সংস্করণ
Bangla

ক্ষুদে হেডমাস্টার থেকে মানুষ গড়ার কারিগর বাবর

tiasa biswas
19th Oct 2015
Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share

‘কী করবে ভেবে নাও। যা ভাবলে সেটাকেই জীবন মেনে নাও। তার স্বপ্ন দেখ।তার সম্পর্কে চিন্তা কর। তাকেই আঁকড়ে বেঁচে থাক। মগজ, শরীর, পেশী, ধমণী-শরীরের প্রতিটি অংশের সঙ্গে সেই ভাবনাকে সম্পৃক্ত করে নাও। বাকী সব ছেড়ে দাও। এটাই সাফল্যের পথ। এভাবেই মহতীদের জন্ম হয়েছে’।–স্বামী বিবেকানন্দ

image


রোগা, পাতলা, শ্যামলা বরণ। বয়স খুব বেশি হলে ৯। গাঁয়ের এই ছেলের নাম বাবর আলি। বাড়ির একচিলতে উঠোনে একটা স্কুল। তার হেডমাস্টার বাবর আলি। বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী হেডমাস্টার (গ্লোবাল মিডিয়া এবং ইনস্টিটিউশনের দেওয়া পদবী)। এখন বয়স ২১। কিন্তু স্বপ্নকে তাড়া করা থামেনি বাবরের। স্বপ্ন আঁকড়েই জীবন যাপন হেডমাস্টারের। খেলার ছলে যার শুরু হয়েছিল, ধীরে ধীরে বিপ্লবে পরিণত হয়েছে। মিশন হল, দেশের সব কটা শিশুর কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া।

image


প্রায় বারো বছর একার মনের জোর আর সাহসী অভিযান। তাতেই ভর করে বছর একুশের বাবর আলি অবশেষে সেই টিনের চালার একচিলতে স্কুলের জায়গায় একটা আস্ত স্কুল বিল্ডিং পেয়েছেন। সামনে টেবিটের ওপর থেকে চা বিস্কুট গলায় ঢেলে লড়াইয়ের সেই দিনগুলির কথা মনে করেন বাবর। সংগ্রামের এই কাহিনী শুনে অবাক না হয়ে পারা যায় না। লাজুক স্বভাবের এই যুবকের পছন্দ অনাড়ম্বরতা। বেঙালুরুতে ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটে পড়ার সময় প্রাতরাশ করতেন না। কারণ, তিনি বাড়িওয়ালাকে বিরক্ত করতে চাইতেন না!এমনই স্বভাবের বাবর আলি।

image


পশ্চিমবঙ্গে মুর্শিদাবাদের ছোট্ট গ্রামে বাবর আলির বেড়ে ওঠা। বাবা পাটের কারবারি। বাবরের জীবনেও কোনও মোড় আসত না যদি বাবা পড়াশোনার জন্য ভালো স্কুলে ভর্তি না করাতেন। বাড়ির সবচেয়ে কাছের স্কুলটিও ১০ কিলোমিটার দূরে বেলডাঙায়। ২০০২ সালে ৯ বছরের বাবরকে প্রতিদিন ওই ১০ কিলোমিটার পথ উজিয়ে সিআরজিএস হাই স্কুলে যেতে হত।

image


স্কুল থেকে ফেরার পথে বাবর দেখত তার বয়েসী ছেলেমেয়েরা গরু চড়িয়ে অথবা দিনভর খেলাধূলা করেই কাটিয়ে দিত। কীভাবে স্কুল শুরু হল বলতে গিয়ে বাবরের মনে পড়ে, ‘ভাবলাম স্কুলে আমি যা পড়ছি সেটাই ওদের শেখাবো’। কয়েকটা ছেলেপিলেও জড়ো করে ফেলল। বাড়ির উঠোনে পেয়ারা গাছের তলায় শুরু হল বাবরের স্কুল। সবকটা ধূলোমাখা মাটিতেই বসে পড়ত। আর বড় বড় চোখে আবাক হয়ে শুনত বাবর স্কুলে সারাদিন কী করল, কী পড়ল এইসব। ক্রমশ স্কুলে পড়ুয়া বেড়ে হল আট।তার মধ্যে বাবরের ছোট বোন এবং সঙ্গী আরও কয়েকটা মেয়ে ছিল। না পড়ার কোনও বই, না খাতা। বাবর কোনওরকমে একটা ব্ল্যাকবোর্ড জোগাড় করেছিল। আর পড়ার জন্য খবরের কাগজ। যে স্কুলে বাবর পড়ত সেখানকার এক দিদিমনির আজও মনে পড়ে, ‘স্কুল শেষে প্রতিদিন ভাঙা চক চাইত তাঁর ছাত্র। গর্ব ভরে দিদিমনি বলেন, ভাবতাম চক নিয়ে এই ছেলে কী করবে? অবাক হয়ে যাই যখন সে একদিন বলল, বাড়িতে স্কুল শুরু করেছে। তখন থেকে এক বাক্স করে চক দিয়ে দিতাম বাবরকে’।

image


খেলার খেলার স্কুল ধীরে ধীরে বাস্তবের পথে হাঁটতে শুরু করল। স্কুল থেকে বাবরের ফেরায় অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকত পেয়ারা গাছের তলার পড়ুয়ার দল। ‘স্কুল থেকে ফিরে খাওয়ার সময় পর্যন্ত পেতাম না। পোশাক ছেড়ে শুরু করে দিতাম গাছতলার স্কুল’, বলেন বাবর। পড়ুয়াদের জন্য এবার বই দরকার। কী করা? রদ্দিওয়ালার দোকানে উঁকি মেরে সেখান থেকে বই, অর্ধেক লেখা খাতা চুরি করে নিয়ে আসত বালক বাবর। এরই মধ্যে তার স্কুলের কথা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। ‘বাবা চিন্তায় পড়ে যান। তাঁর ভয় ছিল এইসব করতে গিয়ে নিজের পড়া নষ্ট করছি আমি। স্কুল বন্ধের আদেশ এল’, বলেন বাবর। কিন্তু বাবর অনড়। শেষ পর্যন্ত নিজের পড়াশোনায় মনোযোগের প্রতিশ্রুতিতে বাবার অনুমতি মিলল। ‘খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাবার কাছে পড়তে বসতাম। তাড়াতাড়ি প্রতরাশ সেরে স্কুলে ছুটতাম আর সারাদিন অপেক্ষায় থাকতাম কখন ফিরে আসব আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে। রীতিমতো নেশার মতো ছিল’, মনে পড়ে বাবরের।

image


স্কুল শুরু করা এক জিনিস, আর স্কুটছুট যাতে না হয় সেটা ধরে রাখার সাফল্য অন্য জিনিস। প্রথম দিকে বাবর বাবার কাছ থেকে যা হাত খরচ পেত তা দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের জন্য মিষ্টি, টফি কিনে আনত। ‘গান, নাচের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতাম। ফুল দিয়ে সাজাতাম জায়গাটা। আর আমি থাকতাম বিচারক। আসলে স্কুলে আমি যা দেখতাম সেটাই এখানে করার চেষ্টা করতাম’, বলেন বাবর।

image


‘আমাদের বই দরকার। শেষ পর্যন্ত পড়ুয়াদের বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে চাল চেয়ে আনি। বাজারে সেই চাল বিক্রি করে বর্ণমালার বই কেনা হয়। আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি গ্রাম্য প্রধান বইয়ের জন্য আমার আবেদনপত্র গ্রহণ করেন এবং সেটা বিডিওকে দেন। এই কাজে আমার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও বেশ খুশি হন। আমার বাবাও স্কুলে ৬০০ টাকা দান করেন। মা সব সময় আমার পাশে ছিলেন। নিজের মতো করে আমাকে ভরসা জুগিয়ে গিয়েছেন। এই করতে করতে একদিন আমার স্কুলের উদ্বোধন হয়। ৩০ টাকা দিয়ে মাইক ভাড়া করে এনেছিলাম। কাটার জন্য ফিতে, গান, নাচ সবের আয়োজন হয়। জায়গাটা সাজানোর জন্য মায়ের শাড়ি ধার নিই। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য গ্রামের বড়দের নিমন্ত্রণ করি। অন্য একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমাদের পারিবারিক বন্ধু, তিনি স্কুলের নাম দিলেন আনন্দ শিক্ষা নিকেতন’, সেই দিনের কথা মনে পড়ে বাবরের।

image


স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম বাবরের এই স্কুলের প্রতিবেদন ছাপায়। বাবরের ছোট্ট গ্রামের বাইরেও তার স্কুলের কথা ছড়িয়ে পড়ে। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের কানেও পৌঁছায় স্কুলের খবর। ‘যখন ক্লাস এইটে পড়ি তিনি আমাকে শান্তিনিকেতনে ডেকে পাঠান। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন অর্থমন্রীন এবং বিশিষ্ট অধ্যাপকের সঙ্গে এক ঘণ্টা কথা বলি’, জানান বাবর। উৎসাহ পেয়ে বাবর আলি এবার কলাকাতার ক্ষমতার দোরগোড়ায় ঘুরতে শুরু করে। স্কুলের পোশাকেই এতবড় শহরে একা একা স্কুলের জন্য সাহায্য চেয়ে সরকারি দফতরের দোরে দোরে যায়। ‘কয়েকজন আধিকারিককে ধন্যবাদ জানাতে চাই যারা আমি ছোট জেনেও অনেক সাহায্য করেছেন। কখনও নিরাশ করেননি’, বলেন বাবর। স্কুল পরিচালন কমিটির সভাপতি হওয়ার জন্য তখনকার সাব ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্র্যাট সবুজবরণ সরকারকে অনুরোধ করে বাবর। সেই সময় সে মাত্র তেরো বছরের, ক্লাস এইটে পড়ে। ফিরোজা বেগম, অন্য একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বাবরের স্কুলের সেক্রেটারি হন। ‘আমি আইপিএস অফিসার রাহুল শ্রীবাস্তবের সঙ্গে দেখা করি। তিনি শুধু আমাকে সাহায্যই করেননি, আমাকে জেলার সবচেয়ে স্মার্ট ছেলে বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘ভালো কাপড় পরলেই স্মার্ট হওয়া যায় না। যারা জ্ঞানের আলো জ্বালায় তারাই স্মার্ট’’, গর্বে বুক ফুলে ওঠে বাবরের। ২০০৮ সালে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাস করে বাবর। পরীক্ষার আগেও আমার স্কুলের সব পড়ুয়াদের জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। ওই সময় অভিনেতা আমির খানের হাত থেকে সিএনএন-আইবিএন রিয়েল হিরো পুস্কার নেয় বাবর আলি। বিবিসি গ্রামে গিয়ে হেডমাস্টারকে নিয়ে প্রতিবেদন করে। এনডিটিভির মতো নিউজ চ্যানেলও বাবরকে সম্মান জানায়।

বাবর এখন ২১ বছরের। স্বপ্ন তাড়া করার অদম্য ইচ্ছে, সবার শুভেচ্ছা আর অল্প দান নিয়ে বাবর এখনও স্কুল চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘আরও অনেক কিছু করতে চাই। বুঝতে পারি আমার স্কুলের একটা বিল্ডিং দরকার। কিন্তু টাকা বড় সমস্যা। রিয়েল হিরো প্রাইজ থেকে যে টাকা পেয়েছিলাম সেটা দিয়ে বাড়ির কাছে একটা জমি কিনি। কিন্তু বিল্ডিং বানানোর টাকা নেই আমার’, বলেন বাবর। এরই মধ্যে অনেকের আবার ছোট্ট ছেলেটার সাফল্যের ইর্ষায় অনেকে হেনস্থা করা শুরু করল। মানুষ সরকারি চাকরি পেতে তার কাছে তদ্বির করতে শুরু করল। যা বাবরের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থাণীয় দুষ্কৃতীরা খুন করার হুমকি পর্যন্ত দেয়। এমনকী পুলিশের নিরাপত্তা ঘেরাটোপে কলেজের পরীক্ষা দিতে হয় বাবরকে। ‘মালালা ইউসুফজাই সন্ত্রাসবাদীদের বুলেটের আঘাতে বিদ্ধ হয়, আর আমি মানুষের শত্রুতা আর হেনস্থায় বিদ্ধ হই। আমার চ্যালেঞ্জ ছিল অন্যদের উৎসাহিত করা। যখনই কেউ স্কুলে আসা বন্ধ করত আমি তাদের বাড়ি গিয়ে বাবা-মাকে অনুরোধ করতাম স্কুলে পাঠানোর জন্য’। স্বামী বিবেকানন্দ বাবরের প্রেরণা। ‘আমি তাঁর লেখা আর বাণী থেকে অনুপ্রেরণা পাই। আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়’।

‘কর্নাটক যেন আমার দ্বিতীয় ঘর। সবার কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া আমার একমাত্র লক্ষ্য। আমি চাই পড়াশোনা শেষ করে এই কাজে আরও ছেলেমেয়ে এগিয়ে আসুক। কর্নাটকেও আমি একটা স্কুল খুলতে চাই। হতে পারে একদিন আইএস অফিসার হব’, বলে চলেন বাবর।

এরই মধ্যে যে আটজনকে নিয়ে বাবরের স্কুল শুরু হয়ছিল তারা এখন কলেজ পড়ুয়া। বাবরের স্কুলে তারা এখন পড়ান। বাবরের নতুন স্কুলে ৫০০ জন ছাত্রছাত্রী নাম লিখিয়েছে। ২০১৫র জানুয়ারিতে নতুন সেশন শুরু হয়েছে। পুরনো স্কুল থেকে ৩০০ জন ছাত্রছাত্রী নতুন স্কুলে এসেছে। ‘ওঠো, জাগো, যতক্ষণ লক্ষ্যে পৌঁছাবে না চলতে থাক’। উপনিষদের এই কটা লাইন বিখ্যাত করে গিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। এই লাইনগুলিই পথ দেখায় বাবরকে।

Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags