সংস্করণ
Bangla

ধুলোমাখা অঙ্গনে ভরসার রুমেলি রোদ্দুর

Tanmay Mukherjee
19th Dec 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

সকাল হলেই স্কুলে চলে যাওয়া। আমরা সবাই ছোট্ট পাখি কিংবা এ ফর অ্যাপল আওড়ানো। এরপর ইচ্ছেমতো রঙয়ের আঁকিবুঁকি। সময়মতো হাত ধুয়ে খেয়ে নেওয়া। নোংরা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা। আবার পড়তে বসা। 

image


আমার-আপনার পাড়ায় এমন কেজি বা প্লে স্কুলের এখন বাড়বাড়ন্ত। কিন্তু এধরনের স্কুলে ভর্তি না করে মালদার ইংরেবাজারের সুকান্তপল্লির বাসিন্দারা স্থানীয় অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্রে সন্তানদের পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে থাকেন। আইএসডিএস কেন্দ্রে প্লে বা কেজি স্কুলের সমান পরিকাঠামো তৈরি করে স্রোতের উল্টোদিকে হাঁটছেন রুমিলা কর দাস। যার স্বীকৃতিও মিলেছে। দেশের অন্যউতম সেরা আইএসডিএস কর্মীর সম্মান পেয়েছেন ওই শিক্ষাকর্মী। চারিদিকে এত ভাঙনের মধ্যেও এভাবে নীরবে স্বপ্ন বুনে চলেছেন তিনি।

ইংরেজবাজার শহরের এক প্রান্তে সুকান্তপল্লি। এখানকার কেউ রিক্সা চালিয়ে কোনওরকমে রুটি-রুজির ব্যবস্থা করেন। কেউবাল রাজমিস্ত্রি, কেউ আবার অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। এমন পাণ্ডববর্জিত এলাকার বাসিন্দাদের কাছে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারটা একটা সময় তেমন গুরুত্ব পেত না। কয়েক বছর আগে থেকে সেই ছবিটা পাল্টাতে থাকে। স্থানীয় হালদারপাড়া অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের হাল ধরেন রুমিলা করদাস নামে এক মহিলা। তারপরই গল্পের স্রোত অন্যের দিকে বইতে থাকে। সায়ন্তিকা, খুশি, অমিত, বিক্রম, বিপুলরা আর সকালবেলায় উদ্দেশ্যহীনভাবে খেলাধূলা করে না। তারা ইউনিফর্ম পরে আইএসডিএস সেন্টারে চলে যায়। হইহই করে ঢোকা নয়, জুতো খুলে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে তারপর স্কুলে ঢুকতে হয় এটা তারা শিখেছে রুমিলাদেবীর থেকে। খাওয়ার আগে হ্যান্ডওয়াশ বা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে সেই শিক্ষায় তারা পেয়েছে। শৃঙ্খলার এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা এই ফুটফুটে ছেলেমেয়েরা।

মা‌লদহ স্টেশনের কাছে রেল কলোনিতে বাড়ি রুমিলাদেবীর। সাইকেলে চেপে যখন আইসিডিএস কেন্দ্রে যখন পৌঁছে যান তখন দেখেন ঘর ভর্তি অজস্র সন্তান। কেউ সুর করে - এ ফর অ্যাপল বলছে, কেউবা হিন্দিতে ছড়া, কেউ অ –এ অজগর আসছে তেড়ে। ৩২জনকে নিয়ে এভাবেই আনন্দের বারোমাস্যায় থাকেন ওই শিক্ষাকর্মী। এই তাগিদ পান কীভাবে ? রুমেলিদেবীর কথায়, বিয়ের ১০ বছর তাঁর কোনও সন্তান ছিল না। এই ব্যাপারে একটি সংস্থার সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন। এমন সময় এই কাজের ডাক পান। এইসব কচিকাঁচাদের পেয়ে মনের ভিতরের হাহাকার ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে যায় তাঁর। এরমধ্যেই তাঁর সন্তান আসে। বাড়িতে মেয়ে আর সেন্টারে অজস্র ছেলেমেয়ে। এভাবেই বেশ আছেন তিনি। নিজের খরচে কচিকাঁচাদের ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করেছেন। সেগুলো নোংরা হলে তা ধোয়া, আয়রণ করার বিষয়টি‌ও তাঁর কাঁধে। সেন্টারের পড়ুয়াদের জন্য আই কার্ডের বন্দোবস্তও করেছেন।

আইএসডিএস কেন্দ্রে এমন পড়াশোনার পরিবেশ দেখে সুকান্তনগর এলাকার স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানরাও এখানে ভর্তি হচ্ছে। কার্যত এলাকার প্রায় সব শিশুই এখন এই সেন্টারে নাম লিখিয়েছে। সদিচ্ছা এবং স্বপ্ন দেখলে অনেক পিছুটানকে হেলায় পিছনে ফেলে দেওয়া যায় তায় দেখিয়েছেন রুমিলা করদাস। সেই এগোনের পথে আরও গতি দিতে ওই সেন্টারের দায়িত্বে থাকা সুপারভাইজার নানা রকম খেলনা পাঠিয়েছেন। রুমিলাদেবীর অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এখন মডেল সেন্টার হয়েছে। গত বছর এরাজ্য থেকে মাত্র দুজন আইসিডিএস কর্মী সেরার পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে রুমিলা করদাস অন্যতম। দেশের বারো লক্ষেরও বেশি আইসিডিএস কর্মীর মধ্যে এই পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারে ওই শিক্ষাকর্মী জানালেন, এই সম্মান আসলে পড়ুয়াদের। ওরাই সব। সায়ন্তিকা যখন ঝরঝর করে ছড়া বলে, কিংবা বিপুল যখন সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকে তখন মনে হয় কিছু একটা বোধহয় করতে পেরেছি। এমন স্পর্শ পেয়ে কচিকাঁচারও জানে পড়াশোনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ সময়মতো টিকা নেওয়া, রোজ সকালে ওঠে ব্রাশ করা। তেমনই এলাকার বাসিন্দারও বুঝতে পেরেছেন ছেলেমেয়েরা স্কুলে গেলে লাভ হবে সকলের। রুমিলাদেবীর কথায়, ‘আমি কোনও কিছু পাওয়ার জন্য তো করি না, ওদের সাফল্যের হাসিতেই যে আমার আনন্দ।’

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags