সংস্করণ
Bangla

খিদিরপুরের শামিম-তসলিমরা খুঁজছেন সাফল্যের রুটম্যাপ

14th Dec 2017
Add to
Shares
78
Comments
Share This
Add to
Shares
78
Comments
Share

ফজরের আজান পেরিয়ে, টিং টিং করে কলকাতার ট্রাম ছুটছে। একটা শিয়ালদহের দিকে। অন্যটা শ্যামবাজার থেকে গজরাতে গজরাতে আসছে ধর্মতলা। আর ধর্মতলা থেকে এদিক ওদিক কর্মব্যস্ত বার্তা নিয়ে ছুটছে কলকাতার সাহেবিয়ানার ঐতিহ্যবাহী ট্রাম গাড়ি। এই সাত সকালে রোজ বাড়ি ফিরতেন শামিম আখতারের বাবা। আবদুল আজিজ। সাদা ধবধবে জামা। মাথায় সাদা ক্রচেটের সুতো দিয়ে বোনা ইমানের টুপি। মাঝ বয়সী লোকটা রোজ ফিরতেন নমাজ সেরে। স্টেটসম্যান পত্রিকার ছাপাখানা থেকে বেরিয়ে রুট ম্যাপ ছিল এই রকম। টিপু সুলতান মসজিদের পাশ দিয়ে এঁকে বেঁকে রাস্তা পেরিয়ে সোজা ধর্মতলার ট্রামডিপো। খিদিরপুরের ট্রাম। গড়ের মাঠ। রেসকোর্স। মসজিদ। সে সব পেরিয়ে বাড়ি। সারা রাতের খাটুনির পর সকালের সূর্যের সোনার রেণু মুখে মেখে বাড়ি ফেরা। গড়ের মাঠের সবুজে সাঁতার কাটতে ভালো লাগত রোজ। সহজ সরল বিষয়গুলোয় আনন্দ পেতেন। চোখের কোণে নিশ্চিন্ত রেখা এঁকে দিত। 

image


সততার রোজগার। হাড় ভাঙা খাটুনি। পরিমাণে কম কিন্তু জিল্লতের মোয়া আর বেইমানির লাড্ডুর থেকে অনেক বেশি স্বাদু ছিল লোকটার আয়। পরিবার বলতে আজিজ সাহেবের স্ত্রী, তিন ছেলে, তিন মেয়ে। গোল্ডেন হ্যান্ডশেক নেওয়ার পর থেকে বাড়িতেই বসে গেলেন। কিছু টাকা হাতে পেলেন ঠিকই কিন্তু সেই টাকায় আর কত কী হয়! ছেলে শামিম তখন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। লেখাপড়ায় ভালো কিন্তু পরিস্থিতির চাপে পড়ায় ইতি টেনে বাধ্য হলেন সেলসের চাকরি নিতে। ঘাম প্যাঁচ প্যাঁচে এই শতাব্দী প্রাচীন কলকাতায় শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা গলায় টাই ঝুলিয়ে জোর লাগা কে হাইস্যা করে কোনও ক্রমে নড়ছিল কেরিয়ারের চাকা। কিন্তু তর তর করে এগোনোর তাগিদ ওকে তাড়া করছিল ক্রমাগত। শামিম করিৎকর্মা, স্মার্ট, চোস্ত ইংরেজি বলা ঝকঝকে ছেলে। বসে থাকার পাত্র নন। ফলে সুযোগ পেয়ে গেলেন বিদেশে চলে যাওয়ার। বেশি আয়ের সুযোগ। গেলেন হংকং। দীর্ঘদিন সেখানে চাকরি করেছেন। পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। খিদিরপুরের ঘরে ঈদের জশন হয়েছে। সততার আয়ের শিমুই, হালিমের গন্ধে মম করেছে আজিজ সাহেবের দাওয়া। এই তো চেয়েছিলেন তিরিশ ছুঁই ছুঁই শামিম। অল্প বয়সেই সাফল্যের স্বাদ পেয়ে গিয়েছেন। তবু উদ্যোগের পোকা ওকে কামড়ে দিল জোর সে। সব ছেড়েছুড়ে চলে এলেন কলকাতায়। বনে গেলেন উদ্যোগপতি। প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, মানুষকে নতুন করে চেনা হতাশায় ডুবে যাওয়া, আবার মাথা তুলে হতাশার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করার মত হিম্মত, সবই ওকে সময় শিখিয়ে দিয়েছে। শান্ত কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছেলেটাকে তাই দমিয়ে রাখা যায়নি।

আমার সঙ্গে ওর আলাপ করিয়ে দিয়েছেন কলকাতার আরও এক তরুণ উদ্যোগপতি। তসলিম আলি। জ়ি ওয়েব ভ্যালি নামের একটি ওয়েব সলিউশন সংস্থা চালান। পার্ক সার্কাসে অফিস। বাড়ি খিদিরপুরে। শামিম-এর সঙ্গে এক স্কুলে পড়েছেন তসলিম। এক সঙ্গে বড় হয়েছেন। ফলে শামিমকে ছোটবেলা থেকে চেনেন। শামিম এবং তাঁর স্ত্রী শিরিন নাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি স্টার্টআপ খুলেছেন তসলিম। নাম TrakingPro, সে কথায় আসব তবে তার আগে আমি বরং আপনাদের সঙ্গে তসলিমের আলাপ করিয়ে দিই। তসলিম মধ্যবিত্ত পরিবারে ছেলে। এই শহর কলকাতায় অনেক জদ্দোজহেদ করে বড় হয়েছেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কিন্তু ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার লোক নন। জীবনে যা স্থির করেছেন সেই গন্তব্য পর্যন্ত না পৌঁছে ফিরে আসেননি।

শামিমের মত পরিস্থিতির চাপ যে ছিল না তা নয়। তবে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে গ্রাজুয়েশনের পর চাকরির সূত্রে টেকনোলজির সঙ্গে আলাপ হয়। ২০১২ সাল নাগাদ। সেক্টর ফাইভে একটি ওয়েব সলিউশন সংস্থায় এসইও একজিকিউটিভ হিসেবে যোগ দেন। চটপট শিখে যান কাজটা। তখন থেকেই তাগিদ ছিল নিজের কিছু করবেন। এক সিনিয়র বন্ধুর সহযোগিতায় শুরু করেন ওয়েব হোস্টিং। তারপর এক এক করে জুড়ে যায় পালক। করতে থাকেন ওয়েব ডিজাইনিং, এসইও, ডিজিটাল মার্কেটিং। সংস্থার নাম দেন জ়ি ওয়েব ভ্যালি। দ্রুত গতিতে এগোয় কোম্পানি। লন্ডনেও কোম্পানি খোলেন আন্তর্জাতিক স্তরে কাজ করার জন্যে। একের পর এক উইং যুক্ত হতে থাকে। তোপসিয়ায় অফিস নেন। এখন ওরা অ্যাপ ডিজাইনিং থেকে শুরু করে অ্যাপ ডেভেলপও করেন। পাশাপাশি মার্কেটিং দারুণ পারেন তসলিম। প্রায় সাতশ ওয়েব সাইট তৈরি করে ফেলেছেন। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে ক্লায়েন্ট। তিন তিনটে স্টার্টআপ তৈরি করেছেন এই অল্প সময়ের মধ্যে। TrakingPro সেগুলিরই একটি।

শামিম এবং তসলিম দুজনেই ট্র্যাকিং প্রোর ফিচারগুলি বোঝাচ্ছিলেন। 

এটা এমন একটি সফ্টঅয়্যার যা ওরা কলকাতায় বসে তৈরি করেছেন। যা বাজারের যেকোনও এধরণের জিপিএস ট্র্যাকিং সফ্টঅয়্যারের থেকে অনেক গুণে ভালো। বিদেশ থেকে ডিভাইসটা আনতে বাধ্য হচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু সফ্টঅয়্যারটা একেবারে ঘরোয়া। 

ক্লায়েন্টের চাহিদা মত ফিচারগুলি জুড়ে দিচ্ছেন। কারও প্রয়োজন জিপিএস ফেন্সিংয়ের সুবিধে। কারও বা প্রয়োজন নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য। অথবা কেউ চান সবটাই। ট্রান্সপোর্টের যেকোনও ব্যবসায় এই ধরণের ট্র্যাকর ইদানীং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে। শুধু জিও লোকেশন ট্র্যাক করাই নয়, ফুয়েল এফিসিয়েন্সিও ট্র্যাক করে এই সফ্টঅয়্যার। পাশাপাশি আপনার গাড়ির ড্রাইভার রেকলেস ড্রাইভিং করছে কিনা। কিংবা তার গাড়ি চালানোর পদ্ধতিতে কোথাও কোনও সমস্যা হচ্ছে কিনা সেটাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারবে এই সফ্টঅয়্যার।

সম্প্রতি লিসবনে WebSummit এ গিয়েছিলেন দুজনে। সেখানে আন্তর্জাতিক কিছু যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশেও তৈরি হয়েছে লিড। পূর্বাঞ্চলের বাজার ধরতে দুই বন্ধু এখন মরিয়া। বেশ কিছু ক্লায়েন্টও পেয়েছেন ওঁরা তাই বলছিলেন, এরকম পরিষেবা যে ভূভারতে নেই তা নয়, কিন্তু কম খরচে ওদের মত নিখুঁত পরিষেবা একটি সংস্থাও দিতে পারবে না। ফলে সাফল্য অবশ্যম্ভাবী। একই রকম আত্মবিশ্বাসী তসলিম, শামিম শামিমের স্ত্রী শিরিন। ফলে আরও ঝলমলে আসমানের খোয়াব দেখতে শুরু করে দিয়েছেন খিদিরপুরের আজিজ সাহেব। ঈদের আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু জশনটাই বাকি।

Add to
Shares
78
Comments
Share This
Add to
Shares
78
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags