সংস্করণ
Bangla

সস্তায় বাঁশের বাসা, পথ দেখাচ্ছে ওয়ান্ডার গ্রাস

tiasa biswas
25th Aug 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

বাসা মোর খাসা। আর সেই বাসা যদি হয় বাঁশের? বাঁশের বাড়ি-কারও ফ্যান্টাসি, কেউ নাক সিঁটকাবেন। শখ করে বাঁশ দিয়ে বাড়ি বানান, মানা যায়। কিন্তু রেস্তোর জোর থাকলে ভবিষ্যতের সুরক্ষার কথা ভেবে বাঁশ দিয়ে বাড়ি বানাতে যাবেনই বা কেন! এই যদি আপনার ভবনা হয় তাহলে কিন্তু আপনি ভুল প্রমাণিত হবেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫০ বছর টিকে থাকতে পারে এক একটি বাঁশ বা বাঁশের তৈরি কাঠামো। নির্মাণশিল্পে বাঁশের এত উপযোগিতা,তার খবর রাখেন কজন? বাঁশ নিয়েই কাজ করে গিয়েছেন এমনই একজন ভিন্নু কালে। অনেক ‘বাম্বুম্যান’ নামে চেনেন তাঁকে। তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরি ছেলে বৈভব কালে। বাবা যে স্বপ্ন দেখতেন সেটাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন বৈভব। ঘরসজ্জা বা ইন্টেরিয়র ডেকরেশনে ভারতে ভালই পরিচিতি বৈভবের। কাজের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাঁশকেই। গড়েছেন নিজের সংস্থা ‘ওয়ান্ডার গ্রাস’। নির্মাণশিল্পে বাঁশের বাড়ির কনসেপ্টকে মূল ধারায় আনতে এবং তার গুণ সম্পর্কে প্রচার করতে ‘ওয়ান্ডার গ্রাস’ বেশ কিছু বাঁশের বাড়ি ইতিমধ্যে তৈরি করে রেখেছে।

বৈভব কালে, প্রতিষ্ঠাতা, ওয়ান্ডার গ্রাস, বাঁশের কারিগরদের সঙ্গে

বৈভব কালে, প্রতিষ্ঠাতা, ওয়ান্ডার গ্রাস, বাঁশের কারিগরদের সঙ্গে


বাঁশই হল বাড়ি এবং বিভিন্ন কাঠামো তৈরির সবচেয়ে পুরনো এবং বহুল ব্যবহঋত সরঞ্জাম। বাড়ির তৈরির উপকরণ হিসেবে বাঁশই হল সবচেয়ে সস্তা, ব্যবহারে সুবিধাজনক এবং যে দেশে বাঁশ জন্মায় সেখানে সবচাইতে সহজলভ্য। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে যেখানে ছিন্নমূলীদের সমস্যা বড় হয়ে উঠেছ, সেখানে ইদানীং নির্মান শিল্পে বেশি জরুরি হয়ে উঠছে বাঁশ। পরিসংখ্যান বলেছ, এই শতকের শেষের দিকে ভারতে ৩৯ মিলিয়ন পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকবে না। আর এইভাবে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে বিল্ডিং তৈরিরর সরঞ্জামের ওপরও ক্রমশ চাপ বাড়বে। ‘ওয়ান্ডার গ্রাস’ বলছে, ইট-বালি-সিমেন্ট-কংক্রিটের ওপর চাপ কমান, বাঁশ দিয়ে বাড়ি বানান। বাড়ির কলাম,প্যানেল,দেওয়াল,ভেতরের সজ্জা এমনকি গোটা বাড়ি তৈরি করে ফেলছে ‘ওয়ান্ডার গ্রাস’। ‘ভারতে বাড়ি নির্মাণের সরঞ্জামের অভাব পূরণ করা যেতে পারে বাঁশ দিয়ে। চিনের পর আমরাই দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঁশ উৎপাদক দেশ। বাঁশ তাড়াতাড়ি বাড়ে এবং উপমহাদেশের প্রায় সব জায়গায় সহজে জন্মায়’, বলছিলেন ‘ওয়ান্ডার গ্রাস’এর প্রতিষ্ঠাতা বৈভব কালে।

ওয়ান্ডার গ্রাসের তৈরি কিছু জিনিসপত্র

ওয়ান্ডার গ্রাসের তৈরি কিছু জিনিসপত্র


দেখতে দেখতে ছ বছর পেরিয়ে গিয়েছে ‘ওয়ান্ডার গ্রাস’এর। বৈভবের এই অভিনব উদ্যোগে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন বাবা ভিন্নু কালে। ভিন্নু নিজেও একজন নাম করা স্থপতি যিনি বিশ্বাস করতেন বাঁশের উপযেগিতায়। বাঁশ নিয়ে প্রচুর গবেষণাও করেছেন, গ্রামের বহু শিল্পীর সঙ্গে বাঁশ নিয়ে কাজ করেছেন। ‘বাম্বুম্যান’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন ভিন্নু কালে।বাবার পথের অনুসারি হয়ে ছেল বৈভব ইন্টেরিয়র ডিজাইনে স্নাতক হলেন। জার্মানির বহস ইউনিভার্সিটি থেকে আরবান প্রজেক্টে স্নাতকোত্তর হন। আপাতত বিভিন্ন হোটেল-রিসর্টে থাকার ঘরগুলি তৈরি করছেন তিনি। অবশ্যই বাঁশ দিয়ে।

বাঙ্গালুরুতে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার এন এস রাঘবন সেন্টার ফর এন্টারপ্রেনরিয়াল লারনিং এ বীজ বোনার কাজ শুরু হয়েছিল ওয়ান্ডার গ্রাসের। নাগপুর, ঘন বাঁশবাগানের জন্য পরিচিত। এখানেই ২৫ জন শিল্পী নিয়ে কাজ করে ওয়ান্ডার গ্রাস। কিছু দিনের মধ্যে ভুবনেশ্বর,চেন্নাই এবং পুনেতে শোরুম খোলার পরিকল্পনা রয়েছে বৈভবের। এই শোরুমগুলির মাধ্যমে নির্মাণশিল্পে বাঁশের ব্যবহার এবং তার প্রয়েজনীয়তার কথা জানতে পারবেন গ্রাহকরা। ‘বাঁশের বাড়ির কথা ভাবতেই ভয় পান অনেকে। তাঁরা জানতে চান ‘এটা নিরাপদ তো? কাঠামো শক্ত হবে তো’? প্রথমে মানুষের জীবনে বাঁশের ব্যাবহার বাড়াতে হবে ‌যাতে বাঁশের সঙ্গে পরিচিতি ঘটাতে পারে। কিন্তু এত নির্মাণ সামগ্রীর ভিড়ে বাঁশের জায়গা কোথায়?, ভাবেন বৈভব। তাঁর মতে, মানুষ ইট-সুরকির বাড়ি চায় বটে, কিন্তু এগুলি পরিবেশ বান্ধব নয় একেবারেই। বাঁশি দিয়ে বাড়ি তৈরির সবচেয়ে বড় সুবিধে হল নির্মাণ খরচ একেবারেই কম অথচ টেকসই, স্থায়ীত্বের সঙ্গে আপোষের প্রয়োজন হয় না। গ্রামে একটা ৪০০ স্কোয়ার ফুটের পাকা ঘর বানাতে পড়ে ‌যায় ১.৭৫ থেকে ২ লাখ টাকা। অথচ সেটাই বাঁশ দিয়ে তৈরি হলে খরচ পড়বে ১.২৫ লাখ টাকা। তার উপর বাঁশ দিয়ে বাড়ি তৈরিতে সময়ও লাগে কম।এটা সবচেয়ে বেশি কা‌র্যকরি হয় দুর্যোগের পর, ‌যখন বিপর্যয় মোকাবিলা দল দ্রুত পুনর্বাসন দেয়। বাঁশের বাড়ি তৈরিতে ‌যন্ত্রপাতিও সোভাবে লাগে না। মূলত স্থানীয়ভাবে যা যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়, তাই কাজে লাগানো হয়। নির্মাণের ঝক্কি নেই বললেই চলে। বৈভব ভাবেন এমন একদিন আসবে যেদিন গ্রামের মানুষ বাঁশ দিয়ে নিজেদের টিকে থাকার উপায় বের করে নেবেন। ‘গ্রামের মানুষ যদি কাজটা শিখে নেন,তাহলে নিজেরাই ছোটখাটো ব্যবসা খুলে বসতে পারেন। এর ফলে শুধু নিজের বাড়ি নয়, অন্যের বাড়িও তৈরি করে দিতে পারেন। নাগালের মধ্যেই কাঁচামাল রয়েছে। সিমেন্টের জন্য অন্য কোথাও যেতে হবে না, বাইরের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। বাড়ি ছাড়াও গোয়াল, গ্রামে ছোট কমিউনিটি সেন্টার...‌যা খুশি’, বলেন বৈভব। ‘ওয়ান্ডার গ্রাস দারুণভাবে এগোচ্ছে। প্রথম দু বছর থেকে যা শিক্ষা নিয়েছি সেটাই দ্রুত এগোনর পথে সাহায্য করছে’, বললেন তরুণ ইন্টেরিয়র ডেকরেটর।

image


বাঁশের সুবিধা হল এটি বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড টেনে নেয় আর বাতাসে ৩৫ শতাংশেরও বেশি অক্সিজেন ছাড়ে। কোনও সার, কীটনাশক কিছুর প্রয়োজন হয় না। বর্জ্যও নেই বললেই চলে। আসবাব থেকে কাঠি, বাঁশ থেকে তৈরি পণ্যের বিশাল সম্ভার রয়েছে। আর এইসব জিনিসপত্র তৈরিতে এক একটা বাঁশের পুরও অংশই কাজে লাগে, ফেলা যায় না প্রায় কিছুই।

বাঁশ সব ক্ষেত্রেই কাঠের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। কাগজ, মেঝে, আসবাব, নির্মাণ সামগ্রী আরও অনেক কিছু বাঁশ দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে। কাঠের থেক বাঁশের তন্তু শক্ত হয়। ফলে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আকার খুব একটা বাড়ে কমে না। বাঁশের ওজন এবং নমনীয়তার জন্য ভূমিকেম্পর সঙ্গে ভালই লড়তে পারে। গ্রামীণ রুক্ষ এলাকায় যেখানে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বেশ বেশি সেখানে বাঁশের বাড়িই মানুষের বেশি পছন্দের। বাঁশ দিয়ে নির্মাণে যন্ত্রপাতি খুব একটা লাগে না বলেই চলে। স্থানীয়ভাবে ‌যা পাওয়া তাতেই চলে। ফলে নির্মাণে খুব একটা জটিলতা তৈরি হয় না। ঠিকমতো ব্যবহার করা গেলে ৫০ বছর প‌র্যন্ত টিকে থাকে বাঁশের বাড়ি। যদি ঠিকভাবে বাঁশ বাছা হয়, এবং নিয়মিত নষ্ট হয়ে ‌যাওয়া অংশগুলি বদলে দেওয়া যায় তাহলে স্থায়ীত্ব আরও বাড়ে। বাঁশ গাছের শেকড় মাটির ক্ষয় রোধ করে।তাছাড়া পরের চাষের জন্য পুষ্টি ধরে রাখে। অর্থাৎ বাঁশ মানেই লাভ।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags