র বানাতে গিয়ে এমন অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে যারা শুনেই নাক সিঁটকেছেন।সাফ বলেছেন,শুধু সময় নষ্ট। এতকিছুর মধ্যেও নিস্বার্থ সমর্থন মিলেছিল বিশিষ্ট অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহর কাছ থেকে। অন্তর্মুখী প্রচারবিমুখ এই এই অভিনেতা বলেন, ‘গঙ্গা প্রকল্পে আমার ছোট্ট অংশ গ্রহণ নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের প্রচারের কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু ভেবে দেখুন উত্তরাখণ্ডে কী বিপর্যয় হয়ে গেল। প্রতি বছর এই অবস্থা চলছেই।এটা আমাদের সবার দায়িত্ব তাদের হাত থেকে প্রকৃতির ক্ষতি রোখা, যারা জঙ্গলের পর জঙ্গল উড়িয়ে সাফ করে দিচ্ছে, পাথর কেটে পাহাড় গায়েব করে ফেলছে এবং অপ্রয়োজনে বাঁধ দিচ্ছে নদীতে।অনেক ক্ষতি হয়েছে যা পূরণ করা সম্ভব নয়। তারপরও অন্তত একটা সচেতনতা তো তৈরি করতেই পারি। এখনই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তবুও অন্তত যেন বলার সুয়োগ না থাকে যে আমরা চষ্টা করিনি’।

গঙ্গা একা নয়,

প্রায় সবকটা বড় নদীর এক অবস্থা। ‘আমরা গঙ্গাকে বেছে নিয়েছিলাম কারণ যদি সবাই মিলে গঙ্গাকে বাঁচাতে পারি তাহলে অন্য নদীগুলিরও বাঁচার একটা সুযোগ থাকবে’, উপলব্ধি ভালির। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তথ্যচিত্রটি তৈরি করতে যারা সাহায্য করেছেন‌, তাদের সবার কাছে দুজনে কৃতজ্ঞ, বললেন ভালি। দুজনেই চান, তথ্যচিত্রটি তাদের জন্য পরিবেশিত হোক, যারা নীতি নির্ধারক, সরকারকে সচেতন করবে এবং প্রকৃতির প্রতি সচেতনতাকে প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে জুড়ে নিতে সাহায়্য করবেন। তাঁরা চান, শহরের মানুষ গ্রামের বিষয়ে সংবেদনশীল হোন, মানুষকে জানানো যে আরও ভালো কিছু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এবং সর্বোপরি পরিবর্তনের জন্য আওয়াজ তুলতে হবে।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags