সংস্করণ
Bangla

বিয়ের ফুলে বাঙালির লক্ষ্মীপুজো

28th May 2016
Add to
Shares
26
Comments
Share This
Add to
Shares
26
Comments
Share

বিয়ের ফুল ফুটুক না ফুটুক বাঙালির বসন্তের খোঁজ রাখে কলকাতার বেশ কয়েকটি ওয়েডিং স্টার্টআপ। ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিয়ে এমন একটা বিষয় যেখানে এখনও পাত্র ও পাত্রী বিজ্ঞাপণ দেখে কাছে আসেন। প্রেমে পড়েন। এবং বিয়ের ফুল প্রস্ফুটিত হয়। তাই বিয়ে মানে আনন্দবাজার, বর্তমান, দ্য স্টেটস্‌ম্যান, টাইমস অব ইন্ডিয়ার মত পত্রিকার মেট্রিমোনি কলাম হাতড়ানোর কৌতুহলী অভিজ্ঞতা। আজকাল তাতে কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। বিয়ের বাজার বড় হচ্ছে। সেই বাজার নিয়ে রীতিমত গবেষণা চলছে। গজিয়ে উঠছে একের পর এক ওয়েডিং স্টার্টআপ। কেউ পাত্রকে পাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছেন, কেউ বিয়েটা প্ল্যান করে দিচ্ছেন, কেউ বা বিয়ের সরঞ্জাম অনলাইনে বিক্রি করেই বাজার জমিয়ে দিচ্ছেন। বাঙালির এই ঘটকালির ব্যবসায় মা লক্ষ্মী বাঁধা। কিন্তু জানেন কি, বাঙালি এখন শুধু বাঙালির জন্যে ঘটকালি করে না, গোটা দুনিয়ার জন্য ঘটকালি করে কলকাতার বেশ কয়েকটি স্টার্টআপ। তাদেরই একটি এবিপি ওয়েডিং।

image


এবিপি মানে বাঙালির প্রথম পছন্দের পত্রিকা আনন্দবাজার। এর পাত্রপাত্রী কলামের একটা সুদীর্ঘ লেগাসি রয়েছে। আমার দিদির বিয়ের আগে দেখেছি বাবা মা শীতের দুপুরে ছাদের রোদে পিঠ দিয়ে গোটা রোববার পত্রিকার বিশেষ একটি পাতা নিয়ে বসে যেতেন। কী উৎসাহ! ওদের দাম্পত্যে এত ঘণিষ্ট মুহূর্ত এর আগে বিশেষ মনে পড়ে না। দেখতাম ওঁরা নানান বিজ্ঞাপণে লাল কালির মোটা স্কেচ পেনে গোল দাগ আঁকতেন। বিজ্ঞাপণের অদ্ভুত সব ভাষা। কেউ লিখছেন চাই সঃচাঃ। কেউ বলছেন নাম মাত্র বিয়ে, ডিভোর্সি। কেউ চাইছেন পাত্রের নিজস্ব বাড়ি। কারও দাবি পাত্রীকে সুশ্রী গান জানা, গৃহকর্মে নিপূণা হতে হবে। কারও দাবি কায়স্থ, ব্রাহ্মণ, মুৎসুদ্দি, তিলি, নাপিত, নমশুদ্র। মুসলিমদের মধ্যেও নানান শ্রেণি। সামাজিক পছন্দের বহরও অন্যরকম। একবার দেখলাম সৈয়দ বংশীয় পাত্রের জন্যে সুশীলা শরিয়তি আদব কায়দা মেনে চলা পাত্রীর খোঁজ চলছে বিজ্ঞাপণের কলামে। কিন্তু দিন যত এগোচ্ছে এধরণের বিজ্ঞাপণের বাজার তত ছোটো হচ্ছে। রেসপন্স রেট কমছে। গুণগত মানও কমে আসছে। আদতে ইন্টারনেটের বিশাল দুনিয়ায় শিক্ষিত শ্রেণির মানুষ খুঁজছেন নতুন ঠিকানা। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দায় যেমন আছে তেমনি আছে দীর্ঘদিনের সুনাম বয়ে বেড়ানোর দায়িত্ববোধও। সব মিলিয়েই ডানা মেলল আনন্দবাজার। ২০১৫ সালের অক্টোবরে খুলল এবিপি ওয়েডিং। কথা হচ্ছিল সংস্থার এক কর্তার সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, এই মেট্রিমোনি পরিষেবা দেওয়ার এত সংস্থার ভিড়ে তাঁরা কেন আলাদা। কোথায় তাঁরা স্পেশাল। বলছিলেন, ওদেরটা মোটেই ডেটিং সাইট নয়। সত্যিকারের অভিভাবক সুলভ গাম্ভীর্য নিয়েই পাত্রের Where abouts জোগাড় করেন ওরা। নাম নথিভুক্ত করার সময় রীতিমত আধার কার্ড, প্যান কার্ডের খোঁজ পড়ে। নিজের সম্পর্কে যে কোনও দাবি নথিভুক্ত করতে তার প্রমাণপত্র দেখাতে হয় সংস্থাকে। সেসব তথ্য সংস্থা গোপন রাখে। কিন্তু এই প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে পাত্র বা পাত্রী সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেন। এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ব়্যাঙ্কিংয়েরও উল্লেখ থাকে তাঁর প্রোফাইলে। ফলে কেউ যাতে মিথ্যে বা ভুল তথ্য দিয়ে কাউকে প্রতারণা না করতে পারে সেদিকে কড়া নজরদারি করে এবিপি ওয়েডিং। এভাবে এই অল্পদিনেই পাত্রপাত্রীর অভিভাবকদের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এই সংস্থা।

আনন্দবাজার পত্রিকার একটি অনুসারি প্রতিষ্ঠান হয়েও এবিপি ওয়েডিং কী করে একটি স্টার্টআপ, এই প্রশ্নই মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। জানতে চাওয়ায় সংস্থার মার্কেটিং হেড বিশ্বরূপ দাস বলছিলেন এধরণের ব্যবসায় ওরা বেশ কয়েকটি এক্সপেরিমেন্ট করার চেষ্টা করছেন। সেল্ফ সাস্টেনেবল মডেলেই চলছে এবিপির ওয়েডিংয়ের ব্যবসা। ওরা যেভাবে লড়ছেন সেটা আসলে একটি স্টার্টআপ সুলভ লড়াই। তাই বিগ ব্র্যান্ড আনন্দবাজারের অনুসারি হয়েও নিজেদের ফুললি ফান্ডেড স্টার্টআপ হিসেবেই দেখেন ওঁরা। ওঁদের প্রধান প্রতিপক্ষ বেঙ্গল মেট্রিমোনি, ভারত মেট্রিমোনির মত সংস্থা। সেই বাজারেই থাবা বসাতে চাইছেন বিশ্বরূপ। কিন্তু ব্যবসার মডেল থেকে এথিকস, সবেতেই অভিনব এই সংস্থা এখন চাইছে দ্রুত গতিতে এগোতে। পাশাপাশি, নিজেদের ব্যবসার পরিধিও বাড়াতে চাইছে। এক ছাতার তলায় বাঙালির বিয়ের গোটাটা আনা যায় কিনা তাই নিয়ে চলছে ভাবনা চিন্তা।

image


এদিকে, এই কাজটার অনেকটাই করে Truelyours.in, কলকাতার আরও একটি স্টার্টআপ। রাজস্থানের কোনও প্যালেস, কেরলের নিঃস্বর্গ, কাশ্মীরের উপত্যকা কিংবা গোয়ার উদ্দাম যৌবনোচ্ছল সমুদ্র সৈকত যেখানে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারেন। আপনার স্বপ্নের বিয়েকে আরও মধুর আরও সুন্দর, আরও নির্ঝঞ্ঝাট করে তুলতে পারে এই সংস্থা। সংস্থার কর্ণধার বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় বলছিলেন বাজারটা বাড়ছে। কলকাতার এই সংস্থা ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করে। এই চার বছরে দেশ বিদেশের কম করে শ'চারেক দম্পতির হ্যাপি ম্যারেজের সঙ্গী বিশ্বদেব। ওঁরা মূলত বিয়ের ক থেকে চন্দ্রবিন্দু সমস্ত ব্যবস্থা করে দেন। বিয়ে কোথায় কিভাবে হবে, সেই প্ল্যানিং যেমন করেন তেমনি কী হবে মেনু, কোথায় কোথায় কী কী পার্টি হবে, কীভাবে বিয়েটাকে আরও স্মরণীয় করে তোলা যাবে সবই ওদের নখদর্পণে থাকে। বিশ্বদেব বলছিলেন, ওয়েডিং ট্যুরিজম বা বিয়ে সংক্রান্ত পর্যটনের বাজারটা এখন চাঙ্গা। ইউরোপ বা আমেরিকার কোনও ক্লায়েন্ট যদি চান ওই দেশে ধূমধাম করে নিজের বিয়েটাকে স্মরণীয় করে রাখবেন তাহলে তার যা খরচ পড়বে তার তুলনায় অর্ধেকেরও অর্ধেক খরচে তিনি সবান্ধব ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের প্ল্যান করতে পারেন। আর এই কাজটাই করে দেন তিনি। বিয়ের প্ল্যানিং মানে শুধু মণ্ডপ সাজানো আর খাওয়া দাওয়ার প্ল্যানিং নয়। রীতিমত অভিনবত্ব, সৃজনশীলতা দিয়ে এক একটি বিয়ের ইভেন্টের গোটা হসপিটালিটি সামলান ওরা। ওদের কোনও পূর্বনির্ধারিত প্যাকেজ থাকে না। ক্লায়েন্টের ইচ্ছে এবং সামর্থ অনুযায়ী ওরা ইভেন্ট প্ল্যান করেন। যাতায়াত, থাকা খাওয়া বিয়ের গোটা হ্যাঁপা এবং পাশাপাশি একটু এদিক সেদিক ঘুরিয়ে দেখানো সবটাই একা হাতে সামলায় ওঁর ট্রুলি আওয়ারস। মোট খরচের একটা সামান্য অংশই নেন পরিষেবার জন্যে। বিয়ে দিতে ওরা অস্ট্রেলিয়া, নাইরোবি, জিম্বাবোয়ে এবং দুবাই নিয়ে গেছেন ক্লায়েন্টদের। সেখানে ওদের ভেন্ডাররা আছেন। পাশাপাশি ভারতেও বহু বিদেশি ক্লায়েন্ট বিয়ে করতে এসেছেন। ওদের ক্লায়েন্টবেসের খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম, সেখানে ভারতীয় বাঙালির প্রজাপতি দর্শন কমই হয়েছে। অধিকাংশই অবাঙালি এবং প্রবাসী। আর যেসব বাঙালি এই ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের মজা নিতে পিছপা হন না তাঁদের অধিকাংশই বাংলাদেশের মানুষ। কিছু বিদেশিও আছেন যারা নিজেদের বিয়ের মত স্পর্শকাতর বিষয়টা বিশ্বদেবদের হাতে ছেড়ে দিয়ে দিব্যি নিশ্চিন্ত হয়েছেন।

বিয়ে মানে তো শুধু বিয়ে নয়। বিয়ে মানে সাজগোজ। বরের জেল্লাদার জুতো, নাগড়াই, পাগড়ি, দারুন শেরওয়ানি। কনের ভারি লেহেঙ্গা, সোনালি সুতোর জমকালো বেনারসি, কানের ঝুমকো, সোনার মুকুট আরও অনেক, অনেক কিছু... আবার হয়তো পোশাকটা অল্টার করতে হবে। নতুন করে বানাতে হবে দারুণ কোনও পিস থেকে দুর্দান্ত একটা পোশাক। কোথায় যাবেন। এক জায়গায় সব কিছু নিয়ে হাজির বিশ্বদেবদের আরও একটি স্টার্টআপ WEDDCART, অনলাইন বিয়ের বাজার। ট্রুলি আওয়ারসের কাজ করতে করতেই ওয়েডকার্টের প্রয়োজনীয়তা টের পেয়েছিলেন বিশ্বদেব। বলছিলেন, "ঘরে বসে পছন্দ করুন, অর্ডার দিন। আপনি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তা আপনার কাছে পৌঁছে যাবে। হ্যা প্রয়োজনে সেলাইও করে দেব আপনার মাপ মতো। ওয়েডকার্টের ইকমার্স সাইটে আপনি পাবেন বিয়ে সংক্রান্ত প্রায় সমস্ত জিনিস। এমনকি বিয়ে দেওয়ার জন্যে পুরোহিতের দেওয়া ফিরস্তি অনুযায়ী জরুরি সরঞ্জামও।" যেভাবে এগোচ্ছেন বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় তাতে হেসে খেলে ৬০-৭০ শতাংশ গ্রোথ দেখতে পাচ্ছেন এই আদ্যোপান্ত ব্যবাসায়ী।

image


বিশ্বদেব ভবানিপুরের ছেলে। বাবা হরিণঘাটার ডেয়ারিতে কাজ করতেন। রীতিমত ছাপোষা সরকারি চাকুরে। কিন্তু ওর মধ্যে সবসময় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ঝোঁক ছিল। ছোটোবেলা থেকেই তাই ঝুঁকি নিতে চেয়েছিল ও। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর থেকেই ব্যবসা করা শুরু করে দেন বিশ্বদেব। কুড়ি একুশ বছর বয়সে মাদার ডেয়ারির এজেন্সি নেন। দুধের ব্যবসা দিয়ে শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন ইভেন্টে ইলেক্ট্রনিক্স সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ করতেন। মেসি যেবার কলকাতায় এল তখন তিনি এলসিডি প্রজেক্টর সরবরাহ করা, মিডিয়া সেন্টার তৈরি করার বরাত পান। তারপর থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। আইএফএ-র খেলায় আইপিএলএর খেলায় বড় বড় স্ক্রিন লাগানোর প্রজেক্টর লাগানোর ব্যবসা করেছেন। এভাবেই ধীরে ধীরে ইভেন্ট সামলানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। বছর পাঁচেক আগে সল্টলেকে একটি অফিস খুলেছিলেন। এখন সেটা ছোটো হয়ে গিয়েছে। ব্যবসা যত বেড়েছে তত টের পেয়েছেন আরও বড় জায়গা লাগবে। তাই এখন দক্ষিণ কলকাতাতেই খুলছেন বড়সড় একটি অফিস যেখানে এক ছাদের তলায় তার সব ব্যবসাকেই নিয়ে আসতে পারবেন। এই যাত্রা পথে বিশ্বদেব পাশে পেয়েছেন তরুণ টেকনোক্র্যাট দেবাশিস সিনহাকে। তার দৌলতেই দুর্দান্ত সাইট, মোবাইল অ্যাপ চালু করতে পেরেছেন তিনি। সব মিলিয়ে ভবানিপুরের বিশ্বদেব খুবই আশাবাদী। কিন্তু তিনি অকপটেই বললেন আরও এগোতে গেলে চাই ফান্ড। অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টরদের সঙ্গে তাই নিয়মিত যোগযোগ করছেন। সব ঠিক থাকলে আরও শক্তিশালী গ্রোথ ইঞ্জিন জুড়ে দিতে পারবেন তাঁর দুই ওয়েডিং স্টার্টআপের সঙ্গে।

Add to
Shares
26
Comments
Share This
Add to
Shares
26
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags