সংস্করণ
Bangla

হস্তশিল্পীদের অভিভাবক তেয়াবজি

Tanmay Mukherjee
26th Aug 2015
Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share
লায়লা তেয়াবজি

লায়লা তেয়াবজি


জীবনের পথে কতসব বিচিত্র মোড়। জাপান থেকে ললিত কলা নিয়ে পড়াশোনার শেষে, এখন সদ্য দেশে ফিরেছেন লায়লা তেয়াবজি। ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কিন্তু গুজরাটের কচ্ছে গ্রামীণ হস্তশিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে লায়লা যেন নিজেকে আবিষ্কার করলেন নতুন ভাবে। চোখ খুলে গেল। লায়লা তেয়াবজি বুঝতে পারলেন, ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে এককভাবে কাজ করে টাকা‌-কড়ি মিলতে পারে। যশ-খ্যাতিও আসবে। কিন্তু চরম দারিদ্র, অবহেলা সত্বেও প্রত্যন্ত গ্রামের যে হস্তশিল্পীরা ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাদের জন্য কিছু করতে পারলে মিল‌বে স্বর্গীয় সুখ, পরম তৃপ্তি।

ভাগ্যিস লায়লা কচ্ছে গিয়েছিলেন, তাই বোধহয় ভারতের হস্তশিল্পে জড়িত হাজার লক্ষ মানুষ, বিশেষ করে কারুশিল্পে জড়িত প্রামীণ প্রমিলা সমাজ পেল তাদের অভিভাবককে। ১৯৮১ সালে লায়লা গড়ে তুললেন ‘দস্তকার’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। দস্তকারের উদ্দেশ্য হল ভারতের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের প্রসার এবং এই শিল্পে জড়িত মহিলাদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলা। গ্রামীণ শিল্পীরা যাতে তাদের জিনিসপত্র বিক্রি করতে পারেন, সেজন্য প্রথম বেঙ্গালুরুতে তৈরি করা হয় নেচার-বাজার। শুরুতেই সাড়া পড়ে গেল। দস্তকারের ছত্রছায়ায় এসে মিলল বাজারের সন্ধান। ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে উঠল। প্রত্যন্ত গ্রামের মহিলারা খানিকটা হলেও পেলেন আর্থিক স্বাধীনতা।

দস্তকরের চেয়ারপার্সন লায়লা তেয়াবজির বয়স এখন ৬৬। ইয়োর স্টোরি ডট কমের মুখোমুখি হয়ে স্বীকার করলেন যে সেনা বিমানের পাইলট হওয়ার শখ তাঁর ছিল। কিন্তু সে পেশায় গেলে অনেক কিছু অসম্পূর্ণ থেকে যেত। ‘‘ছেষট্টি বছর বয়স হলেও, আমি কিন্তু প্রতিদিন ভোরে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠি।’’ কাটা-কাটা শব্দে যেন লায়লা বুঝিয়ে দিলেন লাফটা, জরুরি। লাফিয়েই তো ডিঙোতে হয় জীবনের হার্ডল।

লায়লা তেয়াবজি মানেই স্পষ্ট বক্তা। বোহেমিয়ান। শিল্পী। শিল্প রসিক। দস্তকারের মুখ এবং গ্রামীণ কারুশিল্পীদের কাছের মানুষ। যিনি দুঃখ করে বলেন, ‘‘মেট্রো শহর কিংবা বিদেশে বসে তাদের কাজ নিয়ে সমালোচনা করাই যায়। সবাই ভুলে যায়, এ মানুষগুলো তাদের জীবনধারনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলোও মেটাতে পারে না। ভালো কাজের জন্য যে পরিবেশ দরকার সেটাও তাদের নেই।’’

গ্রামীণ অর্থনীতির মূল স্তম্ভ এখনও কৃষিকাজ। কিন্তু ভারতের গ্রামগঞ্জে যত মানুষ কারুশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন তাদের সংখ্যাটা নেহাতই কম নয়। ৭০ লক্ষেরও বেশি সূত্র (অ্যা লাইফলিহুড, দসরা)। আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টায় গ্রামীণ মহিলারা আরও বেশি করে শিল্পকলা এবং হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। শহর এবং গ্রাম মিলিয়ে দেশের সংগঠিত হস্তশিল্পে জড়িত প্রায় দু কোটি তিরিশ লক্ষ মানুষ। লায়লা তেয়াবজি বলেন, ‘‘এদের জন্য চিন্তাভাবা করা দরকার। দরকার বিনিয়োগের।’’

গত তিন দশক ধরে লায়লার তৈরি দস্তকার হয়ে উঠেছে হস্তশিল্পীদের কাছে সেতুর মতো। বিশ্বকে চেনানোর মাধ্যম। যে সেতু দিয়ে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো যায় সহজে। লায়লার মতে হস্তশিল্প হল লিঙ্গ নিরপেক্ষ শিল্প, যাতে যুক্ত হতে পারে গোটা পরিবার। এই কাজে পরিবারে পুরুষদের ভূমিকা থাকে, সমান ভূমিকা থাকে মহিলাদেরও।

প্রশ্ন ওঠে, হস্তশিল্পের উন্নতির জন্য ঠিক কী কী দরকার। ভারতের মতো বিশাল দেশে একা লায়লার পক্ষে তো সবটা সম্ভব নয়। একটা দস্তকার নয়, দরকার অসংখ্য দস্তকারের। স্পষ্টবক্তা লায়লা বলেন, ‘‘সরকারি সাহায্য চাই। সঙ্গে ফ্যাব ইন্ডিয়ার মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যত বেশি এগিয়ে আসবে, ততই মঙ্গল। প্রতিযোগিতা বাড়বে। সঙ্গে বাড়বে শিল্পের মান।’’

পরনে শাড়ি। মুখে হাসি। উঠতি ফ্যাশন ডিজাইনার কিংবা মহিলা উদ্যোগপতিদের উদ্দেশ্যে লায়লার পরামর্শ হল – ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ হ‌স্তশিল্পে রয়েছে বিপুল ভবিষ্যত। প্রতিযোগিতা অনেক কম। আর সত্যিকারের যারা অভাবী তাদের পাশে থাকায় মেলে দ্বিগুণ তৃপ্তি।

Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags