সংস্করণ
Bangla

অ্যামব্রিমের ৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে যাচ্ছেন সাই

Hindol Goswami
17th Jun 2017
Add to
Shares
4
Comments
Share This
Add to
Shares
4
Comments
Share

আজ এমন একজনের সঙ্গে আপনাদের আলাপ করাবো যে জাতে উদ্যোগপতি তালে হ্যাকার। অনেকেই নিজেদের এথিকাল হ্যাকার পরিচয় দেন। ইনি নিজেকে বলেন গ্রে হ্যাট হ‌্যাকার। ২৬ নভেম্বর ২০০৮ এর আতঙ্ক এখনও অনেকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। মুম্বাইয়ের সর্বগ্রাসী আতঙ্ক গোটা দেশটাকে সেদিন সন্ত্রস্ত করে দিচ্ছিল। সেদিন এই হ্যাকার এগিয়ে এসেছিলেন তার অ্যানালাইসিস নিয়ে। পুলিশ প্রশাসন আর আর্মিকে সাহায্য করতে সেদিন পনের-ষোলো বছরের ছেলেটা সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট হিসেবে একের পর এক ক্লু ধরিয়ে দিয়েছিলেন। যার সূত্র ধরে এগিয়ে উপকৃত হয়েছিল মুম্বাই পুলিশ, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী। সবটাই ছিল গোপন। কেউ জানতেও পারেনি এই সাহসী তরুণের কাহিনি। 

image


আজ আপনাদের সেই তরুণের কাহিনি শোনাব। যে জীবনকে বাজি রেখে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন বহুবার। এক হাত দূর থেকে মৃত্যুর সঙ্গে করমর্দন করেও তাকে তাচ্ছিল্য করে ফিরে এসেছেন। নাম সাই তেজা পেদ্দানেনি। বয়স এখন পঁচিশ। এই চারা আনা জীবনেই পৃথিবীর কেন্দ্রে উঁকি মেরে দেখে এসেছেন তরল গরম লাভার লেলিহান আহ্বান। বিমান থেকে ঝাঁপ দিয়ে শুনতে চেয়েছেন নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ। আকাশ থেকে পড়ার মুহূর্তে নিজেকে বুঝিয়েছেন মৃত্যু যদি সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তাহলে কী এসে যায়। একটা বোতাম টিপলেই যদি প্যারাসুট খোলে তবে সেটার সময় এখনও আসেনি। 

এই হ্যাকার নিত্যদিনের ছাপোষা জীবন থেকে অসাধারণ অভিজ্ঞতা হ্যাক করে নিতে চান। সেই তাগিদই ওকে টেনে নিয়ে গেছে ইন্দোনেশিয়ার জীবন্ত আগ্নেয়গিরি ডুকোনোয়। জাকার্তার কাছে হালমাহেরস দ্বীপের ওই আগুন পাহাড় জয় করে সেখানে উড়িয়ে এসেছেন ভারতের তেরঙ্গা। এই তো সেদিন ফিরেছেন। গলিত লাভার সেই পাহাড়ে নিয়ত মৃত্যুর হাতছানি দেখে এসেছেন সাই। প্রতি পনের সেকেন্ডে গলিত লাভা উগরে দিচ্ছে সেই আগ্নেয়গিরি। প্রতি তিন থেকে পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে ফিনকি দিয়ে বেরচ্ছে লাভার মিসাইল। আর তার ধুয়োয় ঢেকে যাচ্ছে আকাশ। সামান্য ভুল হলেই ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গলানো লাভায় চিরবাস্প হয়ে যেতে পারেন এমনই মরণ শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিল সাই তেজার। তার মধ্যে ওই পাহাড়ের চুড়োয় উঠে উড়িয়ে এসেছেন ভারতের পতাকা। গর্বের সেই মুহূর্ত শক্ত চোয়ালের ছেলেটা এক কথায় বললেন মেসমেরাইজিং। মুগ্ধ আর বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সাই। বলছিলেন প্রকৃতির নগ্ন সুন্দর রূপটা আরও অনেকবার দেখতে চান। মৃত্যুকে এতটা কাছ থেকে দেখেও আশ মেটেনি। 

এবার আরও কাছ থেকে দেখে বলতে চান '... মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান।' তাই এবার ফুটন্ত লাভার লেকে যাওয়াই স্থির করেছেন। ন'শ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অগ্নিদেবকে বলবেন আমি তোমায় ভয় পাইনি। তুমি ভয় দেখাতে পারোনি। 

যাচ্ছেন ক্যালডেরা। ক্যামেরা ক্রিউ, সাপোর্টিভ টিম, বন্ধু অনিল সবাইকে নিয়ে যাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে এই লাভার লেকে। দু আড়াই কোটি টাকার ধাক্কা। স্পনসর খুঁজছেন। পেলে ভালো। না পেলে কষ্ট হবে। তবু... সেখানে মাউন্ট অ্যামব্রিম এবং মাউন্ট এরেবুস জয় করতে চললেন। এই প্রথম এশিয়ার কোনও অভিযাত্রী এই দুর্জয় আগ্নেয়গিরি জয় করবেন। এর আগে মাত্র কয়েকজন মার্কিন অভিযাত্রী এই কৃতিত্বের দাবিদার। বিরল সেই অভিযানের প্রস্তুতির কথা বলছিলেন সাই ও তার সহ অভিযাত্রী অনিল। অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে বানিয়েছেন অগ্নি প্রতিরোধী পোশাক। আগ্নেয়গিরির ভিতর নামবেন। যার কেন্দ্রের তাপমাত্রা ৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। লাভা লেককে ঢাকতে এই প্রথম হিট শিল্ড ব্যবহার করবেন সাই। প্রযুক্তিতে তুখোড়। নিয়মের বেড়া টপকাতে ওস্তাদ। গ্রে হ‌্যাট হ‌্যাকার। এবার প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে ঢুকতে চাইছেন এমন একটি জোনে যার ত্রিসীমানায় কোনও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। যেখানে প্রকৃতি নিষেধের সীমারেখা টেনেছে আগুনের বলয় দিয়ে। এর থেকে বড় হ্যাকিং আর কী হতে পারে। আর এটাই ওকে টানছে। সেই অমোঘ টান।

বলছিলেন, লেখা পড়ায় তেমন ভালো কোনও দিনই ছিলেন না। কিন্তু মাস্টার মশাইদের দাবি মাথা পরিষ্কার ছিল। বাবা ব্যবসা করতেন কোত্তাগুডামে। এখন তেলেঙ্গানায় একটা ছোট্ট শহর। সেখানেই দাপিয়ে ব্যবসা করতেন বাবা। তিনি সবসময় চাইতেন সেরা হতে। কখনও পিছিয়ে থাকতে চাননি। ছেলে মেয়ের আরও ভালো লেখা পড়ার জন্যে ওদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন হায়দরাবাদে। সাইয়ের বয়স তখন চোদ্দ। ততদিনে কম্পিউটার গুলে খেয়েছেন সাই। ততদিনে নিয়ম ভেঙে আরও গভীরে ঢোকার বিদ্যেটাও রপ্ত করে ফেলেছেন। প্রোগ্রামিংয়ের সব ল্যাঙ্গুয়েজই ততদিনে জলভাত। নিজের হ্যাকিং স্কিলও বাড়িয়ে ফেলেছেন অনেকটাই। এরই মধ্যে ২৬/১১ র ঘটনা। তারপর ক্রমাগত প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট হিসেবে। বিটেকে ভর্তি হন। কিন্তু প্রথম বছরই ড্রপ দেন। সেই শুরু। নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চ্যালেঞ্জ। যা করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তার থেকে অন্য কিছু করার সব সময় চেষ্টা করেন। সেটাই খুব চ্যালেঞ্জিং মনে করেন সাই। তাই তার কাজের একেবারে বিপরীতে থাকা কৃষি নির্ভর একটি স্টার্টআপ খোলেন ছেলেটি। রাজ্যের কৃষকদের জন্যে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। সেই টেকস্টার্টআপ শস্যম। তার সুবাদেই আসে সম্মান। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ২০১৫ সালে তাঁকে সেরা উদ্ভাবক হিসেবে সম্মানিত করে। উদ্যোগের দুনিয়ায় নাম ডাক হয়। কিন্তু কোথাও থেমে থাকার পক্ষপাতী নন সাই তেজা। জীবনে কিকটাই খুঁজছিলেন। আর সেই কিকের সন্ধানে কখনও সাইকেলে অভিযান করেছেন। কখনও আকাশ থেকে বানজাই জাম্প দিয়েছেন। আবার ছুটে গেছেন গলিত লাভার কাছে।

জিজ্ঞেস করেছিলাম ভয়-ডর কি সত্যিই নেই! প্রশ্নটা শুনে যেন অপরিচিত মনে হল শব্দটা। সাইয়ের উত্তর ভয় কেন হবে, যখন সাধারণত ভয় পাওয়ার কথা তখন নিজেকে ক্রমান্বয়ে প্রশ্ন করতে থাকি। আচ্ছা এটা হল তো তার পর কী, তারপর... তারপর... সেই অজানাকে দেখার কৌতূহলে ভয় গায়েব হয়ে যায়।

Add to
Shares
4
Comments
Share This
Add to
Shares
4
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags