সংস্করণ
Bangla

কাচ দিয়ে চিরস্থায়ী স্বর্গ গড়েছেন শিল্পী রেশমি দে

24th Jan 2018
Add to
Shares
44
Comments
Share This
Add to
Shares
44
Comments
Share

রেশমির গল্পটা ঠিক যেন একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতই খুব লাজুক ছিলেন রেশমি। বাবাকে যমের মত ভয় পেতেন। যত আবদার ছিল মায়ের কাছে। আজ রেশমির গোটা দুনিয়া জুড়ে নামডাক। পত্রপত্রিকায় তাঁর কাহিনি। তাঁর সাফল্য সকলেই পড়েছেন। কিন্তু ওঁর বেড়ে ওঠার গল্পটাও কি চমৎকার সেকথা অনেকেই জানেন না।

image


রেশমি দে। ভারতীয় মহিলা গ্লাস আর্টিস্ট। দিল্লিতে তার গ্লাস সূত্রর স্টুডিওয় রীতিমত ভিড় জমে। গলিত কাচে ফুঁ দিয়ে নানান শিল্পের জন্ম দেন রেশমি। সকলের সামনেই বানিয়ে তোলেন অনন্য সব শিল্প। স্কুল পড়ুয়া থেকে কর্পোরেট দুনিয়ায় কর্মরত মানুষ কিংবা আপনি যদি শিল্পী হন, কাচ গলিয়ে শিল্প তৈরি করতে চান তবে রেশমির Glass Sutra-য় আপনাকে স্বাগত। সকলের জন্যেই দরজা খোলা। কাচ গলানো, তাই দিয়ে শিল্প বানানোর ইচ্ছে থাকলে শিখে নিতে পারেন গ্লাস সূত্রয় গিয়ে। ৫ হাজার স্কোয়ারফিটে এধরণের বিশাল স্থায়ী কর্মশালা এ দেশে প্রথম। জানেন কি ছোটবেলায় রেশমি লেখা পড়ায় এত ভালো ছিলেন যে বাবা মা চাইতেন ও বড় হয়ে আইএএস হন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা আর কিছু বানানোর কাজ পেলে মজে যেতেন। বাবার ইচ্ছায় পড়াশুনো করেছেন ইকনমিক্স আর গণিত নিয়ে। তবে টের পেয়েছিলেন পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তার কম্ম নয়। বরং শিল্পকর্মেই তার সব আগ্রহ।

গ্রাজুয়েশনের পর অসম থেকে দিল্লি চলে আসেন একাই। এসেছিলেন কিন্তু ঠিক কী করবেন তা নিয়ে কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। পড়াশুনো করবেন স্থির করেন। এক বন্ধু বলেছিলেন বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়তে। কিন্তু টাকা পাবেন কোত্থেকে। থাকার জায়গা বলতে এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ পান। আরেক বন্ধুর উপদেশ মেনে চাকরি করতে শুরু করেন। যখন যা করেছেন উৎসাহ যুগিয়ে গিয়েছেন মা। ‘মা বিশ্বাস করতেন। মায়ের বিশ্বাসই সাহস যোগাত’, বলতে গিয়ে চোখের কোণে মণিমুক্তা ঝকমক করে উঠছিল। টাকার অভাবে হেরে যাওয়ার পাত্রী নন রেশমি। ট্র্যাভেল এক্সিকিউটিভের চাকরি জুটিয়ে ফেললেন দ্রুত। ১৯৯৭ সালে একটা এডুকেশানাল ট্যুরে ইউরোপ যাওয়ার সুযোগ পান। ট্র্যাভেল এজেন্সির ছোট্ট ক্যারিয়ারে নিজেকে খুঁজে পান তখনও সুপ্ত এই শিল্পী। এখান থেকেই গ্লাস আর্টিস্ট হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখাটাও শুরু হয়।

গল্পটা এরকম। "ইউরোপে একটি দোকানে দেখি লোকজন পুরনো ফেব্রিকস কিনে নিয়ে যাচ্ছে পাপোশ বানাবে বলে। দারুণ সব নকশা। এসব দেখে নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শিল্প সত্ত্বা জেগে ওঠে," হাসেন রেশমি। ট্র্যাভেল এজেন্সির ক্যারিয়ারে ইতি টানেন। এবার ফেব্রিকের জগতে ঢুকে পড়েন। ব্যবসায় হাত পাকানো শুরু হয়। নিজের হাতে তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করতে থাকেন। ‍ব্যবসা চলতে চলতেই এক বন্ধুর পরামর্শে নতুন আইডিয়া মাথাচাড়া দেয়। গ্লাসের ডিজাইন, শোপিস, নানা রঙের গ্লাস ওয়ার্ক‍ যার ওপর নানারকম ডিজাইন, এইসব দেখাতে ডেকে নিয়ে যায় ওই বন্ধু। এক কথায় দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে যান, সেটাই ছিল শুরু, বলছিলেন রেশমি। এবার জানার পালা। কতটা ভঙ্গুর, কীভাবে ক্র্যাক সারানো যাবে, কাঁচামাল কোথা থেকে আসবে—খোঁজখবর শুরু করেন। ‘আসলে যেটা নিজের কাজ সেটা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। ভালো দখল না থাকলে উদ্দেশ্যহীনভাবে ডিজাইন করা যায় না। শিল্পকর্ম মুখের কথা নয়’, বোঝান রেশমি। ‘সেই সময় কাচের নানা জিনিসপত্র আসত ইটালির মোরানো, ইন্দোনেশিয়া থেকে। আর ভারতে সেই কাজগুলি হত ফিরোজাবাদে। এই দেশে কাচ শিল্পের তীর্থক্ষেত্র বলা হত ফিরোজাবাদকে। কাছ থেকে কাচের কাজ পরখ করতে চেয়েছিলেন। কাচের মূর্তি, কাচের বাসনপত্রের প্রেম ওকে টেনে নিয়ে গেল ফিরোজাবাদ। ১৯৯৯ সাল। এভাবেই একটু একটু করে ঢুকে পড়লেন কাচের স্বর্গে। এখন তিনিই এই কাচের স্বর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।

প্রথম থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলেন, কারও অনুকরণ নয়, নিজের ট্রেড মার্ক নিজেই তৈরি করবেন। নানা পরিকল্পনা ভাঁজতে ভাঁজতে ফিরোজাবাদের গোটা তল্লাট ঘুরে দেখলেন কারখানাগুলিতে একজনও মহিলা নেই। রেশমি ছিলেন একা একমাত্র মহিলা যিনি দিনের পর দিন কারখানায় কারখানায় ঘুরছেন। কাচের কারখানায় কারিগরদের কাজ করা দেখছেন দীর্ঘক্ষণ ধরে। অনেকেই ব্যাপারটা নজর করল ঠিকই। কিন্তু অধিকাংশ কারিগরই তার সঙ্গে কাজ করতে চাননি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একজনকে পান যিনি ওর সঙ্গে কাজ করতে রাজি হন। সেই সহৃদয় কারিগরই ওকে শেখান কীভাবে হাপরে ফু দিতে হয়, কীভাবে হাপর কাজ করে, কীভাবে গলিত কাচের পিণ্ডকে বেলুনের মতো ফুলিয়ে দেওয়া যায় তারপর কেটে কীভাবে তৈরি হয় কাচের জার’, লড়াইয়ের দিনগুলির কথা অকপটে বলে যাচ্ছিলেন রেশমি। শিল্প তো অভ্যাসেই ছিল। ফলে মাধ্যম পাল্টাতে বেশি সময় নেননি। একই সময় যখন কাচের নানা শোপিস ডিজাইন করছেন তখনও কাজ শিখে যাচ্ছিলেন। তারই সঙ্গে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল। তাঁর তৈরি জিনিসপত্র কীভাবে কোথায় বিক্রি হবে সেই মার্কেটিংটাও তাঁকেই করতে হয়েছে। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ— সব নিজের হাতেই সেরেছেন রেশমি। ধীরে ধীরে জন্ম নেয় হোম ডেকোর স্টোর Goodearth। রেশমির প্রথম সাফল্যে বলা যায়। একের পর এক হোটেল লবি, স্যালোন, বিদেশে প্রদর্শনী মুখে বলা যতটা সহজ আদতে অতটা সহজ ছিল না। রেশমির কাছে প্রত্যেকটি ছিল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই। কারণ তিনিই প্রথম কাচ শিল্পী নন যার জিনিস বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরনো সেই সব শিল্পীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সমান তালে চলতে হয়েছে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে। রেশমির পরীক্ষা একটু বেশিই কঠিন ছিল কারণ কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। হাতে কলমে কাজ শিখতে শিখতেই টের পাচ্ছিলেন তার আরও জানার খিদে আছে। আধুনিক প্রশিক্ষণ চাই।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেলেন ডাডলিতে। ২০০২ সালে। একটি স্কলারশিপ পেলেন। ব্রিটেনের ইন্টারন্যাশনাল গ্লাস সেন্টারে শিখলেন আরও খুঁটি নাটি। ইটালির কাচ শিল্পীদের কাজ দেখতে ঘুরলেন ভেনিসের মোরানো। যাকে কাচ শিল্পীদের মক্কা বলা হয়। এখান থেকে উঠে এসেছেন, পিনো সিগনোরেত্তো, লিনো তাগলিয়াপিয়েত্রা, ডিনো রোজ়িন-এর মত বিশ্ব বরেণ্য শিল্পীরা। গোটা পৃথিবী ঘুরেছেন রেশমি। যেখানেই শুনেছেন, কোথাও পড়েছেন কাচ শিল্প নিয়ে কাজ হয় সেখানেই পৌঁছে গিয়েছেন। তারপর ফিরে এসেছেন দেশে। ২০০৫ সাল নাগাদ। ফের ফিরোজাবাদ। ফের নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই। এবার ইন্সটলেশন গ্লাস আর্ট আর লাইটিং ইন্সটলেশন নিয়ে কাজ করতে শুরু করলেন। ২০১০ সাল নাগাদ ছড়িয়ে পড়ল খ্যাতি। তখন একের পর এক হোটেলের ইন্টেরিয়র আর এক্সটেরিয়র ইন্সটলেশনের কাজ করছেন। বড় বড় ভিলার অন্দরমহল সাজাচ্ছেন। আর স্বপ্ন দেখছেন নতুন কিছু করার।


অধ্যবসায় আজ রেশমিকে কাচ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। শুরুতে টেবল ওয়্যার তৈরি করতে করতে বড় বড় শোপিস, হ্যান্ডমেড গ্লাস ইন্সটলেশন, ওয়াল স্কালপচার তৈরি করে গিয়েছেন একে একে। নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ করেছেন প্রতি ক্ষেত্রে। ধীরে ধীরে উঁকি দিয়েছে রেশমি ড্রিম প্রজেক্ট বসন্ত কুঞ্জের গ্লাস সূত্র। এটা এমন একটা স্টুডিও দেশি বিদেশি সব শিল্পীর জন্য যেন খোলা মঞ্চ। সব শিল্পীই নিজেদের ইন্সটলেশন প্রদর্শন করতে পারেন। ‘বিদেশে এধরনের স্টুডিও প্রচুর আছে। কিন্তু ভারতে একটিও ছিল না। বানিয়ে ফেললেন সেইটিই। ২০০৭ সালে থেকে ২০১৭-র ডিসেম্বর টানা দশটা বছর ধরে এই ভাবনা ক্রমান্বয়ে আকৃতি পেয়েছে। ৫ হাজার স্কয়ার ফিটের এই বিশাল স্থায়ী কর্মশালা ভারতে উদীয়মান কাচ শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করবে। নিও গ্লাস আর্টের মানচিত্রে ভারতকে দেখতে চান গ্লাস সূত্রের মালকিন।

Add to
Shares
44
Comments
Share This
Add to
Shares
44
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags