সংস্করণ
Bangla

দুই ময়দানেই সফল রাজীব

23rd Dec 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের তালিম দেন। জমিতে কৃষকদের। দু জায়গাতেই সাবলীল। কেউ ভুল করলে রেগে যান, আবার ভাল কিিছু করলে উৎসাহ দিয়ে কাজের তাগিদ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেন। পুরুলিয়ার রীজব লোচন সোরেন এমনই। তাঁর হাতযশে পুরুলিয়ারার মানবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকার খেত এখন লালে-লাল। টম্যাটো ফলিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন ওই এলা্কার অসংখ্য কৃষক পরিবার।


image


জমিয়ে ঠান্ডা পড়ার আগেই বাজারে চলে এসেছে শীতের অসংখ্য উপহার। এই যেমন টম্যাটো। রাজ্যের চাহিদার একটা বড় অংশ মেটায় পুরুলিয়ার টম্যাটো। হুগলির আলু, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ধান, তেমন টম্যাটো উৎপাদনে রাজ্যে সবার আগে পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলা। মানবাজার, বান্দোয়ান, বড়াবাজারের মতো এলাকা থেকে প্রতিদিন ট্রাক ট্রাক টম্যাটো পাড়ি দেয় কলকাতা, বর্ধমান বা মেদিনীপুরে। কার্যত সেচহীন এই জেলায় এখন শীতের ফসল তোলার ব্যস্ততা। পুরুলিয়ায় সব থেকে বেশি টম্যাটোর ফলন হয় মানবাজার ২ নম্বর ব্লকে। এই ব্লকের বসন্তপুর ‘টম্যাটোর গ্রাম’ বলেই পরিচিত। জেলার টম্যাটো চাষের মানচিত্রে এই গ্রামের জায়গা করে নেওয়ার নেপথ্যে রয়েছেন এক শিক্ষক। যিনি স্কুলে পড়ান, আবার জমিতেও স্বচ্ছন্দ। রাজীব লোচন সোরেনের পরামর্শে মাস তিনেক খেটে হাজার হাজার টাকা রোজগার করেন গ্রামের কৃষকরা। রুক্ষ্মতার শিকার হলেও, প্রকৃতিকে বাগে এনে কীভাব টম্যাটো চাষ করে উপার্জন করা যায় তার পথ দেখিয়েছেন রাজীববাবু। শুরুটা কেমন ছিল? রাজীববাবুর কথায়, ‘‘আমি কৃষিজীবী পরিবারের সন্তান। বাবাও শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু জমির প্রতি টান আমার ছোটবেলা থেকেই।’’ ছেলেবেলায় দেখেছিলেন ধান চাষ করলে অনেক ঝুঁকি থাকে। জলের অভাব তো রয়েইছে পাশাপাশি বিক্রির সময় থাকে নানা সমস্যা। কৈশোরের মুহূর্তে বাবা খুন হওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে আসে। পারিপার্শ্বিক চাপ এলেও স্বপ্নটা কিন্তু ফিকে হয়নি তাঁর। বাইশ বছর বয়সে হাইস্কুলে চাকরি পেয়ে গেলেও মাটির টান এড়াতে পারেননি রাজীববাবু। ধীরে ধীরে স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পেলেও খেতই তাঁর কাছে সব।


image


বিশ্বকর্মা পুজোর পর থেকে জমি তৈরি করে টম্যাটো বীজ বসানো হয়। বার তিনেক জল আর দফায় দফায় জৈব, রাসয়নিক সার ও কীটনাশক দিতে হয়। তাতেই ফল ধরে যায় গাছে। শীত পড়তেই পড়তেই টম্যাটো তোলার ব্যস্ততা দেখা যায় বসন্তপুর গ্রামে। কোন সময়ে সার দিতে হবে, কতটা ভিটামিন প্রয়োজন, কিংবা কখন ফসল তুললে ভাল দাম পাওয়া ‌যাবে তা এলাকার চাষিদের শিখিয়েছেন রাজীববাবু। তাই সুধীর মুর্মু, ধনঞ্জয় মুর্মু, রাধানাথ হাঁসদা বা মহেশ্বর সোরেনের মতো কৃষকরা এখন চাষ নিয়ে বেশ ওয়াকিবহাল। তারা বুঝতে পেরেছেন মাস্টারমশাই যখন সফল হয়েছেন তারাও করতে পারেন। রাধনাথ হাঁসদার কথায়, ‘‘নতুন ধরনের চাষে অনেক ঝুঁকি আছে। সেই ঝুঁকি নিয়েও যে নিজের পায়ে দাঁড়ানো যায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন রাজীববাবু।’’ মহেশ্বর সোরেনের বক্তব্য, ‘‘টম্যাটো চাষ করেই সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে। নতুন কিছু সফল হওয়ার জন্য বাড়তি তৃপ্তিতো আসেই। তাতে সংসারের সুরাহা হয়েছে। নিজের ম‌র্যাদাও বেড়েছে।’’ নভেম্বর মাস পড়তেই ঝাড়খণ্ড, কলকাতা, বর্ধমান, মেদিনীপুর থেকে ব্যবসায়ীরা ট্রাক নিয়ে চলে আসেন চাষিদের কাতছে। বিঘে পিছু চাষ করতে হাজার পাঁচেক টাকা খরচ হলেও বিক্রি করে বারো থেকে পনেরো হাজার টাকা পান কৃষকরা।

বান্দোয়ানের চিরুডি বিবেকানন্দ হাইস্কুলে পড়ুয়াদের কর্মশিক্ষার তালিম দেওয়া, আবার গ্রামের কৃষকদের টম্যাটো চাষের পাঠ। শুধুমাত্র একটা কাজ বেছে নেননি কেন? প্রশ্ন শুনে হাসেন মাস্টারমশাই। তাঁর বিনয়ী উত্তর, ‘‘দুটোই আমার পছন্দের জায়গা। তিন মাস লেগে থাকার পর যখন জমিতে ফসল ফলে তখন যে তৃপ্তি হয়, তেমনই খুশি হয় ছাত্রছাত্রীদের ভাল হাতের কাজ দেখলে।’’ স্কুলে থাকলে যেমন ওটাই ধ্যানজ্ঞান, তেমন ফিরে এসে আবার চেনা ভুবনে থাকতে ভালবাসেন বছর চল্লিশের মানুষটি। কলকাতা থেকে আসা এক ব্যবসায়ীকে টম্যাটো দিতে দিতে মাস্টারমশাই বলেন এবার ফলন ভালই হয়েছে। তবে চাষ অসংগঠিতভাবে না হওয়ায় ঠিকমতো দাম পাই না। মানবাজারে কিষান মান্ডি হচ্ছে। মান্ডি হয়ে গেলে ফড়েদের দাপট কমবে, আমরা আরও দাম পাব। সেই স্বপ্ন সফল করতে সহযোদ্ধাদের নিয়ে এগিয়ে চলেছেন মাস্টারমশাই।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags