সংস্করণ
Bangla

কলকাতার ফুটপাথে টেস্ট অব সিকিম

Subhasis Chatterjee
10th Feb 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

বিকাল ৫ টা। পাটুলির সামনের রাস্তায় ভিড় করে জনা পাঁচেক লোক। ইতিউতি চেয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছেন তাঁরা। পরে অবশ্য জানা গেল মরে আসা শীতের বিকালে সবাই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে টেস্ট অফ সিকিমের জন্য।‍ আচমকাই সত্যজিৎ রায় পার্কের সামনের রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে ঠেলা নিয়ে আগমন ডিকি শেরপার। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যে হওয়ার মুখে। পাটুলির মোড়ে রোজকার নিয়মে সাজিয়ে বসলেন তাঁর টেস্ট অফ সিকিমের ঝাঁপি। জ্বলছে স্টোভ, তাতে চাপানো অ্যালুমিনিয়ামের ঢাকা পাত্র। যাতে তৈরি হচ্ছে গরম গরম স্যুপ। পাশেই ময়দার লেচি কাটা। আর তাতে পুর ভরে তৈরি হচ্ছে একের পর এক মোমো। এবার বোঝা গেল তো কি এই টেস্ট অফ সিকিম।

image


প্রায় দু’বছর ধরে এমন ভাবেই সুস্বাদু মোমো নিয়ে হাজির বছর চল্লিশের ডিকি শেরপা।নিবাস সুদূর সিকিমের কোন এক প্রত্যন্ত গ্রামে। পরিবার বলতে বাবা মা আর ৫ ভাই বোন। বয়সে বড় ডিকি শেরপা তখন ১৮ ছুঁই ছুঁই। আর পাঁচটা মেয়ের মতোই মনের কোণে একরাশ স্বপ্নের লুকোচুরি খেলা। ঠিক তখনই আক্রান্ত হলেন কিডনির অসুখে। চলে এলেন কলকাতায়। ২০০৮-এ তাঁর মা তাঁকে করলেন কিডনি ডোনেট। তারপর অসুখ সারিয়ে আবার ফিরে যাওয়া পাহাড়ের কোলে। ল্যান্ডস্কেপিং-গার্ডেনিং করেই দিন কাটছিল তাঁর। ছোটবেলা থেকে একটু আধটু গান গাইতেন। তাই কোনও কিছু না ভেবেই বের করে ফেললেন নিজের গানের অ্যালবাম ‘কল্পনা মারুদা’। অর্থ ক্রাইঙ। সব ঠিকই চলছিল কিন্তু………আবার ভাগ্য!! প্রয়োজন হয়ে পড়ল দ্বিতীয়বার কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন তাঁরই এক ভাইয়ের বন্ধু। আর শেষমেশ তাঁর সঙ্গেই গাঁটছড়া বেঁধে আশার আলো বুকে নিয়ে সংসার পাতেন ডিকি শেরপা। বাড়িঘর ছেড়ে পাড়ি জমালেন কলকাতায়। বেলাইন জীবনকে লাইনে ফেরাতে শুরু করলেন মোমোর ব্যবসা। যার বেশিরভাগটাই চলে যায় অসুখের খরচ চালাতে।তাও রোজের যা ইনকাম তাতে করে ঘর ভাড়া জুগিয়ে ব্লাড জোগাঢ় করার টাকাই ঠিক মতো ওঠে না। জীবনের কথা বলতে বলতে নিরাশার এক নির্লিপ্ত ছায়া দেখা দিল তাঁর মুখে। যদি বেশি জনবহুল অঞ্চলে বসার সুযোগ পেতেন তাহলে হয়তো ব্যবসা চোখে দেখা যেত। এমনই জানালেন ডিকি দি।

ভর বিকেলে প্রবল কাজের চাপের মাঝেও অরিজিনাল তিবেতিয়ান মোমোর ডাক তাড়া করে বেড়ায়। থালায় ৬ পিস চিকেন মোমো সঙ্গে গরম গরম স্যুপ আর সিকিম থেকে আনা ডাল্লে লঙ্কার স্পেশাল চাটনি। দাম মাত্র ৫০-৬০ টাকা। শুধু তাই নয়, মোমোর সঙ্গে রয়েছে এগ থুকপা, চিকেন স্টিম রোল এবং চিকেন লেগ ফ্রা্‌ই। কিন্তু সবথেকে লাজাবাব তিবেটিয়ান ছোঁয়ায় তৈরি মোমো। ডিকি-দির মোমো বড় বড় দোকানের মোমোকেও রীতিমতো টক্কর দিতে পারে। কারণ হিলি টাচ বা ডিকি –দি’র কথায় ‘আমাদের রক্তে মোমো’। সন্ধ্যে বাড়তেই খদ্দেরদের লাগামছাড়া ভিড়। আর হবে নাই বা কেন| ডিকি-দির তৈরি চিকেন মোমো হাইজেনিক। আর এর সাথে অ্যাড-অন হিসাবে ডিকি-দি’র আতিথেয়তা। যার টানে দমদম, বারুইপুর, গড়িয়া, গোলপার্ক, দেশপ্রিয় পার্ক ও আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ ছুটে আসেন। আর এই সব মানুষের মধ্যে কেউ বা প্রতিবন্ধী আবার কেউ বা অটো চালক আবার কেউ বা নিছক পথচারী। বাচ্চাদের কাছে ডিকি শেরপা খুব প্রিয়। স্কুল থেকে ফিরে মোমোর টেস্ট নিতে তারা একবার না একবার ঢুঁ মারবেই এই দোকানে। শুধু তাই নয়, রাস্তায় পড়ে থাকা মানসিক বিকারগ্রস্থ মানুষদের পাশেও তিনি। বিনা পয়সায় তাদের হাতে ধরিয়ে দেন মোমোর প্লেট। নিজের পরিবারের মতো করে আঁকড়ে ধরেন তাঁদের। ডিকি শেরপার কথায় সারল্য আর আন্তরিকতা। শুধুমাত্র চিকেন মোমো বিক্রি করেই তাঁর সারাদিনের রোজগার ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা। কিন্তু ঠাণ্ডা মাসে একদিনে তা প্রায় লাফিয়ে অনেকটাই বেড়ে যায়। মোমোর বিভিন্ন ভাগ থাকলেও সিকিমের এই মহিলার কাছে স্টিম মোমোই বেশি প্রেফারেবল।

কথাবার্তার মাঝে মোমোর টেস্ট নিতে আসা অরিজিৎ চৌধুরী’র কথায়, ডিকি-দি’র মোমো একই সঙ্গে অরিজিনাল, হাইজিনিক এবং কোয়ালিটিও বেস্ট। অন্যদিকে তমশ্রী গাঙ্গুলির কাছ থেকে জানা গেল, ‘পাটুলি এলে ডিকি-দি‘র মোমোর টেস্ট না নিয়ে বাড়ি ফিরলে মনে হয় কি যেন একটা অসম্পূর্ণ থেকে গেল’। আবার এই মোমোর সম্পর্কে কারোর প্রতিক্রিয়া অনেকটা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি অভিনীত দশরথ মাঝি চরিত্রের মতো! “শানদার, জবরদস্ত,জিন্দাবাদ”। একটা কথা বলাই যায় মোমোর উৎপত্তি তিব্বতে হলেও ডিকি-দি‘র চিকেন মোমো আপনাকে কলকাতায় বসেই সেই আমেজের স্বাদ দিতে বাধ্য এবং এর টেস্ট গ্রহণ করে আপনিও বলে উঠবেন “হোঠো সে ছুলোতুম..... মেরা গীত অমর কর দো।

পথ নির্দেশিকাঃ গড়িয়া থেকে বাস বা অটো করে পাটুলির মোড়। অন্যদিকে দমদম থেকে মেট্রো করে শহীদ ক্ষুদিরাম মেট্রো করে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বা অটো করে পাটুলির মোড়। বারুইপুর থেকে শিয়ালদাগামী যেকোনো ট্রেনে করে গড়িয়া ষ্টেশন সেখান থেকে বাসে করে পাটুলির মোড়।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags