সংস্করণ
Bangla

ভারজিন ভেলেন্টাইন-নিঃসঙ্গ প্রবীনদের জন্য ‘প্রতিমুখ’ এর প্রয়াস

tiasa biswas
11th Feb 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

বয়সের ভার, সঙ্গে দোসর একাকীত্ব। আমাদের চারপাশটায় আজকাল এমন মানুষের ভিড় বাড়ছে। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। কর্মসূত্রে সন্তানদের নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া। নিরুপায় বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের শেষ বয়েসটা কাটে হয় বৃদ্ধাশ্রমে, নয়ত দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার পরস্পরের ভরসায়। বলছি না, এর ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু যাদের শেষ বয়সটা পরিস্থিতির হাতে অসহায় আত্মসমর্পণের, তাদের কথাই ভেবে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিমুখ, একটি বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও। অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ভেলেন্টাইনস ডে সেলিব্রেট করানোর ব্যবস্থা করছেন প্রতিমুখের অন্যতম কর্নধার সুদেষ্ণা ভট্টাচার্য। সঙ্গে তাঁর টিম। আর এইসব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের অনুভুতি, চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনার অভিব্যক্তিগুলি ধরে রেখেছেন ক্যামেরায়। তৈরি করেছেন শর্টফিল্ম। নাম-ভারজিন ভেলেন্টাইন। বাংলা-ইংরেজি দুটো ভাষাতেই হল এই ফিল্ম।

image


কলকাতা থেকে খানিকটা দূরে, বারুইপুরে দেবাঙ্গন ওল্ডএজ হোমে এক দূর সম্পর্কের দিদাকে দেখতে যেতেন সুদেষ্ণা। ওই ওল্ডএজ হোমে এখন তাঁর অনেক দিদা। সবার সঙ্গে কেমন যেন আত্মীয়তার সম্পর্কে বাঁধা পড়ে গিয়েছেন। গেলেই বুড়ো-বুড়িদের নানা বায়নাক্কাও মেটাতে হয় তাঁকে। হোমে থাকা জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া মনুষগুলোর সঙ্গে গল্প করতে করতে জেনেছেন তাঁদের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, রাগ, অভিমান, না পাওয়ার যন্ত্রণা, অসহায়তার কথা। নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, যাদের এতগুলি ভেলেন্টাইনস ডে নিশ্বব্দে কেটে গিয়েছে শুধু ছেলেমেয়ে মানুষ করার পেছনে, তাঁরা কেন অবহেলিত? বুড়ো বয়সে তাঁরাই কেন একা হয়ে পড়ছেন? সন্তানদের ব্যস্ত সংসারে কেন এতটুকু সময় বরাদ্দ নেই তাঁদের জন্য? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই আইডিয়াটা আসে। ঠিক করলেন শর্ট ফিল্ম বানাবেন এই বুড়োদের নিয়ে, যেখানে মনের কথা উজাড় করে দেবেন জীবন সায়াহ্নে এসে প্রতিনিয়ত ঠোক্কর খেতে থাকা একদল প্রবীণ।

‘সেদিন একটা কাজে যাওয়ার সময় হঠাৎ দেখি দুই বুড়ো-বুড়ি রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছেন। দুজনেই নড়বড়ে। সঙ্গে কেউ নেই। কী মনে হল, তাঁদের গিয়ে জিজ্ঞেস করি, কোথায় যাবেন? বলেলন ডাক্তারের কাছে যাবেন। কেমন জানি খারাপ লাগল। এই বয়সে এভাবে দুজনকে কেউ একা ছাড়ে? নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে হাসপাতালে দিয়ে এলাম। এইসব মানুষদের পাশে দাঁড়াতে চায় প্রতিমুখ। এইসব মানুষরা তাঁদের যন্ত্রণার কথা বলুন, চায় প্রতিমুখ। আর চায় তাদের একটু আনন্দ দিতে’, বলছিলেন সুদেষ্ণা। শর্টফিল্ম তৈরি করার খরচ যোগানোও চাট্টিখানি কথা নয়। নিজের সবচেয়ে প্রিয় অনেক জিনিসপত্রও বিক্রি করে দিয়েছেন ফিল্মের জন্য টাকার যোগান দিতে গিয়ে। ভার্জিন ভ্যালেন্টাইনের আইডিয়া মূলত সংস্থার সিইও এবং আরও এক কর্ণধার শৈলেশ নায়ারের। ফিল্মের স্ত্রিপ্ট, ডিরেকশন সবটাই সুদেষ্ণার। সঙ্গে রয়েছে দেবলীনা আচার্য। ভিসু্য়াল অডিওর কর্ণধার। ডিরেকশনের খানিকটা এবং ফিল্মের টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছে দেবলীনার এই সংস্থা। ‘টাকা পয়সা সেভাবে দিতে পারছি না। তবুও ওরা আমার সঙ্গে আছে। আমি চাই আমার এই ফিল্ম দেখে আরও মানুষ এগিয়ে আসুক। সমাজের এই বৃদ্ধবৃদ্ধাদের পাশে দাঁড়াক, যাতে বাকি জীবনটা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারেন ওরা’, বলেন একসময়ের দাপুটে সাংবাদিক সুদেষ্ণা ভট্টাচার্য। ভেলেন্টাইনস ডে-র দিনে প্রবীন মানুষগুলিকে খানিকটা সময়ের জন্য হলেও যৌবনের ভেলেন্টাইনস ডে-তে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় তাঁর প্রতিমুখ। তার সব ব্যবস্থাও পাকা। খাওয়া দাওয়া গল্পগুজব সবই হবে ওই দিনটিতে।

বাঁকুড়ার কাছাকাছি পাহাড়ের কোলে তিনটে গ্রামে কাজ শুরু করেছে প্রতিমুখ। সেখানকার আদিবাসীদের ঘরেই হোম-স্টে তৈরি করে পর্যটন টানার কাজ ইতিমধ্যে শুরু করেছে এনজিওটি। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সেখানেও কটা দিন ঘুরিয়ে আনা হবে বলে জানান সুদেষ্ণা। ‘আমি চাই পর্যটকরা ওই গ্রামগুলিতে যান, সেখানে থেকে ছুটি উপভোগ করুন। তাতে স্থানীয় মানুষগুলির যেমন আয়ের পথ খুলবে, একেবারে মাটির কাছে থেকে একটু অন্যরকম সময় কাটিয়ে আসতে পারবেন পর্যটকরাও’, বলেন তিনি। শুধু তাই নয়, সুদেষ্ণার ইচ্ছে এখানে বেড়াতে আসা পর্যটকরা অন্তত কিছুদিন করে দত্তক নিক একাকী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। এভাবেই একসময় অসহায় ওই মানুষগুলিকে দত্তক নেওয়ার রেওয়াজ গড়ে উঠবে সমাজে। ফিল্মের একেবারে শেষে একটা আবেদনও রেখেছেন সুদেষ্ণা। যেখানে দেখা যাবে তিনি বলছেন, ‘আমি তো চললাম এদের নিয়ে। আপনারাও আমার পথ ধরে এগিয়ে আসুন...’

আরও অনেক ভাবনা আছে। তবে, ইচ্ছে থাকলেও সংস্থার আর্থিক সঙ্গতিই এখন সবচেয়ে বড় বাধা সুদেষ্ণার কাছে। ‘কোনও সংস্থা বা কারও কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পাওয়া গেলে পরিকল্পনাগুলিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ আরও একটু মসৃন হত। আমি চাই সবাই এগিয়ে আসুন। আমাদের এই সমাজকে ভালো রাখতে প্রতিমুখের পাশে দাঁড়ান’, সবার কাছে আবেদন রাখছেন সুদেষ্ণা ভট্টাচার্য। 

আরও পড়ুন

'নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের শহর' হয়ে যাবে City of Joy কলকাতা! বলছে London School of Economics এর একটি গবেষণা। গবেষণাটি করেছেন এক বাঙালি সমাজবিজ্ঞানী শাশ্বত ঘোষ।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags