সংস্করণ
Bangla

ছেলের কান্না দেখে ব্যবসায় নামলেন বাবা!

5th Oct 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

একদিন রাতে বাড়ি ফিরে রাজভি মাকুল দেখলেন তাঁর ছ'বছর বয়সি ছেলে কান্নাকাটি করছে। ব্যাপারটা আসলে আর কিছুই নয়, কম্পিউটারে Angry Birds গেম খেলছিল ছেলে। সেই গেমের ফাঁকে জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর ছবি দেওয়া কিছু জিনিস (টি শার্ট, মাগ, মোবাইলের কভার) বিজ্ঞাপন হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছিল। ছেলের বায়না সেগুলো তারও চাই। আর তাতেই কেঁদে চোখ লাল। ছেলের মন রাখতে ইন্টারনেটে জিনিসগুলোর খোঁজ লাগালেন রাজভি। জানতে পারলেন সেগুলো একমাত্র ফিনল্যান্ডেই পাওয়া যায়। সেখান থেকে আনাতে গেলে খরচ পড়বে খুব কম হলেও ৫ হাজার টাকা। সামান্য দু'একটা জিনিসের জন্য এত ঝঞ্ঝাট মানতে পারেননি রাজভি।

সেদিন রাতেই যে কোম্পানি Angry Birds বানিয়েছে সেই Rovio-তে ই-মেল করলেন রাজভি। ভারতে তিনি এর ডিস্ট্রিবিউটর হতে পারেন কি না তা জানতে চেয়েই মেল পাঠানো। জবাবও এল। তাতে রাজভি বুঝলেন Rovio ডিস্ট্রিবিউটরশিপের জন্য আগ্রহী নয়, তারা চায় লাইসেন্সড পার্টনারস। সেটাই ছিল licensing industry-তে রাজভির পা রাখা। কী এই লাইসেন্সিং পার্টনার? লাইসেন্সিং হচ্ছে কোনও ব্যক্তি বা সংস্থাকে ব্র্যান্ডের ডিজাইন বা ইমেজ ব্যবহার করতে দেওয়ার অনুমতি। তবে ডিজাইন বা ইমেজের কপিরাইটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ব্র্যান্ডিং সংস্থার হাতেই। আবার অন্যভাবে বলা যায়, লাইসেন্সিং হচ্ছে একটা লিগাল এগ্রিমেন্ট বা আইনি চুক্তি যাতে ডিজাইন বা ইমেজের মালিক (the licensor) কোনও উৎপাদনকারী বা রিটেলারকে (the licensee) নির্দিষ্ট জিনিসপত্রে সেই ডিজাইন ব্যবহারের অনুমতি দেয়। কোন রাজ্য বা ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে, কতদিনের মেয়াদে তাও নির্দিষ্ট করে বলা থাকে চুক্তিপত্রে। ২০১১ সালে স্ত্রী সৌমা নিধিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক ডজনেরও বেশি ব্র্যান্ডের লাইসেন্সিং পার্টনার হয়ে যান রাজভি। ভদোদরাতে খুলে বসেন অফিস। সংস্থার নাম দেন Swadesh Essfil.

ব্র্যান্ডের বাজারে দম্পতি

যে সব ব্র্যান্ড নিয়ে রাজভি-সৌমা কাজ করতে থাকেন তার মধ্যে রয়েছে Angry Birds, Hello Kitty, Dreamworks Animation. এইসব entertainment house-এর যে কোনও মুভির (Kung Fu Panda, Shrek, Madagascar ইত্যাদি)ডিজাইন তাঁরা কাজে লাগালেন। ২০১২ সালে Flipkart-এর সঙ্গে পার্টনারশিপে ই-কমার্স ওয়েবসাইটে Back-To-School sales শুরু করেন রাজভি। লাইসেন্সড জিনিসপত্র নিয়ে ব্যবসার শুরু খারাপ হল না। প্রথমদিনেই বিক্রিবাটা ১০ হাজার টাকার আর কয়েকদিনের মধ্যেই ৪০ লক্ষ টাকা! ২০১৩ সালে মেমরি গেম Chimp Challenge নিয়ে এলেন সৌমা। University of Oxford-এর লাইসেন্সিংয়ের অন্তর্গত এই মেমরি গেমকে সে বছরই ‘Best Education Toy for the Year’ হিসাবে পুরস্কৃত করে All India Toy Manufacturers’ Association (TAITMA).


রাজভি ও সৌমা

রাজভি ও সৌমা


ইউরেকা! ইউরেকা!

ই-কমার্স ওয়েবসাইট-সহ বিভিন্ন প্রচলিত মাধ্যমে লাইসেন্সড প্রোডাক্ট বিক্রি করে থাকে Swadesh Essfil. বছরে লাভের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি টাকা। এই বাজারে কিছুটা সময় কাটিয়ে রাজভি-সৌমা লক্ষ্য করেছেন, বিশ্বজুড়ে এই ধরনের বহু ব্র্যান্ড থাকলেও অল্প সংখ্যক মানুষই তা নিয়ে কিছু করার চেষ্টা করেন। ব্যাপারটা নিয়ে নাড়াঘাঁটা করে একটা আইডিয়াও বার করলেন তাঁরা। কাস্টমাররাই যদি লাইসেন্সিং আর্টের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের জিনিস বানাতে পারে তবে কেমন হয়। এই ভাবনা থেকেই চলতি বছরের পয়লা অগাস্ট তাঁরা শুরু করলেন Gingercrush. এটা এমন এক প্ল্যাটফর্ম যা একান্তই গ্রাহকদের জন্য। প্রথমে তাদের একটা প্রোডাক্ট ঠিক করতে হবে, তারপর নিজেদের রুচি-পছন্দকে কাজে লাগিয়ে বাছতে হবে কোনও একটা ডিজাইন। ব্যাস, কাজ শেষ। এবার অর্ডার দিলেই হবে।

Gingercrush স্পেশাল কেন?

বর্তমানে জিঞ্জারক্রাশের ডিজাইন লাইব্রেরিতে রয়েছে ৮৫টিরও বেশি লাইসেন্সড ব্র্যান্ডস। সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ২৮ জন আর্টিস্ট। এদের মধ্য থেকেই পছন্দের ডিজাইন ও শিল্পী বেছে নিতে পারবেন কোনও একজন গ্রাহক। লাইসেন্সড ব্র্যান্ডসের বিশাল তালিকায় রয়েছে Disney, Pixar Movies, Marvel, Lucas Films, Hit Entertainment, Mattel, Fisher Price, Peanuts, Shaun the Sheep, Nickleodeon, Dora, Fido Dido ইত্যাদি। হ্যাঁ, হারিয়ে যাওয়া সেই জনপ্রিয় Fido Dido কার্টুন। তাও ফিরিয়ে এনেছেন রাজভিরা। তারা যে সফ্‌টওয়্যার ব্যবহার করেন তা মাত্র ৯ মিনিটের মধ্যেই প্রায় ২৮ হাজার প্রোডাক্ট তৈরি করতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মিলবে টি শার্ট, মাগ, কোস্টার, মোবাইল কভারের মতো জিনিস। খুব শিগগিরই সেই তালিকায় যুক্ত হবে জলের বোতাল, পোস্টার, গ্লাস ইত্যাদি। গ্রাহক চাইলে নিজের তৈরি ডিজাইন এইসব জিনিসে প্রিন্ট করিয়ে নিতে পারবেন।

বাজারে ব্যাপক সাড়া

প্রজেক্ট শুরু হওয়ার আগেই বাজার থেকে ১০ লাখ মার্কিন ডলার তুলে নিতে পেরেছিল জিঞ্জারক্রাশ। আর এখন তো দশদিনে লক্ষ-লক্ষ টাকার ব্যবসা হচ্ছে। রাজভির কথায়, বিক্রির বেশিটা হচ্ছে টি শার্ট, মাগ, কোস্টার থেকেই। ডিজাইনের ক্ষেত্রে চাহিদা বেশি Star Wars, Be Creative, Fido Dido-র।

বিশ্ব জুড়ে বিশাল বাজার

LIMA-র রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্লোবাল লাইসেন্সিং-ব্র্যান্ডিং ইন্ডাস্ট্রিতে ২০১৪ সালে রিটেল সেলসে রয়্যালটি রেভিনিউ ১৩৪০ কোটি মার্কিন ডলার। আর ব্যবসার পরিমাণ ২৪১৫ কোটি মার্কিন ডলার। যে ব্যবসায় জিনিসপত্রে ব্যবহৃত হয় বিশেষ কোনও ট্রেডমার্ক, কার্টুন ক্যারেক্টার, কর্পোরেট লোগো কিংবা ব্র্যান্ড। ভারতে লাইসেন্সিং ইন্ডাস্ট্রিতে চারটি বড় নামের মধ্যে রয়েছে Printvenue, Zoomin, VistaPrint ও Voxpop. রকেট ইন্টারনেট প্রবর্তিত Printvenue প্রতিদিন হাজারখানেক অর্ডার পেয়ে থাকে। জানা গিয়েছে গতবছর সংস্থার লাভের অঙ্ক ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা। ১৩ লক্ষ ইউজার সমৃদ্ধ Zoomin-এর রাজস্বের পরিমাণ ৩৮ কোটি টাকা। VistaPrint-এর নাম রয়েছে NASDAQ-listed company হিসাবে। ভারতীয় সংস্থা PrintBell-কে অধিগ্রহণ করে ভারতে পা রেখেছে VistaPrint. ২০১৪ সালে ভারতীয় সংস্থাটি ১১.৫ কোটি টাকা লাভ করেছে বলে জানা গিয়েছে। একটি সূত্র অনুযায়ী প্রতি মাসে ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা রোজগার করে থাকে Voxpop.

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags