সংস্করণ
Bangla

শৈলজার সঙ্গে চলো, লেটস গো

7th Oct 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

ঘরের কোনের রুকস্যাকটা মাঝে মাঝেই লোভ দেখায়। পাহাড়,নদী,সমুদ্র,জঙ্গল আরও কত অজানা পথের কথা মনের কোণে উঁকি মারে। কিন্তু সময়, সুযোগ, পরিস্থিতি সব দেখে তবে তো বেরনো চাই। নইলে পথে ঘাটে ঘাপটি মেরে থাকা বিপদ আপদেরা কবে ঘাড়ে এসে পড়ে আগে থেকে জানা যায় না। এই সব সাত পাঁচ ভেবে রুকস্যাক কাঁধে বেরিয়ে পড়া চাট্টেখানি কথা নয়। কিন্তু যদি বলি অত সাতপাঁচ ভাবার দায়িত্ব আপনার নয়, শুধু জানুন কোথায় যাবেন। তারপর? চলোলেটসগো!

image


‘একা চাকরিজীবী মহিলা, রিটায়ার্ড লাইফ অথচ জীবনসঙ্গীকে হারিয়েছেন অথবা যাদের জীবনসঙ্গী ভীষণ ব্যস্ত বা ঘোরাঘুরি খুব একটা পছন্দ করেন না-হতাশ হবেন না। আমরা আপনাকে এমন দৃশ্যনীয় জায়গায় নিয়ে যাব, যেখানে প্রতিটা মুহূর্ত আপনি উপভোগ করবেন’। এটাই চলোলেটসগো-এর উদ্দেশ্য। চলোলেটসগো হল একটি ভ্রমণ স্টার্টআপ, যার অনেক বৈচিত্র রয়েছে। পাঁচ বছর আগে এক হিমাচল কন্যা শৈলজা সুদ দাশগুপ্ত এই ভ্রমণ সংস্থা শুরু করেন। চলোলেটসগোর একটা পরিষ্কার উদ্দেশ্য রয়েছে। ‘জীবনের মতো এতবড় একটা ইভেন্ট যাতে শেষ বিন্দু পর্যন্ত সবাই উপভোগ করতে পরেন, মনে রাখার মতো মুহূর্ত তৈরি করতে পারেন এবং খুশি ছড়িয়ে দিতে পারেন, তাতে সাহায্যের হাত বাড়াই আমরা’, বলেন শৈলজা।

হিমাচল প্রদেশের বাসিন্দা শৈলজাকে উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লি আসতে হয়। বিয়ে এক দিল্লিবাসীর সঙ্গেই। ফলে দিল্লিতেই থেকে যাওয়া। ট্রাভেল সংস্থা গড়ার আগে শৈলজার সফল কর্পোরেট ক্যারিয়ার ছিল। কাজ করছেন গুগুল এবং ম্যাককিনসের এইচআর ট্রেনিং সেক্টরে। ‘৭ বছর কর্পোরেট সেক্টরে দাপিয়ে বেড়িয়েছি। কিন্তু জানতাম আজ হোক বা কাল আমার আমার যত আবেগ বেড়ানো, লেখালেখি এবং ফটোগ্রাফি নিয়ে, এইসবের কাছে ফিরতেই হবে’, বলেন শৈলজা। তখনও গুগুলে কাজ করতেন। সেই সময় এক সপ্তাহের এক ট্যুরে পরীক্ষামূলকভাবে নিজের স্টার্টআপ শুরু করেন। নামেই বোঝা যায়, তাঁর সঙ্গে ট্রিপে কাউকে আগে থেকে বিরাট কোনও প্ল্যান করতে হবে না। জায়গাটা ঠিক হয়ে গেলেই শুধু ব্যাগ গুছিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া। ‘১০ থেকে ১২ জনকে বেছে নিয়ে একটা দলে রাখি। বাছার ক্ষেত্রে নজর থাকে প্রত্যেকের পছন্দ কোথাও না কোথাও মিল থাকে। এবং তারপর বেরিয়ে পড়া’, বলেন শৈলজা।

যেভাবে পরিচালনা করা হয়, সেটাও একটু আলাদা। এক একটা দল দিল্লি অর্থাৎ পর্যটকরা যেখানকার বাসিন্দা সেখান থেকে ৫০০-৬০০ কিলোমিটার ব্যাসে আজানার উদ্দেশে সবাইমিলে হৈ হৈ করে চলে যান। একই সঙ্গে যেখানে থাকেন সেখানকার স্থানীয় পর্যটনের প্রচারও করেন। ‘স্থানীয়দের সঙ্গে আমাদের কথা বলা থাকে। তাদের বাড়িতেই আমারা সঙ্গে করে যাদের নিয়ে যাই তাদের থাকার ব্যবস্থা করি। যাতে কাছ থেকে সেখানকার মানুষের শিল্প-সংস্কৃতি এবং কুঠির শিল্পের ছোঁয়া পাওয়া যায়। এইভাবে নানা জায়গায় আমাদের থাকাটা যেমন স্মরনীয় হয়ে থাকে, তেমনি স্থানীয় শিল্পীদের আর্থিক উন্নতিও হয়’, বলেন শৈলজা।

image


যে কাজটা করবেন ঠিক করেছেন সেটা নিয়ে এক বছর শুধু রিসার্চ করেন শৈলজা। পুরওদমে কাজ শুরু করেন ২০১০ সালে। প্রথম দিকে পরিস্থিতি বেশ কঠিন ছিল। সবাইকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া যেই উদ্দেশ্যে সেটা বোঝানো সহজ ছিল না। ফলে সাড়াও পাচ্ছিলেন না সেভাবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থা বদলাতে শুরু করল। তাছাড়া যেসব জায়গায় তিনি যাবেন বলে ঠিক করেন, তা অন্যদের থেকে একেবারে আলাদা। এই সুবিধাটাই তাঁর পক্ষে যায়। বেড়াতে বেরোলে সাধারনত, সবাই গিয়ে গিয়ে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে তেমন জায়গাতেই যান। ফলে ছোট্ট ছোট্ট সুন্দর অনেক জায়গা অলক্ষ্যে থেকে যায়। ‘আমার ট্রিপগুলি হয় মূলত হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাঞ্চল এমনকী রাজস্থানের পুষ্করের আশেপাশে ছোট কোনও গ্রামে’, জানান চলোলেটসগো-র কর্নধার শৈলজা। সবাইকে নিয়ে যাত্রার আগে আরও একটা কাজ করেন শৈলজা। একা একা নিজেই ঘুরে দেখে আসেন কোনও জায়গা, সেখানকার স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন, তারপর টিম নিয়ে যান। বলার প্রয়োজন পড়ে না, একা একা ঘোরার মধ্যে চালিকাশক্তি খুঁজে পান এবং যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয় সেটাই টিমের সঙ্গে শেয়ার করেন।

বেড়াতে গিয়ে কত রকম অভিজ্ঞতা হয়তারও কিছু কিছু শোনালেন শৈলজা। ‘সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২,০৭৩ ফুট ওপরে টুংনাথের এক বিকেল। মন্দিরের যখন ঘণ্টা শুনি তখন গোটা এলাকা ঘন কুয়াশায় ঢাকা। ঘণ্টার আওয়াজ যত জোরালো হচ্ছে, কুয়াশাও আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছিল, দৃশ্যমানতা বাড়ছিল। মেঘের আড়াল থেকে নীল আকাশ উঁকি দিচ্ছিল। একটু পরে সূর্য ডুববে। আকাশে অদ্ভুত কমলা রঙের খেলা আর নীচে সীমাহীন বিস্তার। জানি না ইশ্বর আছেন কি না, নাকি শুধুই মানুষের বিশ্বাস। কিন্তু ওই অদ্ভুত যাদুমাখা দৃশ্য, আমার মধ্যে সেই অসীম শক্তির ইশ্বর, যিনি এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করছেন, তাঁর প্রতি বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল। মন্দিরের ঘণ্টা থামতেই ক্রমশ অন্ধকার গ্রাস করে নিল পুরও উপত্যাকা। রাজু, সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। তার কাছ থেকে অনেক গল্প শুনেছি। কেডেমাথে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেখান থেকে বেঁচে ফিরেছিল রাজু। ওই দুর্ঘটনার প্রিয়জনকে হারিয়েছে সে। আমাদের মতো একঘর আগন্তুককে সানন্দে সেই গল্প শুনিয়েছিল রাজু। বুঝলাম জীবনকে সম্ভ্রম করতে প্রকৃতিই তাকে শিখিয়েছে’, পাহাড়ের চূড়ায় শিবমন্দিরের সেই গল্প মনে করে বলছিলেন শৈলজা।

শৈলজার এবারের লক্ষ্য শিশুদের জন্য কিছু করা। নানা ভ্রমণে শৈলজার যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, প্রকৃতি ভালোবাসে এমন শিশুদের মধ্যে সেটা ছড়িয়ে দিতে চান। অনেক ট্রিপ করে, অনেকের সঙ্গে ঘুরে শৈলজার ভালো নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে এমন লোকও আছেন যারা উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজকে কিছু দিতে চান। তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে শৈলজার ইচ্ছে, স্কুলের বাচ্চাদের জন্য শিক্ষামূলক কিছু করা। ‘বাচ্চারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। এখনই যদি তাদের জন্য ঠিকঠাক কিছু করা যায়,পরে তার সুবিধা পাওয়া যাবেই’, বলেন শৈলজা। সেই সঙ্গে যোগ করেন, তাঁর ইচ্ছে আছে শিশুদের জন্য প্রকৃতিতে ঘেরা একটা জায়গা তৈরি করার। সেখানে গাইডরা থাকবেন শিশুদের খুঁটিনাটি সব কিছু বুঝে নিতে সাহায্য করবেন। আর এভাবেই প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হবে ভবিষ্যৎ প্রজেন্মের।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags