সংস্করণ
Bangla

দুর্গাপুরের চামড়া দিয়ে বাজার কাপাঁচ্ছে ‘দেশি হ্যাংওভার’

tiasa biswas
30th Aug 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
হিতেশ, ওঙ্কার, আভা

হিতেশ, ওঙ্কার, আভা


পায়ের একজোড়া কোলাপুরি চটি জীবনের মোড়টাই ঘুরিয়ে দেবে,কখনও ভেবেছিলেন হিতেশ কেনজালি? বছর তিনেক আগের কথা। মরুশহর মিশরে ঘুরতে গিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের এই যুবক।পায়ে ছিল কোলাপুরি।মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতেও সবার নজর যায় পায়ের কোলাপুরি জোড়ায়।ব্যাস ওটাই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। ‘দেশি হ্যাংওভার’এর গল্পটা শুরু এখান থেকেই। দেশে ফিরেই প্রথম তিনি যেটা করলেন,তা হল বহুজাতিক সংস্থায় মোটা বেতনের নিশ্চিন্ত চাকরির অফার লেটারটা সরিয়ে রাখলেন। শুরু করলেন তাঁর স্টার্ট-আপ। সঙ্গে পেলেন বন্ধু ওমকার পানধারকামে আর আভা আগরওয়ালকে। ওমকার দেশি হ্যাংওভারের সহ প্রতিষ্ঠাতা এবং সিএমও।

মিশরেই হিতেশের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল চণ্ডীগঢ়ের এক বাসিন্দা লক্ষ্য আরোরার।দক্ষিণ ভারতে দেশি হ্যংওভারের ব্যবসায়িক দিকটা দেখেন লক্ষ্য। বন্ধু ওমকার জার্মানির একটা বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করতেন। সেই সব ছেড়েছুড়ে পাকাপাকিভাবে তাঁকে ব্যবসার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়া হিতেশের পক্ষে খুব একটা সহজ ছিল না।‌

শুধু ব্যবসা নয়, ওমকার এবং তাঁর বন্ধুরা দেশি হ্যাংওভারকে একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। আর সেই উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষ কর্মীদের উৎসাহিত করাও ছিল তাঁদের লক্ষ্য। কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ মার্কেটিং কেউ ইকনোমিকসে গ্র্যজুয়েট। লোভনীয় চাকরি ছেড়ে হাতে তৈরি খাঁটি চামড়ার জুতো ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন এই চার তরুণ-তরুণী। তাদের হাত ধরেই চলা শুরু হল ‘দেশি হ্যাংওভার’এর। ওমকার বলেন, ‘ভালো চামড়ার জন্য কোথায় না গিয়েছি। জুতোর ডিজাইন ঠিক হয়ে যাওয়ার পর আমরা উন্নতমানের চামড়ার খোঁজ করছিলাম।’ চামড়ার খোঁজে কর্নাটকের এক গ্রামে পৌঁছে যান। সেখানে একদল মুচির দেখা মেলে। বেলগ্রাম থেকে ১০০ কিলোমিটার এবং মিরাট থেকে ৭০ কিলেমিটার এই জায়গাটি আসলে ছোট্ট একটা ভূখণ্ড, যেখানে কারিগররা কাজের খোঁজে আসেন। ‘অনেকে জায়গাটা চেনেনই না’, জানান ওমকার। ‘দেশি হ্যাংওভার’ আসার আগে পর্যন্ত এই দক্ষ মুচিরা সস্তার জিনিসপত্র তৈরি করতে বাধ্য হতেন,যা থেকে মাসে ২০০০-৩০০০ টাকা রোজগার হত। হতশ্রী এই গ্রাম সেভাবে কারও নজরে আসে না। কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে একটা স্কুল কেনওরকমে দাঁড়িয়ে ছিল, তাতে আবার বেঞ্চ নেই। ‘দেশি হ্যাংওভার’এর উদ্যোক্তারা গ্রামে পৌঁছে প্রথমেই সমস্তরকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে একটা কারখানা গড়ে তুললেন। কারণ তরুণ উদ্যোক্তারা চেয়েছিলেন তাঁদের সংস্থা হবে সামাজিকভাবে সচেতন। প্রথমেই কারিগরদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে দেন। তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগের ব্যাপারে পরামর্শ দিতে থাকেন। গ্রামের এক মাত্র স্কুলটির দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে নেয় ‘দেশি হ্যাংওভার’। ‘যতটা রোজগার হত,সবটাই স্কুলে দিয়ে দিতাম।কম্পিউটার নিয়ে এলাম। সবরকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে স্কুলটিকে সবার হাতের নাগালে এনে দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। আর এভাবে ব্যাবসা দাঁড় করানো পাশাপাশি সামাজিক দায়দায়িত্ব পালনের কাজও চলছিল সমান তালে’, বলছিলেন তরুণ তুর্কী ওমকার।

দেশি হ্যাঙওভারের কাজ চলছে

দেশি হ্যাঙওভারের কাজ চলছে


এবার আসি ব্যবসায়িক দিকটায়। ‘দেশি হ্যাংওভার’ এর উদ্যোক্তারাই সম্ভবত প্রথম ‌যারা স্বশরীরে বিদেশে গিয়ে নিজেদের পণ্যের বাজার পরখ করে এসেছেন। যখন গোটা দল উত্তর ভারতে, তখন তাঁদেরই একজন ওমকার কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, রোমানিয়া চষে ফেলেছেন ‘দেশি হ্যাংওভার’ এর বাজার বুঝতে। চামড়াজাত পণ্য নিয়ে অষ্ট্রেলিয়া সরকারের বাড়াবাড়ি রকমের কড়াকড়ি। ওমকার বুঝে গিয়েছিলেন আর যেখানেই হোক অষ্ট্রেলিয়ায় তাদের পণ্যের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। আর কানাডার ঠান্ডাতে চামড়ার চটি গলিয়ে হাঁটাচলার কথা ভাবাই যায় না। ‘৬মাস কোনও ব্যাবসাই হবে না’,বললেন ওমকার। ‘পশ্চিম ইউরোপে পণ্য রপ্তানি নিয়ে নানারকম বায়নাক্কা আছে। কিন্তু পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে সেটা অনেকটাই শিথিল’, ওমকারের উপলব্ধি। ‘‘দেশি হ্যাংওভার’ ফিরে গেল শেকড়ে, যেখানে মূল ভাবনার জন্ম নিয়েছিল, সেই মিশরে। এই জায়গাটা ঠিক যেন আমাদের হৃদয়ের কাছাকাছি’,বলে চলেন ওমকার। ‘অনেক যোগাযোগ তৈরি করলাম। মিশরের ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে কথা বললাম। বাজারে ঢুকতে অসুবিধা হচ্ছিল না। আমরা এমন একটা পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছিলাম,যেটা আগেই এখানে সমাদৃত হয়েছে’। মধ্যপ্রাচ্য ‘দেশি হ্যাংওভার’ এর ভালো বাজার তৈরি হয়ে গেল। যে উপজাতি নকশা করেছে তাদেরই গ্রামের নামে চটির নাম হল।কাটতি ভালোই।প্রতিযোগিতা কঠিন হল।ভারতের চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য অনায়াসে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারে,মনে করেন ওমকার।‘আমরা এবার নেদারল্যান্ডেও চেষ্টা শুরু করলাম।বোঝার চেষ্টা করছিলাম কতটা সাড়া মেলে’।

‘আমাদের জুতোর ইউএসপি হল,পুরওটাই হাতে তৈরি এবং ভারতের সবচেয়ে ভালো চামড়া দিয়ে তৈরি। জুতোর জন্য হাতে পাকানো চামড়া তুলে এনেছি’,দাবি ওমকারের। চেন্নাইতে এক ধরণের সস্তার বিকল্প চামড়া রয়েছে, রেক্সিন বলা হয় যাকে। এবং সেখানে চটির জন্য এই রেক্সিনই বেশি ব্যবহার হয়। রেক্সিন লেদার মূলত ব্রিটেনের,রেক্সিন লিমিটেড এর প্রস্তুকারক। চামড়ার বিকল্প এই রেক্সিন আদতে বেশ দামি। কিন্তু ওমকার বলেন, ‘চামড়াই দামি। সে কারণে আমার জুতোর দামও বেশি। আসলে ভারতে চামড়ার বাজার সংগঠিত নয়। একটা বড় অংশ নিলাম হয়ে গেলেই,মূল বাজারে ভালো চামড়ার আকাল পড়ে’, বলে চলেন ওমকার। ‘আমাদের দুটি বড় বাজার আছে। পশ্চিমবেঙ্গ দুর্গাপুর থেকে আসে আসল কাঁচামাল। আরেকটা বাজার আগ্রায়। সেখানেও চামড়ার ভালো বাজার আছে।‘

ভারতের বাজারে ক্রেতাদের দরাদরির অভ্যেস আছে। ডিসকাউন্ট বা দামে সস্তা পণ্যই বেশি টানে ভারতীয় ক্রেতাদের। আর এই মানসিকতার কথা ভেবে ভালো মানের লেদার সামগ্রী উৎপাদনকারীরা অনেক সময় পিছু হটেন। যদিও ওমকার মনে করেন, বাজারে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারাটাই আসল ব্যাবসা। ‘ডিজেলে ব্র্যান্ডের জিনস আর ব্র্যান্ডহীন সাধারণ জিনসের মধ্যে তফাৎটা যদি ক্রেতারা বুঝতে পারেন তাহলে তো কোনও সমস্যাই নেই। ব্র্যান্ড এবং মান দুটোই বুঝতে হবে’। ওমকার বলেন, ‘সামর্থ মতো সবচেয়ে ভালো মেশিন কিনেছি আমরা। চামড়াও ভালো। স্বাভাবিকভাবে জুতোও বেশ টেকসই। তিন ধরণের সুবিধা দিচ্ছি। উন্নতমানের চামড়া, কারিগররা নিজের হাতে তৈরি করছেন এবং তাঁরা সংস্থার চাকরিজীবী’। শিল্পে অসংগঠিত ক্ষেত্র অনেক সময় ভেঙে পড়ে, যদিও ‘দেশি হ্যাংওভার’এর মতো কিছু সংস্থা অভ্যাসে বদল আনার চেষ্টা করছে। ‘এই কারিগরদের এখন এমন অবস্থা, অসংগঠিত ক্ষেত্রেই কাজ করতে তাঁরা বাধ্য। কাজ করতে করতে দেখেছি, পণ্যের বরাত দেওয়ার পরের ধাপটাই হল ডিস্ট্রিবিউটরদের হাতে সেটা তুলে দেওয়া। আমরা একটা ভিডিও বানিয়ে সেখানে দেখিয়েছি কীভাবে ওই গ্রামে এবং কারিগরদের জীবনে বদল এনেছি আমরা। কোনও প্রশিক্ষণ হয়নি কারও ।তবুও বংশানুক্রমে সেই দক্ষতা ওদের মজ্জাগত। এটাই একমাত্র কাজ যেটা তাঁরা জানেন’।

একজন বিনিয়োগকারী, চণ্ডীগঢ়ে একটা দোকান, বাইরে রপ্তানি, কিচ মান্ডি ও সানডে সোল সান্তেতে সফল বাজার-সব মিলিয়ে ২০১৫ ‘দেশি হ্যাংওভার’এর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ‘আগামী দু তিন বছরে নিজেদের কোথায় দেখতে চাই ভেবে নিতে হবে আমাদের। আরও দোকান খুলতে চাই। যদিও ই-কমার্স বা নেট বাজারের যুগ এখন। কিন্তু আমরা ব্যবসায় এখনই সেরকম কিছু চাইছি না। কারণ আমাদের জুতো হাতে তৈরি হয়’, বলেন ওমকার। ‘জুতোর মাপ সেভাবে ঠিক হয়নি। মাপের ঝামেলা এড়াতে মুম্বই, বেঙ্গালুকরুতে দোকান খুলতে চাই’। পাশাপাশি ‘দেশি হ্যাংওভার’ এর সবচেয়ে সুবিধা একটাই। উদ্যোক্তাদের বয়স ২০ বছরের আশেপাশে।অনেকেই হয়ত পাত্তা দেবেন না। কিন্তু সেটাই প্লাস পয়েন্ট। পরীক্ষা নিরীক্ষার অনেক সময় পাওয়া যাবে। ‘নতুন পণ্য নিয়ে এগোতে গেলে অনেক চ্যলেঞ্জ। ঠিকঠাক কারিগর পেতে হবে। লোকজনের সঙ্গে কথা বলা সঠিক প্যকেজিং সব ভাবতে হবে। এবং লজিস্টিকস অর্থাৎ পণ্যের উৎপাদন থেকে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়াটা দেখভালের ব্যবস্থা করতে হবে। ‘আমরা খুব ছোটসংস্থা, তাই লিজিস্টকস সিস্টেম সেভাবে নেই। মুম্বইতে আমাদের পণ্য দেখতে পাবেন।‘

image


একসঙ্গে বেশি পরিমানে উৎপাদনের চাইতে হাতে তৈরি বাছা বাছা পণ্য তৈরি করা বেশ সময় সাপেক্ষ। দেশি হ্যাংওভারের ক্ষেত্রে সেটাই প্রযোজ্য। আপাতত দেশি হ্যাংওভার মাসে ৫০০ জোড়া জুতো তৈরি করছে। চামড়া সংগ্রহ করা, কাটা, ব্যবহারের আগে শুকোনো, গোটা পদ্ধতিটা চলে এভাবে। এই পদ্ধতিতে কাজ চলা মানে তাড়াহুড়োর কোনও জায়গা নেই। ‘মানুষের চাহিদা মেটাতে পারব কি না, সেটাই বড় চিন্তার। সংখ্যাটা যদি ৫০০র বেশি হয়,সামলাতে পারবো না, আবার ব্যবসা বাড়াতেও পারছি না এই মুহূর্তে। কিন্তু যখনই দেখি কেউ আমাদের তৈরি জুতো পরছেন,গর্বে বুক ফুলে ওঠে’, চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বলে চলেন তরুণ উদ্যোক্তা ওমকার পানধারকামে। আর এই তরুণ তুর্কীদের উদ্যোগেই দেশের এবং আন্তর্জতিক বাজারে স্টাইল স্টেটমেন্ট ঠিক করে দিচ্ছেন অনমি গ্রামের গরিব মুচিরা। হয়ত ‘দেশি হ্যাংওভার’ই পথ দেখাবে ভবিষ্যতের আরও অনেক উদ্যোক্তাকে।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags