সংস্করণ
Bangla

গ্রামীণ ভারতের উন্নয়নে দুই তরুণের উড়ান

দেশের পিছিয়ে পড়া এলাকায় সমাজসেবী সংস্থাগুলি কী চায়? কাজ কীভাবে সহজ করা যায়? এগিয়ে এলেন দুই তরুণ গ্ৰ্যাজুয়েট।

Rajdulal Mukherjee
24th Aug 2015
Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share
image


ইনস্টিটিউট অব রুরাল ম্যানেজমেন্ট আনন্দ-এ (IRMA) স্বপ্নিল আগরওয়াল ও সুনন্দন মদন কাজ শুরু করেন সামাজিক ক্ষেত্রে তৃণমূলস্তরের সংস্থার জন্য ডিজিটাইজ অপারেশনাল প্রসেসের একটা ছোট দায়িত্ব নিয়ে। কোর্স শেষ হওয়ার মুখে দুজনে যান আগা খান রুরাল সাপোর্ট প্রোগ্র্যামে (AKRSP) অংশ নিতে। দক্ষিণ গুজরাটের প্রায় দেড়শো গ্রাম ছিল সেই প্রজেক্টের আওতায়। সেইসময় স্বপ্নিল ও সুনন্দন লক্ষ্য করেন, ফিল্ড ওয়ার্কাররা ডেটা ওয়ার্ক নিয়েই বেশি ব্যস্ত। যাঁদের জন্য তাঁরা কাজ করতে এসেছেন সেইসব গ্রামবাসীদের সঙ্গে তাঁরা কথা বলারই ফুরসত পাচ্ছেন না। আগা খান রুরাল সাপোর্ট প্রোগ্যামের প্রয়োজন অনুযায়ী দুজনে মিলে এর একটা সমাধান বের করেন। ডেটা নির্ভরতা কমাতে তাঁরা ব্যবস্থা করেন এই কাজের উপযোগী সফটওয়্যারের।

গ্রামীণ ব্যবস্থাপণা বা রুরাল ম্যানেজমেন্টে স্বপ্নিলের আগ্রহ তুঙ্গে ওঠে যখন সে দেখে সমাজসেবা মূলক সংস্থাগুলিতে প্রযুক্তির ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। এর অবশ্য কারণও ছিল। হাতের কাছে প্রযুক্তির ব্যবহার জানা লোক নেই। তাছাড়া অধিকাংশ জায়গা অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া এলাকায়। যদিও কাজের বহর কম নয়। যদি তুলনামূলক দৃষ্টিতে দেখা যায়, শহুরে এলাকায় যে ধরনের কাজ করতে গুগল ড্রাইভ বা ড্রপ বক্সের সাহায্য নেওয়া হয়, সেই একই কাজ এখানে হচ্ছে হাতে লিখে। এই ঘাটতি মেটাতে তৎপর হলেন দুই বন্ধু। নজর দেওয়া হল লোকাল সোর্স সফটওয়্যারকে ব্যবহার করে ডেটা কালেকশনে। যার ফলে কাগজের ব্যবহার কমিয়ে খরচ কমবে। সেটাই হল যা তাঁরা চেয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেল এই ধরনের ছোট প্রকল্পে কাজ করে তাঁদের যা রোজগার হচ্ছে তাতে সাংসারিক প্রয়োজন মিটছে না। দুজনেই চাকরি নিলেন। কিন্তু অবসর সময়ে এটাকে তাঁরা চালিয়ে যাবেন বলেই মনস্থির করে ফেললেন। সুনন্দন যোগ দিলেন একটি এনজিও-তে। আর চাকরি করতে স্বপ্নিল গেলেন দুবাই। কিন্তু তিন-চার মাস কাজ করার পরে তাঁরা নিজেরাই নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে শুরু করে দিলেন। এ তাঁরা কী করছেন, কেনই বা করছেন। দুই বন্ধু সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা ধওয়ানি রুরাল ইনফর্মেশন সিস্টেমস চালু করবেন। কিন্তু চাকরি ছাড়বেন না। চাকরি করার পাশাপাশিই এটা তাঁরা করবেন। সেভাবেই এগোতে থাকলেন তাঁরা। কিন্তু তাতেও ব্যাপারটা যেন ঠিক দাঁড়াচ্ছিল না। কেউ-কেউ তাঁদের পরামর্শ দিলেন, যদি কিছু করতেই হয় তাহলে চাকরিবাকরি ছেড়ে এই কাজেই সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করা উচিত। মাস কয়েক পরে দুবাই থেকে ফিরে বেরিয়ে পড়লেন স্বপ্নিল। সুনন্দনকে সঙ্গী করে বোঝার চেষ্টা করলেন ভারতে সামাজিক ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ কতটা রয়েছে। কথা বললেন বহু এনজিও, এনপিও, অনুদানকারীদের সঙ্গে।

এক বছর কাজ করার পরে ধওয়ানি রুরাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের হাতে এখন ১০টি ক্লায়েন্ট। দৈনন্দিন কাজকে কীভাবে সহজ করা যায় সেটাই লক্ষ্য ধওয়ানির। স্বপ্নিল বলেন, "অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম ও ডেটাবেস প্ল্যাটফর্ম ক্লায়েন্টদের ছিলই। অভাব যেটা ছিল সেটা অ্যাপ্লিকেশনের। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁদের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করতাম, ঠিক কেমনটা হলে তাঁদের কাজ সহজ হতে পারে, সেটা ODK হতে পারে, আবার ক্লাউড টেলিফোনিও হতে পারে।" ক্লায়েন্টদের আরও ভালো পরিষেবা দিতে এই কাজে তাঁরা সহায়তা নিলেন ইঞ্জিনিয়ারদেরও। কিন্তু রোজগার? স্বপ্নিলের কথায়, "দেখুন এইসব সমাজ উন্নয়নমূলক সংস্থার খরচখরচা কীভাবে কমান যায় সেটাই আমাদের লক্ষ্য। অধিকাংশ তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাই এদের কোনও পরিষেবা দিতে চায় না। সবাই লাভের দিকটা দেখে। আমরা কিন্তু লাভের দিকে তাকিয়ে কিছু করছি না। যা কিছু করছি একটা প্যাশন থেকে। এটাকে টাকাকড়ি দিয়ে মাপা যায় না।"

ধওয়ানির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অবশ্য একটা আশার আলোও পেয়েছেন স্বপ্নিলরা। তাঁদের কাজের মূল লক্ষ্যই হল কাগজের ব্যবহার কমিয়ে খরচ কমানো, সময় ও শ্রম কমিয়ে কাজ সহজ করা। সামাজিক ক্ষেত্রের এই ধরনের সংস্থাগুলির কাজের ধরন মোটামুটি একইরকম। ডেটা কালেকশন, ডেটা অ্যানালিসিস, ইন্টেলিজেন্ট টাস্ক ও IVR প্রযুক্তি। এই কাজগুলির জন্য একটি কমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার কাজে হাত লাগিয়েছেন তাঁরা। যাতে সবাই এর সুযোগ নিতে পারে।

ভারতে সামাজিক ক্ষেত্রে কাজ করা সংস্থাগুলির মান আরও বৃদ্ধি হওয়া উচিত বলে মনে করেন স্বপ্নিল। দেখা যায়, এই ধরনের সংস্থাগুলির অধিকাংশ কিছু শুকনো তথ্য সংগ্রহকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলছে। পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সেভাবে মুখোমুখি সংযোগ গড়ে উঠছে না। অথচ এ ব্যাপারে খুব একটা ভাবিতও নয় অর্থদানকারী সংস্থা বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি। তথ্য সংগ্রহ আর রিপোর্ট তৈরি, এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে ব্যাপারটা। সেখানেই নজর দিতে চায় ধওয়ানি। তথ্য সংগ্রহের মতো মেকানিক্যাল কাজ ছেড়ে কর্মীরা আরও বেশি মনোনিবেশ করুক গ্রামীণ সমস্যার বিষয়ে জানতে। এজন্য তাঁরা সফটওয়্যার তৈরি করতে চান আঞ্চলিক ভাষাতেই। যাতে খুব বেশি পড়াশোনা না জানা ব্যক্তিও এর সুবিধা নিতে পারেন।

বৃহৎ অর্থ প্রদানকারী সংস্থাগুলির এনজিও-র থেকে প্রত্যাশা বেশি। কম আর্থিক অনুদানকারী সংস্থাগুলি আবার মোটামুটি এক্সেল শিটে কাজ হলেই খুশি। এর মধ্যে আবার সরকারি উপস্থিতি থাকলে বিষয়টা অন্য মাত্রা পায়। ঢুকে পড়ে আমলাতন্ত্র। স্বপ্নিল বলেন, "কর্মীরা ভাবেন, আমরা তাঁদের কাজে নজর রাখছি। আসলে স্বচ্ছতা আর দায়বদ্ধতা- দুটির জন্যই ডিজিটাইজেশন ও ডেটা অটোমেশন জরুরি বলে মনে করে ধওয়ানি। ঠিক এইরকম সমস্যা হয়েছিল যখন মধ্যপ্রদেশ সরকারের মাদার অ্যান্ড চাইল্ড ট্রাকিং সিস্টেম-এ সহায়তা করার কথা বলা হয়েছিল ধওয়ানিকে। প্রথমে যে আইপিএস অফিসারকে দেওয়া হয় তিনি কয়েকদিনের মধ্যেই বদলি হয়ে যান, এর পর যিনি আসেন তিনি ব্যাপারটি নিয়ে আগ্রহীই নন।"

গ্রামীণ ভারত কী চায়। সেটাই খুঁজে বের করতে চায় ধওয়ানি। ওপর-ওপর জেনে কিছু একটা সমাধান চাপিয়ে দেওয়া নয়। মানুষের সঙ্গে বেশি-বেশি করে মিশে সমস্যার গভীরে গিয়ে সহজ সমাধান খোঁজা। সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছেন স্বপ্নিল আর সুনন্দন।

Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags