সংস্করণ
Bangla

চেতলা থেকে সোয়ানসি, রাজ-এর Roti তে মজে রানির রাজ্য

Hindol Goswami
8th Oct 2017
Add to
Shares
15
Comments
Share This
Add to
Shares
15
Comments
Share

চায়েওয়ালা থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গল্পটা আপনারা সকলেই জানেন। আমি সেই গল্পের ভিতর ঢুকব না। আজ আপনাদের শোনাব অন্যরকম একটি গল্প একটি চাওয়ালার ছেলের সাফল্যের কাহিনি। শূন্য থেকে শুরু করা একটা মানুষের বীরগাথা। সেই কাহিনির সঙ্গে প্রসঙ্গত বলে রাখি আরও একজনের জীবনের খুব মিল আছে, তিনি চন্দ্রশেখর ঘোষ, বন্ধন ব্যাঙ্কের প্রাণপুরুষ। তাঁর বাবাও বাংলাদেশ থেকে ফিরে কলকাতায় শেষমেশ চা সিঙারা মিষ্টির দোকান দিয়েছিলেন। গোটা পরিবার প্রতিপালন করতে এটাই ছিল তার লড়াইয়ের হাতিয়ার। 

image


কিন্তু চন্দ্রশেখর বাবুর গল্পটাও আপনি বাংলা ইওর স্টোরির পাতায় আগেই পড়ে ফেলেছেন। ফলে আজকের কাহিনির চরিত্রটি নিতান্তই আনকোরা। এই ভদ্রলোক থাকেন সুদূর ব্রিটেনের ওয়েলসের একটি ছোট্ট মফঃস্বল শহর সোয়ানসিতে। নাম বিতব্রত চৌধুরী। তবে এই বিতব্রত নামে তাকে হাতে গোণা কয়েকজনই চেনেন। বাকি সকলেই এক ডাকে জানেন সেফ রাজ এই নামে। 

সেফ। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখেছেন সেফ হবেন। কারণ ছোটবেলা থেকেই বাবাকে দেখেছেন একটা খাবারের দোকান চালান। একটা ক্যান্টিন। রাজের বাবা। নারায়ণ চৌধুরী। খুব অল্প বয়সেই মাকে হারিয়েছিলেন। বাবা থেকেও ছিলেন না। ফলে আশ্রয় নিতে হয়েছিল কলকাতায় মামা বাড়িতে। চোদ্দ পনের বছরের ছেলেটা কোনওক্রমে মামা বাড়িতে আশ্রয় তো পেলেন। কিন্তু জীবন ধারণের জন্যে হাতে কেটলিও ধরতে হল। প্রথমে চায়ের দোকানে কাজ করতেন আলিপুরে। তারপর সেখান থেকে একটু একটু করে তৈরি হল চায়ের দোকান। এভাবেই একটি সরকারি দফতরে চা-জলখাবারের একটা ছোট্ট ক্যান্টিন খুলে বসলেন। রোজগার বাড়ল। এবং গড়িয়ে গেল জীবনের চাকা। রাজ বাবার এই লড়াইটা খুব ছোটবেলা থেকে দেখেছেন। এবং দারুণ উদ্বুদ্ধ। খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাবাকে। কীভাবে, নিজে খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন সেকথা বলছিলেন আমায়। নবনালন্দায় ভর্তি করেছিলেন রাজকে। নবনালন্দা স্কুলে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্তটা একটু আগ বাড়িয়েই নিয়েছিলেন নারায়ণ বাবু। নিজের পড়াশুনোয় ব্যাঘাত ঘটেছে। কিন্তু ছেলেকে সুশিক্ষিত করার ক্ষেত্রে কোনও কার্পণ্য করেননি। একথা বলতে গিয়ে ব্রিটেনে নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো উদ্যোগপতি রাজের চোখ তখন ভেজা। বলছিলেন, মাকে দেখেছেন চেতলার খালের কাদা বালতি করে তুলে গুল দিতে। সেই গুল শুকিয়ে গেলে তাইই নিয়ে যেতেন বাবা। সেগুলো উনুন ধরাতে কাজে লাগত। ছোটবেলার স্মৃতিতে তলিয়ে যাচ্ছিলেন রাজ।

রাজ, এই নামটা ভীষণ কমন। কিন্তু ওকে ব্যাখ্যা করতে ওর ডাক নামটাই যথেষ্ট। কারণ ও হারতে শেখেননি। সারাটা জীবন স্কুলের চৌহদ্দি থেকে বৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণে লড়াই অনেক করেছেন। আর না জেতা পর্যন্ত দমে যাননি। আমার সঙ্গে প্রথম আলাপ কামাল আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। ২০০৫ সাল। সেই থেকে দোস্তি। ইস্তানবুল থেকে দিল্লি আসার গোটা রাস্তাটায় ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। মনে আছে আজ থেকে বারো বছর আগে যখন দেশে ফিরছিলাম, তখন ও ছিল আমার ঘুমের ব্যাঘাত। জেট ল্যাগের কারণ। আর আজ ওর কথা বলতে গিয়ে আমার বেশ গর্ব হচ্ছে। সোয়ানসিতে একটা ছোট্ট স্টার্টআপ খুলেছেন সম্প্রতি। ভারতীয় রান্নার একটা স্টার্টআপ। নাম রোটি। দীর্ঘ প্রায় কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন নামকরা রেস্তোরাঁ চেনে কাজ করেছেন, শুরু করেছেন, কলকাতায়। আইআইএইচএম এর ছাত্র। পার্ক হোটেল থেকে কার্নিভাল ক্রুজ। আন্তর্জাতিক এক্সপোজার অনেক পেয়েছেন। ইটালিতে হোটেল ম্যানেজমেন্টের উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন। তিন চারজন মানুষের কথা বারংবার বলেন রাজ, যারা না থাকলে ও হয়ত এখানে এসে পৌঁছতেই পারতেন না। তাঁদের একজন সোমনাথ ভট্টাচার্য। ক্রুজে যখন কাজ করতেন সেই সময় সিনিয়র সেফ হিসেবে পেয়েছিলেন সোমনাথ বাবুকে। সোমনাথবাবুর প্রেরণায় ইটালিতে পড়তে যাওয়া। পিয়ারলেস হোটেলের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর তরুণ কুমার মাইতির কথাও বারবার ঘুরে ফিরে আসছিল ওর কথায়। বলছিলেন, এই মাইতি স্যারই নাকি ওকে সরোবর গ্রুপে সুযোগ দিয়েছিলেন। তারপর খুব সাপোর্ট করেছেন। আর ব্রিটিশ সেলেব্রিটি সেফ গর্ডন ব়্যামসে। শিক্ষক হিসেবে ব়্যামসেকে খুব মান্য করেন রাজ। রান্না ঘরের আদব কায়দা, খুঁটিনাটি নিয়ে ব়্যামসে ওকে খুঁতখুঁতে হতে শিখিয়েছেন। কথায় কথায় ব়্যামসের তেলেবেগুনে ছ্যাঁক করে ওঠাটাও দারুণ উপভোগ করেছেন শিক্ষানবিশির সময়।

অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই মানুষও ওকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কুণ্ঠা বোধ করেনি। ২০০৭ সালে বিয়ে করেন। ২০১০ সালে যান ব্রিটেন। কাজের সন্ধানে। এর আগে টার্কিতে কাজ করেছেন। মার্কিন মুলুকেও বেশ কিছু দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু ব্রিটেনে ওর জন্যে অপেক্ষা করছিল অন্য লড়াই। কলকাতার ছেলেটা বিলেতে যাওয়ার আগে জানতেন বিশাল কোনও রেস্তরাঁয় সু সেফ হতে হবে। কিন্তু গিয়ে দেখলেন একটি ছোট্ট রেস্তরাঁ। কোনও একজিকিউটিভ সেফ নেই। এক মহিলা ক্যাশ সামলান, একটি হেল্পর গোছের ছেলে আছে। বাকিটা ওকেই সব সামলাতে হবে। স্বপ্ন ভঙ্গের সেই মুহূর্তে দুটো রাস্তা খোলা ছিল, এক যাদের মারফত এখানে আসা তাদের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে কলকাতায় ফিরে যাওয়া আর দুই, লড়াইটাকে চালিয়ে যাওয়া, কখনও সমঝে নিয়ে আর কখনও সমঝোতা করে। দ্বিতীয় রাস্তাটাই ধরলেন। কারণ লড়াকু বাবার কাছ থেকে লড়াইয়ের কঠিন বীজমন্ত্রটা শিখে ফেলেছিলেন রাজ। বলছিলেন লড়াই করার ধাতটা তার ছিল। বলছিলেন ইটালিতে পড়তে যখন গিয়েছিলেন তখন পকেটে মাত্র দেড়শ ইউরো। সেটুকুই সম্বল। তাই নিয়েই ও সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছেন ক্লাসের ধনী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। এক বন্ধুর সঙ্গে চুক্তি ছিল তার সব কাজ ও করে দেবে বিনিময়ে থাকা খাওয়ার খরচ জোগাবে ওই বন্ধু। বন্ধুদের নোংরা জামা কাপড় কাচার কাজ করতে করতে একটা সময় ওয়াশম্যান এই পরিচয়ও বয়ে বেরিয়েছেন দীর্ঘদিন। ফলে রানির রাজ্যে গিয়ে খুব একটা অসুবিধে হয়নি।

লড়েই জিতেছেন সব বাজি। যে রেস্তরাঁয় যখন কাজ করেছেন সেটাকেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন নিজের পায়ে। নিজেকে প্রমাণ করে বেরিয়ে এসেছেন। একের পর এক নামকরা রেস্তরাঁয় কাজ করেছেন রাজ। ওয়াগামামা, লাস ইগুয়েনা থেকে জিম্মিস। এতদিনে খ্যাতিও হয়েছে। ওয়েলসের মত জায়গায় ওর রান্নার ফ্যান ফলোয়িং তৈরি হয়েছে। বলছিলেন, সোয়ানসি শুধু নয় গোটা ইংল্যান্ডেই একটা সমস্যা আছে, ভারতীয় রান্না বলে যা চলে সেগুলো আসলে কোনওভাবেই ভারতীয় রান্না নয়। অধিকাংশটাই বাংলাদেশের। স্বাদে, গন্ধে, রেসিপিতে অনেক পার্থক্য আছে। যারা সত্যিকারের ভারতীয় খাবার পেতে চান তাদের যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। এই শূন্যস্থানটা পূরণ করতেই চাকরি ছেড়ে পুরোদস্তুর উদ্যোগপতি হয়ে উঠলেন রাজ। খুললেন তার স্টার্টআপ রোটি ইন্ডিয়ান টেকঅ্যাওয়ে। ছোট ছোট কিয়স্ক। শহরের বিভিন্ন জায়গায় খুলেছেন। একটা সেন্ট্রাল কিচেন সেখানে রান্না হচ্ছে। রাজ পেয়েছেন তার বন্ধু গোয়ার ছেলে জুয়েলকে। ব্রিটেনে একটু একটু করে নিজের গ্রিপটা শক্ত করেছেন রাজ। নাগরিকত্ব তো পেয়েইছেন। ব্যবসাও বাড়ছে তরতর করে।

একান্ত আলাপচারিতায় বলছিলেন, এক দু বছরের মধ্যে রোটি এই ব্র্যান্ডটাকে সোয়ানসি থেকে নিথ, ট্যালবট, ব্রিজেন্ড হয়ে কার্ডিফে পৌঁছে দিতে চান। ছোট ছোট কাউন্টি পেরিয়ে কার্ডিফে শক্ত ঘাঁটি পাততে চান রাজ। তারপর রানির দুর্গ পর্যন্ত রাজের বিজয় রথ ছোটানো তো শুধু সময়ের অপেক্ষা। কলকাতার চেতলার বস্তি থেকে উঠে আসা ছেলেটা শুধু ভারতীয়ত্ব দিয়েই তাই বুনছেন রানির প্রাসাদ নগরী জয়ের স্বপ্ন। প্রেরণার আসল সন্ধানটা লুকিয়ে রয়েছে কলকাতার এই দুর্দমনীয় স্পিরিটে।

Add to
Shares
15
Comments
Share This
Add to
Shares
15
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags