সংস্করণ
Bangla

স্কুলছুটদের স্কুলে ফেরাতে তিনকন্যার 'ঊর্জয়তি'

sananda dasgupta
25th Nov 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

কয়েক আগে মাস পারিবারিক এক দুর্ঘটনার পর মানসিক ভারসাম্য হারান নেহার মা। নেহা একটা ছোট্ট মেয়ে। বয়স ১১। বাড়ি মুম্বইয়ের এক ঘিঞ্জি বস্তিতে। দিদিমার হাজার দুয়েক টাকার মাস মাইনে পান। তাতে কোনও মতে চলে ৬ জনের পরিবার। নেহার স্কুলে যেতে আর সব ছেড়ে দিলেও বাসের পাস কাটতেই লাগে মাসে ১৬০ টাকা। এখন যা হাল সেই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই দিদিমার। ফলে এক মাসের ওপর স্কুল যেতে পারেনি নেহা।

image


একই কারণে গত ১৩ মাস স্কুলে যাচ্ছে না আট বছরের সুহাসিনী। বাবা আয়ের প্রায় পুরোটাই উড়িয়ে দেয় নেশা করে। কাগজ কুঁড়িয়ে সংসার চালান সুহাসিনীর মা। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। এর মধ্যেও কোনেওক্রমে স্কুলের একশ টাকা বেতন যোগাড় করে মেয়েকে স্কুলে পাঠাতেন মা। মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হোক তা কখনোই চাননি। কিন্তু এভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছিল না, তাই সেই স্কুল ছাড়িয়ে একটি সরকারি স্কুলে ভর্তি করেন মেয়েকে। এরই মধ্যে কাগজ কুঁড়োনোর সময় বিষক্রিয়ায় হাতে সংক্রমণ হওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়, চিকিৎসার খরচের বোঝা চাপে পরিবারের মাথায়, মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় বাস ভাড়া ১৬০ টাকা দেওয়ার আর প্রশ্নই নেই, বন্ধ হয়ে যায় সুহাসিনীর পড়াশোনা।

গান্ধী ফেলোশিপের সুবাদে মুম্বইয়ের বিভিন্ন বস্তিতে কাজ করতে গিয়ে এমনই সব বাস্তবের মুখোমুখি হচ্ছিলেন শ্রেষ্ঠা, অদিতি ও হর্ষা। সামান্য কিছু টাকার অভাবে স্কুলছুটের সংখ্যাটা চোখের সামনেই বাড়ছিল প্রতিদিন। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার, বাক্যটি যেন একটি প্রহসন মনে হচ্ছিল, কিছু একটা করা দরকার এই ভাবনাটা ক্রমেই প্রবল হচ্ছিল। সমাজের একটা অংশতো এই পরিমাণ টাকা একটা চকোলেট কিনতে খরচ করে ফেলে, এই ঘটনাগুলি যদি তাঁদের কাছে তুলে ধরা হয়, তাহলে কী এগিয়ে আসবেন না?

নিজেদের ফেলোশিপ শেষ হওয়া পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে চাননি তাঁরা, শুরু করেছেন প্রজেক্ট ঊর্জয়তি। স্কুলছুট্ ছাত্রদের জন্য অনুদান সংগ্রহ করে তাদের স্কুলে পাঠানো ও মেন্টরিং এই দুটি পদ্ধতিতে কাজ করে ঊর্জয়তি।

“প্রথমেই যেটা দরকার ছিল তা হল একটা মডেল তৈরি করা, নিজেদের পরিকল্পনাটা বাস্তবের মাটিতে এনে কাজটা শুরু করে দেওয়া, তাই প্রজেক্ট আকারেই শুরু করেছি আমরা, তবে অদূর ভবিষ্যতেই এটিকে একটি সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলব”, বললেন শ্রেষ্ঠা।

কলকাতার মেয়ে শ্রেষ্ঠার পড়াশোনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে, তৃণমূলস্তরে কাজ করার ইচ্ছে থেকেই ২০১৪ সালে যোগ দেন গান্ধী ফেলোশিপে, পাড়ি দেন মুম্বই। এর আগে টেক্সাসের এক গবেষণাকারীর সহকারী হিসেবে সাধারণ মানুষের মধ্যে গিয়ে কাজ করা বা স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে জাপানে গিয়ে সেখানকার সার্ভিস সেক্টরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল শ্রেষ্ঠার। মুম্বই গিয়ে বস্তিবাসী ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের পর শিক্ষায় সাহায্যের জন্য শুরু করেন এডুকেশন ল্যাব, অভিজ্ঞান।

শ্রেষ্ঠার সঙ্গে মুম্বইতেই গান্ধী ফেলো হিসেবে যোগ দেন কলকাতার আরেক মেয়ে অদিতি, সিমবায়োসিস ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্নাতক অদিতি কাজ করেছেন কেপিএমজি, আর্নস্ট এন্ড ইয়াংয়ের মতো সংস্থায়। নয়াঙ্গ বিজনেস স্কুলে একটি এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে সিঙ্গাপুর গিয়ে কাজ করেন মানসিকভাবে অসুস্থ শিশুদের সঙ্গে। তখন থেকেই সামাজিক ক্ষেত্রে কাজ করার ইচ্ছেটা বাসা বাঁধছিল। বছর তিনেক কাজ করেই কর্পোরেট দুনিয়াকে বিদায় জানিয়ে চলে আসেন গান্ধী ফেলোশিপে যোগ দিতে।

শ্রেষ্ঠা ও অদিতির আরেক সঙ্গী হর্ষার পড়াশোনা সিমবায়োসিস সেন্টার ফর ম্যানেজমেন্ট স্টাডিসে, অদিতির মতোই কর্পোরেট সেক্টরে বছর তিনেক কাটিয়ে গান্ধী ফেলোশিপে যোগ দেন হর্ষা। কলেজে পড়ার সময় থেকেই প্রান্তিক অংশের শিশুদের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি।

ফেলাশিপের কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই একটি সংস্থার হয়ে মুম্বইয়ের ৩২ টি মিউনিসিপ্যাল স্কুল ও তত্সংলগ্ন বস্তিতে কাজ করতে যেতেন শ্রেষ্ঠারা। প্রত্যেকেই একমাস করে কাটিয়েছেন বিভিন্ন বস্তিতে, এই সব শিশুদের অভিভাবকরা যে শ্রমের কাজে যুক্ত সেই কাজও করেছেন একমাস, কাছ থেকে দেখেছেন তাঁদের সমস্যা, উপলব্ধি করেছেন সমস্যার গভীরতা।

সেই বোঝাপড়া ও কিছু একটা করার তাগিদ থেকেই শুরু ঊর্জয়তির। প্রাথমিকভাবে মুম্বই ও থানের বস্তি অঞ্চলকেই কাজের জন্য বেছে নিয়েছে ঊর্জয়তি। ছাত্রছাত্রী, পরিবার ও স্কুলে গিয়ে কথা বলে তাদের প্রয়োজনটা জেনে নেওয়া হয় প্রথমেই, বেছে নেওয়া হয় সেই সব ছাত্রছাত্রীকে যারা টাকার অভাবে স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, জানা হয় বাত্সরিক কত টাকা তাদের প্রয়োজন। প্রতিটি ছাত্র বা ছাত্রীর, প্রয়োজনীয় টাকা ও পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ তুলে দেওয়া হয় নিজেদের ওয়েবসাইটে। কোনো ইচ্ছুক ব্যক্তি সেই বিবরণ পড়ে তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী যেকোনও শিশুর জন্য অনুদান দিতে পারেন। অনুদান সংগ্রহের জন্য তিনটি পথ বেছে নিয়েছেন শ্রেষ্ঠারা। মিলাপের মতো সংস্থার মাধ্যমে ক্রাউড ফান্ডিং, ব্যক্তিগত অনুদান ও পুরোনো জিনিস পত্র বিক্রি। শ্রেষ্ঠারা তিনজন ও স্বেচ্ছাসেবকরা মিলে কোনো একটি আবাসন বা পাড়ায় যান, সংগ্রহ করা হয় পুরোনো ফেলে দেওয়া খবরের কাগজ, বোতোল, লোহালক্কর ইত্যাদি, সেইগুলি বিক্রি করে পাওয়া টাকা কাজে লাগানো হয় ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার জন্য, আগে থেকেই প্যামফ্লেটের মাধ্যমে এলাকার মানুষদের জানিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের এই পরিকল্পনার কথা।

image


“অসম্ভব ভালো সাড়া পেয়েছি আমরা, শুরু করার সময় ভাবতেই পারিনি এত মানুষ এগিয়ে আসবেন। কত মানুষ যে টাকা দিয়ে সাহায্য করছেন! আসলে মানুষ কিন্তু অন্য মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়, কিন্তু যোগাযোগটা ঠিক মতো হয়ে ওঠে না, আমরা সেই যোগাযোগ স্থাপনের কাজটুকুই করছি”, বললেন শ্রেষ্ঠা।

শিশুদের প্রয়োজনীয় টাকা সংগ্রহের পাশাপাশি তাদের মেন্টরিংয়েরও ব্যবস্থা করে ঊর্জয়তি। “আমরা আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, টাকা পেলেও ঠিকভাবে পড়া চালিয়ে যেতে পারে না বহু শিশুই, এতোটাই অভাব এই সব পরিবারে যে অনেক সময়ই সেই টাকা অন্য খাতে খরচ করে ফেলেন তাঁরা। এছাড়াও বিভিন্ন কারণে অনেক সময়ই স্কুলে যাওয়ার উত্সাহ হারায় শিশু, কিশোররা, সমস্যাও হয় নানারকম। আমাদের তো বাড়িতে বাবা মা ও অন্যান্যরা এই বিষয়গুলি দেখে, কিন্তু ওদের সেই সাহায্যটা প্রয়োজন, সেই জন্যই আমরা মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা করেছি” জানালেন শ্রেষ্ঠা। প্রতিটি ছাত্র বা ছাত্রীর জন্য একজন করে মেন্টর ঠিক করা হয়. তিনি সেই ছাত্র বা ছাত্রীর পড়াশোনা ঠিক মতো হচ্ছে কি না সেইদিকে নজর রাখেন, তার সমস্যাগুলিতে সাহায্য করেন। মাসে অন্তত দু’বার মেন্টর তাঁর ছাত্র বা ছাত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই মেন্টর হওয়ার আবেদন জানানো যায় এবং এটি পুরোটাই স্বেচ্ছা শ্রম। এর জন্য কোনো বেতন পান না মেন্টররা।

শ্রেষ্ঠা জানালেন “নানা পেশায় যুক্ত মানুষ মেন্টর হওয়ার জন্য এগিয়ে আসছেন, এটি বর্তমানে যেহেতু শুধু মাত্র একটি প্রজেক্ট ফলে অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেটও দিতে পারিনা আমরা, কিন্তু মানুষ শুধুমাত্র কিছু করার তাগিদ থেকেই এগিয়ে আসছেন। মাসে অন্তত দু’বার দেখা করাটা আমাদের নিয়ম কিন্তু বেশিরভাগ মেন্টররাই তার থেকে অনেক বেশি বারই দেখা করেন শিশুদের সঙ্গে, যোগাযোগ রাখেন নিয়মিত”।

ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া ও ওয়ার্ড অফ মাউথের মাধ্যমেই আপাতত অনুদান ও মেন্টর সংগ্রহের কাজ করছে ঊর্জয়তি।

আগামী দিনের পরিকল্পনা বলতে প্রথমেই এটিকে একটি সম্পূর্ণ সংস্থা হিসেবে রূপ দেওয়া।

“মডেলটা তৈরি করাটা খুব জরুরি ছিল, দুমাস হল আমরা এই উদ্যোগটি শুরু করেছি, ইতিমধ্যেই ১০ জন স্কুলছুট্ শিশুকে আমরা স্কুলে ফিরিয়ে এনেছি। প্রত্যেকের জন্য মেন্টরও ঠিক হয়েছে, সাধারণত প্রতিটি শিশুর জন্য একজন করে মেন্টর ঠিক করা হয়, তবে একই পরিবারের হলে অনেক সময় ভাই বোনের জন্য একজন মেন্টরকেই বেছে নেওয়া হয়। মডেলটি খুবই সফল ভাবে কাজ করছে, তাই আইনি পদক্ষেপগুলি নিয়ে এটিকে সংস্থাপ রূপ দেব আমরা, সেই প্রস্তুতিই চলছে”, বললেন শ্রেষ্ঠা।

image


পুরোনো জিনিসপত্র বিক্রি বা রদ্দি সেলের বিষয়টিকেও আরও বড় ভাবে করতে চান শ্রেষ্ঠারা। এতে দুটো কাজ হয়, এক তো এগুলি বিক্রি করে টাকা ওঠে দ্বিতীয়ত এতে মানুষ উদ্যোগটি সম্পর্কে জানতে পারেন, এই উদ্যোগের অংশ হয়ে উঠতে পারায় আত্মিকতা বাড়ে। তাঁদের মাধ্যমে আরও অনেকে জানতে পারেন। পাড়া এবং আবাসনগুলির পাশাপাশি কর্পোরেট সংস্থাগুলির সঙ্গেও কথা চালাচ্ছে ঊর্জয়তি, যাতে তারা সারা মাসের ফেলে দেওয়া পুরোনো জিনিস দেয়, “এতে একটা স্থায়ী টাকার সংস্থান হবে”, বললেন শ্রেষ্ঠা।

কলকাতা শ্রেষ্ঠার প্রাণের শহর। তাই আপাতত মুম্বইতে করলেও আগামী দিনে নিজের শহরেও এই কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে। ফেলোশিপের এটা দ্বিতীয় বছর, তাই ফেলোশিপ শেষ হলে তবেই কলকাতায় এই কাজ শুরু করতে পারবেন বলে জানালেন শ্রেষ্ঠা।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags