সংস্করণ
Bangla

কলকাতার কাগজ কুড়ুনিদের জীবন বদলালেন অমৃতা চ্যাটার্জী

Rajdulal Mukherjee
10th Oct 2015
Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share

কলকাতার কাগজ কুড়ুনিরা তাকে কুর্নিশ করে। নোংরা কাগজ, প্লাস্টিক, শিশি, বোতল কুড়িয়ে বাড়িয়ে তাদের রোজগার খুব সামান্যই হত। কিন্তু অমৃতা চ্যাটার্জীর ছোঁয়ায় কিছুটা হলেও বদলে গিয়েছে জীবন। কে এই অমৃতা? South Asian Forum for the Environment (SAFE), Kolkata-র প্রজেক্ট লিডার অমৃতা। তাকে নিয়েই ইয়োর স্টোরির এই কাহিনি। প্রশ্ন হল, কাগজ কুড়ুনিদের জীবনে পরিবর্তন আনা সম্ভব হল কী করে। এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সামাজিক উদ্যোগ ‘Resolve Trash to Cash’-এ। কঠিন বর্জ্য পদার্থ সংগ্রহ এবং এর রিসাইক্লিং। যার ফলশ্রুতি পরিবেশ ও সমাজের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন। সামাজিক উন্নয়ন কীভাবে? কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যই হল সলিড ওয়াস্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে গরিব বস্তিবাসী ও প্রান্তিক মহিলাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সম্প্রতি এই উদ্যোগের স্বীকৃতিও মিলেছে। পেরুর রাজধানী লিমায় COP 20-এর অন্তর্গত UNFCCC Momentum for Change, Lighthouse Activity Award 2014 পেয়েছে ‘Resolve Trash to Cash’।


অমৃতা চ্যাটার্জী

অমৃতা চ্যাটার্জী


ভারতে মেট্রো শহরগুলিতে বর্জ্য পদার্থের ডিসপোজাল বা বিলিব্যবস্থা একটা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কঠিন বর্জ্যের অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডাম্পিংয়ের জেরে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। অমৃতা বললেন,"কলকাতায় প্রতিদিন ৫ হাজার টন আবর্জনা জমা হয়। ২০১০ সালে SAFE-এর সার্ভেতে দেখা যায় শহরে জমা হওয়া আবর্জনার ৮৬ শতাংশ যেমন তেমনভাব রিসাইক্লিং হয়। আর শহরে যে সব হতদরিদ্র মানুষ আছেন তাদের ৫০ শতাংশেরও বেশি বেঁচে রয়েছেন এইসব আবর্জনা কুড়িয়ে। এইসব সংগ্রহকারী, ঝাড়াইবাছাইকারী এবং যারা তা নিয়ে ব্যবসা করে, তাদের ভয়ঙ্কর সব রোগের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। যদিও তাদের রোজগার খুব সামান্যই। পুরোপুরি অসংগঠিত এই ক্ষেত্রে কোনও নিয়মের বালাই নেই। কাগজ কুড়ুনিরা পান বড়জোর ২ থেকে ৫ শতাংশ অর্থ। এইসব দেখেই ২০১১ সালে আমরা শুরু করেছিলাম ‘Resolve Trash2 cash’।"

শুধু অমৃতা নয়, এই কাহিনি আসলে কলকাতার আনাচেকানাচে বস্তি, ফুটপাথে যেমন-তেমনভাবে বেঁচে থাকা বাসিন্দাদেরও। Resolve Trash to Cash-এর হাত ধরে তারাও যেন হয়ে উঠেছেন এই শহরের দ্রুত বদলে যাওয়া পরিবেশ ও অর্থনীতিতে সাফল্যের শরিক। মেট্রো শহরের এইসব বস্তিবাসী মহিলা বা ফুটপাথের শিশুদের ব্যাপারে সাধারণ শহরবাসীর আজও তেমন কোনও ধারণা নেই। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে কীভাবে বেঁচে আছেন তারা? কেউ জানতে চায় না। জানার কোনও আগ্রহও নেই। অমৃতা জানালেন,"‘Resolve Trash 2 Cash’-এর মাধ্যমে কাগজ কুড়ুনি এইসব মহিলাদের মধ্যে আমরা সন্ধান পেলাম আন্ত্রেপ্রেনারদের। এই সময়ের আর পাঁচজন উদ্যোগপতির মতোই, তারাও উদ্যোগপতি হয়ে উঠতে পারেন। তাদের শুধু দরকার প্রযুক্তিগত সহায়তা আর প্রারম্ভিক টাকা। আমাদের এই কাজের মাধ্যমে মহিলারা যেমন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন, পাশাপাশি একজন মা হিসাবে সন্তানের ভবিষ্যতেরও দিশা দিতে পারছেন।"


image


অমৃতা চ্যাটার্জীর এই প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছে United Nations Environment Programme(UNEP) তাদের ‘Clean up the World Campaign’-এ। অমৃতার এই বর্জ্য রিসাইক্লিং প্রকল্প, ক্রমশই রূপ নিচ্ছে মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজের। যার ফলে বস্তিবাসীদের মধ্যে গড়ে উঠছে কিছু গড়ে তোলার দক্ষতা। মিলছে রোজগারের দিশা ও সামাজিক মর্যাদা। কীভাবে শুরু হয়েছিল এই কাজ? অমৃতা জানালেন," আবর্জনা থেকে কীভাবে রোজগার করা যায়, তা ব্যাখ্যা করতে বস্তি এলাকায় কর্মশালার ব্যবস্থা করেছিল SAFE. এই প্রকল্পে অংশগ্রহণের ব্যাপারে বস্তিবাসীরা আগ্রহী কি না তা তাদের কথাবার্তা থেকে আমরাও বুঝে নিতে পারছিলাম।যারা আগ্রহ দেখাল তাদের নিয়ে গড়ে তোলা হল Joint Liability Groups (JLGs). প্রতি জেএলজি'তে ১০ জন সদস্য।

এই প্রকল্পের কাজটা ছিল ছেঁড়া, ফেলে দেওয়া অপ্রয়োজনীয় কাগজ থেকে উপহারসামগ্রী তৈরি। জেএলজি'র অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ব্যাঙ্কে যাওয়া হল। সেখানে মহা সমস্যা। অধিকাংশ সদস্যেরই পরিচয়পত্র বলে কিছু নেই। তবে ধন্যবাদ দেব শুভাকাঙ্খী ও সেফ-এর আধিকারিকদের। তাদের চেষ্টাতেই অ্যাকাউন্ট খোলা হল ইউকো ব্যাঙ্কে।

শুরু হল জেএলজি সদস্যদের প্রশিক্ষণ। জিনিস তৈরি, তা বিক্রি, হিসাব রাখা-সহ বিভিন্ন বিষয়ে বেসিক কিছু শেখানো হল সদস্যদের। যে সব মহিলার পক্ষে ঘরে থেকে কাজ করা সম্ভব, তাদের কাগজ থেকে উপহারসামগ্রী বানানো শেখান হল। যোগাযোগ করা হল বেশ কয়েকটি কর্পোরেট সংস্থার অফিসেও। সেইসব সংস্থায় ফেলে দেওয়া ও বাতিল কাগজপত্র যাতে সহজে সংগ্রহ করা যায় তার ব্যবস্থা হল।অফিসে আলাদা বিনের ব্যবস্থা করা হল। সেইসব বড়-বড় অফিসে গিয়ে কাগজ সংগ্রহ করে আনার জন্য জেএলজি'র পুরুষ সদস্যদের আদবকায়দা শেখান হল।এরপর যে উপহার সামগ্রী তৈরি হল বিভিন্ন মেলায়, কর্পোরেট হাউসে বিক্রি করতে সহায়তা করল সেফ। এ ব্যাপারে আর একটা কথা বলব। Resolve: Trash to Cash পুরোপুরি মহিলা মালিকানাধীন। তারাই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন এবং সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার তারাই নেন।"

Resolve: Trash to Cash-এর সদস্য ও সুবিধাভোগীদের বেশিরভাগেরই প্রাথমিক পর্যন্ত পড়াশোনা। কিংবা বস্তি এলাকায় থাকা দারিদ্রসীমার নিচে থাকা একেবারেই নিরক্ষর লোকজন। রাস্তায় এবং নোংরা ফেলার জায়গা থেকে এটাসেটা কুড়িয়ে বেঁচে থাকার রসদ জোগার করেন। Trash to Cash-এ যুক্ত রয়েছেন কলকাতার তিনটি বস্তিতে থাকা এ ধরনেরই প্রায় সাড়ে তিনশোজন কাগজ কুড়ানো। পুরো প্রকল্পকেই দেওয়া হয়েছে একটি সংগঠিত রূপ। সাফল্যও ধরা দিয়েছে। মিলেছে আর্থিক স্বাবলম্বন। আগে তারা যে টাকা রোজগার করতেন, এখন তার থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি টাকা ঘরে নিয়ে যেতে পারছেন। এই প্রকল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুক্ত ছিলেন এমন প্রায় চারশোজন এখন Tata-AIG Life-এর মাইক্রো ফিনান্স ইনসুরেন্সের আওতায়। সুফল মিলেছে পরিবেশগত দিক থেকেও। ঝাড়াইবাছাই করে বর্জ্য ফেলার একটা ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।


image


কাগজ কুড়ুনিদের বক্তব্য

সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে কাজের সন্ধানে কুড়ি বছর আগে কলকাতায় এসেছিলেন আলাউদ্দিন শেখ। কাজ মেলেনি। এখন একটু হলেও ভালোভাবে বেঁচে আছেন। এজন্য Resolve: Trash to Cash প্রকল্পকেই ধন্যবাদ দিচ্ছেন আলাউদ্দিন। তার কথায়," বড়-বড় অফিসে ইউনিফর্ম ও ফোটো আইডি কার্ড নিয়ে কোনওদিন ঢুকতে পারব স্বপ্নেও ভাবিনি। এই প্রকল্পের জন্য সেটাই সম্ভব হয়েছে। আমার মতো একজন ফুটপাথবাসীও এই সুযোগ পাচ্ছে। এর অংশ হতে পারে আমি গর্বিত।Apeejay group আমাকে একটা পুরস্কারও দিয়েছে।"

আলাউদ্দিনের মতোই এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হয়েছেন মায়া মণ্ডল। একসময় নোংরা খালবিলে মাছ ধরতেন।মাসে রোজগার বলতে খারাপ সময়ে ৭৫০ টাকা, আর সময় খুব ভালো হলে ১৮০০ টাকা। চামড়ার নানারকম অসুখে ভুগতেন। ভুগতেন পেটের অসুখেও। আর এখন? আগের থেকে অনেক ভালো আছেন মায়াদেবী। শরীর আগের থেকে সুস্থ। পেপার মেশিনে উপহারসামগ্রী তৈরি করে রোজগার আগের তুলনায় পাঁচগুণ হয়েছে। ছেলেমেয়েদের স্কুলেও পাঠাতে পেরেছেন। নিজেও বাংলা পড়তে ও লিখতে শিখছেন। তার কথায়," কয়েক পুরুষ ধরে খুব খারাপ ভাবে আর কষ্টের মধ্য দিয়ে বেঁচে ছিলাম আমরা। স্বপ্নেও কোনওদিন ভাবতে পারিনি যে হাতের কাজ, আঁকার মাধ্যমে অন্যভাবে বাঁচার দিশা খুঁজে পাব। দিদি (অমৃতা) বলেছিল, একজোট হতে পারলে আমরা কাজটা করতে পারব। এই প্রকল্প সেটাই আমাদের শিখিয়েছে। আরও ভালোভাবে বাঁচার জন্য আমরা এভাবেই কাজ চালিয়ে যাব।" এই সাফল্য তৃপ্তি দিয়েছে অমৃতা চ্যাটার্জীকে। আগামীদিনে এই ধরনেরই অন্য কোনও প্রকল্প শুরু করতে চায় তাঁরা।

Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags