সংস্করণ
Bangla

জীবন সংগ্রামে ফার্স্টগার্ল বর্ধমানের নক্ষত্র স্বরূপা

patralekha chandra
4th Jan 2016
Add to
Shares
5
Comments
Share This
Add to
Shares
5
Comments
Share

সঙ্গী একটা হুইল চেয়ার। দু হাতে এই হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে বদলে দিয়েছেন বেঁচে থাকার সংজ্ঞাটা। আশি শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধী। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি। তাতে কি? লড়াই – লড়াই আর লড়াই। সঙ্গে অফুরন্ত প্রানশক্তি আর জেদ। সব সময় মুখে হাসি। আর তাতেই সফল বর্ধমানের নতুনপল্লীর স্বরূপা দাস। বর্তমানে বর্ধমানের রেলওয়ে বিদ্যাপীঠ স্কুলের বাংলার শিক্ষিকা। সাহিত্য জগতেও তার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় আর পাঁচ জন হাল ছেড়ে দেন সেখানে স্বরূপা নিজেকে প্রমাণ করেছেন। বুঝিয়েছেন এরই নাম বেঁচে থাকা।

image


যখন সবে ১০ মাস বয়স তখন তার স্পাইনাল কর্ড এ একটা টিউমার অপারেশন হয়। এর পর থেকেই কোমর থেকে নিম্নাঙ্গ পারালাইসিস। লড়াই শুরু। ইউরিন কন্ট্রোল নেই। সব সময় ক্যাথাডর লাগানো। প্রতিমাসে ক্যাথাডর পাল্টাতে হয়। অপারেশনের পর স্বরূপার সমস্ত নার্ভ নষ্ট হয়ে যায়। মলত্যাগ করতেও পারেন না। তিন চার মাস পর পর ডূস দিয়ে মল ত্যাগ করানো হয়। পারালাইসিসের ফলে স্বরূপার পা দুটি সোজা হয় না। সর্বক্ষণের সঙ্গী হুইল চেয়ার। তাতে বসেই সমস্ত কাজ। বেঁকে গেছে পিঠের শিরদাঁড়াও। তাই একদিকে কাত হয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। খুব কষ্ট হয়। ক্যাথাডর নিয়েই সবসময় যাতায়াত করেন। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। তবুও হাল ছাড়েননি স্বরূপা। হারতে শেখেননি। উপরন্তু অন্যদের জয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এই আশ্চর্যময়ী নারী।

স্বরূপা তার প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ২০০০ সালে মাধ্যমিকে ৬৩০ নম্বর পান। এরপর ২০০২ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে ৭৮০ পেয়ে স্টার মার্কস নিয়ে বর্ধমান জেলায় ছাত্রীদের মধ্যে প্রথম হন। এটাই শুধু নয় এর পর ২০০৫ সালে বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে অনার্স নিয়ে বি এ পাশ করে। ২০০৭ সালে বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে ভাল নম্বর নিয়ে বাংলা অনার্সসহ এম এ পাশ করে। এরপর স্কুল সার্ভিস কমিশনে পরীক্ষা দিয়ে স্বরূপা বর্ধমানে রেলওয়ে বিদ্যাপীঠ স্কুলের শিক্ষিকা পদে নিযুক্ত হয়।

এখন হুইল চেয়ারে বসেই শিক্ষকতা করেন। স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে স্বরূপা প্রিয় ম্যাডাম। পেয়েছে প্রচুর ভালবাসা। ছাত্র ছাত্রী থেকে সহকর্মী সকলের কাছেই আইডল। ইতিমধ্যেই শিক্ষকতা জগতে বেশকিছু পুরস্কারও পেয়েছেন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বেস্ট এমপ্লয়ি পুরস্কারে সম্মানিত করে স্বরূপাকে। পেয়েছেন শিক্ষারত্ন সহ আরও একাধিক পুরস্কার। জি বাংলার দাদাগিরি, মিরাক্কেল, রান্নাঘর, রূপসী বাংলার অপরাজিত প্রভৃতি রিয়ালিটি শো তে স্বরূপা অংশ নেন। শুধুমাত্র শিক্ষক হিসাবেই তিনি সফল নন। সাহিত্য জগতেও আলোড়ন ফেলেছেন। 'মনের দর্পণ' নামে তার লেখা একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও লিখেছেন ছোট গল্প, উপন্যাস।

প্রতিবন্ধকতাকে পিছনে ফেলে শুধু যে নিজের জীবনেই যে সাফল্য এনেছেন তা নয়, সমাজ সেবাতেও নজির গড়েছেন। সুযোগ পেলেই জনসেবা মূলক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্বচ্ছ ভারত অভিযানে অংশ নিয়েছেন। এখন এক গুরু দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়েদের মানসিক দৃঢ়তা বাড়িয়ে লড়াই করে এগিয়ে যেতে শেখাচ্ছেন। “ইয়ুথ বেঙ্গল ডিসেবল্ড ওয়েল ফেয়ার অর্গানাইজেশন” নামক একটি সংস্থার মাধ্যমে তিনি প্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্ন কাজ করে চলেছেন।

বাবা, মা, কাকা ও বোনকে নিয়ে ছোট পরিবার। স্বরূপার লড়াইয়ে সবসময় পাশে থেকেছে পরিবার। ডাক্তার she is lost child বলার পরও ভেঙে পড়েননি তারা। মেয়েকে সুস্থ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। স্বরূপার মনে লড়াইয়ের ক্ষিদেটা তারাই বাড়িয়ে তুলেছিলেন। তার সাথে স্বরূপার ইচ্ছা শক্তি ও অসম্ভব মনের জোরেই জীবন সংগ্রামে জয়ী হয়েছে সে। থেমে যেতে শেখেনি স্বরূপা । আরও এগিয়ে যেতে চায়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় শিরদাঁড়া বেঁকে গেলেও মনের জোরে সেই শিরদাঁড়াকে সোজা রেখে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। জীবন সংগ্রামে হেরে যাওয়া মানুষগুলোর কাছে অনুপ্রেরণা দেবে স্বরূপার এই লড়াইয়ের কাহিনী>

Add to
Shares
5
Comments
Share This
Add to
Shares
5
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags