সংস্করণ
Bangla

মৃত্যু উপত্যকার শাহেনশা পেমবা শেরপা

tiasa biswas
11th Sep 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। পর্বত অভিযানের ইতিহাসে সবচেয়ে দুঃখজনক অথচ সাফল্য এবং বীরত্বের ইতিহাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল ওই কটা ঘণ্টায়। ২০০৮ এর ১ আগস্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮০০০ মিটার ওপরে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কে২(K2)। সূর্যের রশ্মি বরফের গায়ে লেগে পিছলে যাচ্ছিল। যারা বেঁচে ফিরেছিলেন তাঁরা বলেন, সামিটের জন্য একদম উপযুক্ত দিন ছিল।

পেমবা গ্যালজে শেরপা (ছবি  সৌজন্যে পেমবা)

পেমবা গ্যালজে শেরপা (ছবি সৌজন্যে পেমবা)


সারা বিশ্বের নানা প্রান্তের ১৮ জন পর্বতারোহীর সামিট সফল হওয়ার আনন্দ নিমিষে মুছে গেল। ৮০০০ মিটার ওপরে সামিট থেকে নামার সময় বিশ্বের সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল জায়গায় অসহায় আত্মসমর্পণ আরোহীদের। ডেথ জোন (যেখানে মানুষের শরীর টিকে থাকতে পারে না)এর গভীর খাদ তখন পার হওয়া বাকি। রাতের অন্ধকার নেমে আসছিল। ঠিক তখন ঘটে গেল দুর্ঘটনা। সবচেয়ে বিপদসঙ্কুল সরু ঘোরালো জায়গাটা পেরোনর জন্য দড়ি ফেলা হয়েছিল, যাকে বলা হয় পর্বতারোহীদের লাইফলাইন, তুষার ধসে সব মুছে গেল। সঙ্গে নিয়ে গেল নরওয়ের আরোহী রলফ বি-কেও। ১৮জনের মধ্যে নামতে গিয়ে ১১ জনই মারা যান।

‘প্রায় এক দশক হতে চলল, এখনও পর্বতারোহীদের মধ্যে ২০০৮ এর কে টু ট্র্যাজেডি দগদগে ঘা হয়ে আছে। সামিটে পৌঁছানোর জন্য একেবারে ঠিক পরিস্থিতি, এমন দিনে কীভাবে ওই ঘটনা ঘটেছিল, এখনও তার ধোঁয়াশা কাটেনি। পর্বতের চূড়ায় অনেকে জীবন দিয়েছেন। অনেকে অদ্ভুতভাবে বেঁচে ফিরেছেন-তাদেরই একজন পেমবা গ্যালজে শেরপা’।

পাংখমো, ৩০০০ মিটার উঁচুতে ছোট্ট একটা গ্রাম। পূর্ব নেপালে এভারেস্ট থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে ওই গ্রামে জন্ম পেমবার। ‘পর্বতে ওঠা যখন শুরু করি তখন আমার বয়স ১৬। ট্রেক করতাম, আশেপাশের পর্বতে চড়তাম’,জানান পেমবা। ট্রেকিং, পর্বতারোহণ ছাড়াও বাড়িতে চাষের কাজেও হাত লাগাতেন। সাদাসিধে চাষির জীবন ছিল, বলেন পেমবা। বাবার সঙ্গে ট্রেকিংয়ে যাওয়া শুরু। ভালো লেগে গেল। পর্বতারোহী এবং পর্বতারোহীদের গাইড হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের দিকে ধাপে ধাপে এগোতে লাগলেন। নেপালের আশেপাশে ছোট ছোট পাহাড়গুলিতে চড়ে চড়ে চসতে থাকল প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি Chamonix France এ পর্বত আরোহণের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানলেন। ৭ বার এভারেস্টে ওঠেন পেমবা। অন্যান্য সামিটের মধ্যে অক্সিজেন সঙ্গে না নিয়ে কে-টু(K2), চো ওয়া, আমা ডাবলাম এবং ‘৬০০০ মিটারের বেশ কয়েকটি শৃঙ্ঘ, যেগুলি আর গুনিনি’, বলেন পেমবা।

টাইগার অব দ্য ডেথ জোন, পর্বতারোহী বা মিডিয়া এই নামেই চেনে পেমবাকে। গত ২০ বছর ধরে নেপালের এই শেরপা এক্সপিডিশন লিডার, পার্বতারোহীদের ইনস্ট্রাক্টর এবং মাউন্টেন গাইড হিসেবে কাজ করছেন। ২০০৮ এর সেই দুর্ভগ্যজনক কে-টু (K2) অভিযানের সাক্ষী তিনি। পেমবার স্মৃতিতে দগদগে ঘা-সেই দুটো দিন।

নোরিট এক্সপিডিশন টিমের পর্বতারোহী ছিলেন। সামিটে পৌঁছানোর পর হঠাৎ বদলে যেতে থাকে সবকিছু। নামার সময় পেমবা, জিরার্ড ম্যাকডোনেল, উইলকো ভ্যান রুইজেন এবং মার্কো কনফোরটোলা একসঙ্গে ছিলেন। হঠাৎ দেখতে পান ফিকস্ড লাইন, যে দড়ি ধরে নামতে হয় সেটি ছিড়ে গিয়েছে। সবাই আটকে পড়েন ডেথ জোনে। সেখানেই ক্যাম্প করে থেকে যাওয়ার কথা ভাবলেন কেউ কেউ। পাহাড়ি পেমবা বিপদের গন্ধ পেলেন। ২৭০০০ ফুট উচ্চতায় অক্সিজেন ছাড়া রাত কাটানোর ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। রাত একটা নাগাদ ক্যাম্প ফোরে পৌঁছে যান।

ছবি সৌজন্যে পেমবা

ছবি সৌজন্যে পেমবা


পরদিনটা পর্বতারোহণের ইতিহাসে একটা কালো দিন। বাকি যারা ডেথ জোনে থেকে গিয়েছিলেন তাদের কেউ বরফে চাপা পড়লেন, কেউ কেউ ক্লান্তিতে অবসন্ন শরীরে আর এগোতে পারেননি অথবা পথ হারিয়েছেন। বেশিরভাগই উচ্চতায় অসুস্থ হয়ে পড়েন, ফ্রস্ট বাইটের শিকার হন। ডেথ জোন কেড়ে নিল বহু আরোহীর প্রাণ। ‘ওপরে এত লোক রয়ে গিয়েছেন, জানতাম আমাকে সেখানে ফিরে যেতে হবে। জানতাম তাঁরা বেঁচে আছেন। পর্বত থেকে নেমে আসার শারীরিক অবস্থা নেই হয়ত’, স্মৃতি হাতড়ে বলেন পেমবা। গণ্ডগোল চারপাশে, তার মধ্যে পেমবা জানতেন দ্রুত কাজ সারতে হবে তাঁকে। রেডিওতে শুনেছেন, ইতালীয় পর্বতারোহী কমফোরটোলাকে বটলনেকের কাছাকাছি দেখা গিয়েছে। খারাপ আবহাওয়ার তোয়াক্কা না করে বিপদ মাথায় নিয়ে পেমবা সেই বটলনেকের দিকেই এগোতে শুরু করলেন। ‘দৃঢ় বিশ্বাস ছিল কনফোরটোলা বেঁচে আছেন। আমিই তাঁকে সাহায্য করতে পারি’, মনে করেন পেমবা। ‘ক্যাস এবং আমি কনফোরটোলাকে সাহায্য করতে হাইক্যাম্প ছাড়লাম’, যোগ করেন পেমবা। ‘আবহাওয়ার যা অবস্থা ছিল ক্যাস কাহিল হয়ে পড়ছিল। ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় ক্যাস বিশ্রাম নিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি কনফোরটোলাকে হাইক্যাম্পের নিরাপদ জায়গায় নামিয়ে আনতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম’, বলছিলেন পোমবা। পেয়েও গেলেন ইতালিয় পর্বতারোহীকে কিন্তু ততক্ষণে উচ্চতায় অসুস্থ কনফোরটোলার অবস্থা বেশ খারাপ। পেমবা তাঁকে অক্সিজেন দিলেন এবং বটলনেকের বেস অবধি নামিয়ে আনলেন। ইতিমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই পর্বতারোহীকে নামিয়ে আনতে বটলনেকের ওপরে ছিলেন দুই শেরপা। তাদের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ স্থাপন করতে করতে হঠাৎ বিকট শব্দে বরফের চাঁই ভেঙে পড়ে। দুর্ভাগ্য পেমবার, কাউকে সাহায্য করতে পারলেন না। তাঁকে একাই ফিরে আসতে হল।

ক্যাম্প ফোরে ফিরে এসে এবার উলকোর খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন পাহাড়ি শেরপা পেমবা। দলের আরেক সদস্য ক্যাস ভ্যান দি জেভেল ছিলেন সঙ্গে। আবার গেলেন ডেথ জোনের দিকে। ডেথ জোনে খোলা আকাশের নিচে তাও আবার জল ছাড়া অতক্ষণ টিকে থাকা অসম্ভব। উলকোর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে। কিন্তু আচর্যজনকভাবে সেই রাতটা টিকে গিয়েছিলেন উলকো। স্ত্রীর কাছে রেখে যাওয়া স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে তাঁকে ট্রেস করা সম্ভব হয়। ‘আশা ছাড়িনি আমি, জানতাম উইলকো বেঁচে আছেন। আমার ধারণা আরও জোরদার হল যখন রেডিওতে বেস ক্যাম্প থেকে খবর এল একটা হলুদ বিন্দুকে নিচের দিকে নামতে দেখা গিয়েছে। ক্যাস আর আমি আবার বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু ক্যাস ক্লান্ত হয়ে পড়ল, রাতও হয়ে আসছিল। সে জানায় তার পক্ষে তাড়াতাড়ি এগোন সম্ভব নয়। তাকে ধীরে ধীরে আসতে বলে আমি দ্রুত নিচে নেমে যাই উইলোর খোঁজে’,বলছিলেন পেমবা। সারারাত ধরে ক্যাম্প তিন এবং চারের ধস সংকুলান এলাকায় রাতেই কয়েক ঘণ্টা ধরে উইলকোর খোঁজ করেন পেমবা। কিন্তু খুঁজে পেলেন না। ‘২০০ মিটারের মধ্যে একটা স্যাটেলাইট ফোন বাজতে শুনলাম। কিন্তু কোন জায়গা থেকে আওয়াজ আসছে বুঝতে পারছিলাম না’, বলে চলেন পেমবা। রাত দুটো নাগাদ ক্যাম্প ৩ এ ফিরে আসেন পেমবা। ক্লান্তিতে তখন আর শরীর চলে না। ‘খুব ভোরে আমার তাঁবুর কাছে পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দে জেগে যাই। বুঝতে পারলাম, ক্যাস ক্যাম্প ২ এর দিকে যাওয়ার সময় ওই পাথর গড়িয়ে পড়ে। ক্যাস যখন ক্যাম্পে ফিরে এসেছিল তখনই জল এবং অন্যান্য জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিই। ঠিক তখন বেস ক্যাম্প থেকে একটি রেডিও বার্তা পাই। তারা আমাকে জানায়, হলুদ বিন্দু আমাদের তাঁবুর ২০০ মিটারের আশেপাশে আছে’, বলেন পেমবা। সময় নষ্ট না করে পেমবা এবং ক্যাস আবার উইলকোর খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। ‘অবশেষ তাঁর দেখা পেলাম’,যোগ করলেন পেমবা। ফ্রস্ট বাইটে কাবু অবসন্ন উইলোকে ক্যাম্পে টু-তে নিয়ে আসেন ক্যাস এবং পেমবা।

ছবি সৌজন্যে পেমবা

ছবি সৌজন্যে পেমবা


ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছিল। টলতে টলতে উইলকোকে সঙ্গে নিয়ে কার্যত দুই পর্বতারোহীকে বাঁচিয়ে ক্যাম্প থ্রি-তে ফিরে আসেন। আমরা তাঁকে অক্সিজেন দিই, জল দিই, সুস্থ করে তুলি। অবশেষে বেস ক্যাম্পে নেমে আসতে সাহায্য করি। ওই দুর্ঘটনার পর বেশ কয়েক বছর পেমবা আবার ট্রেকিংয়ে ফিরে যান। ‘কেটু তে আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম। শারীরিক এবং মানসিকভাবে শক্ত ছিলাম বলে বাকিদের সাহায্য করতে পেরেছিলাম’, বলেন বিনয়ী পেমবা।

পেমবা মনে করেন কে-টুর মতো পর্বতে ওঠার জন্য ঠিকঠাক প্রস্তুতি থাকা চাই। ক্ষমাহীন এই চূড়ায় ভুলের কোনও জায়গা নেই। ইতিহাস পড়ে, অভিজ্ঞদের কাছ থেকে কে-টু সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছিলেন পেমবা। ‘নিজেকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে তৈরি করি এবং যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছিলাম’, বলেন পেমবা। সেদিন কেন সোজা নিচে চলে আসেননি পেমবা? ‘আমি জানি না। পর্বত তখন গিলে খেতে আসছিল। কিন্তু আমি ফিরে যেতে পারিনি, জানি না কেন’। ২০০৮ এ কে-টুর ওই দুর্ঘনায় অনেক পর্বতারোহী মারা গেলেন, পেমবাকে কিন্তু সরিয়ে রাখা গেল না পর্বতের কাছ থেকে। পরের বছর আবার গেলেন। পেমবার কাছে পর্বতারোহণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্কুলে যেতে তাঁকে ৩০০ মিটার পাহাড় চড়তে হত। হিমালয়ে জন্মে পাহাড়ে চড়াটা তাঁর কাছে কোনও ব্যাপারই ছিল না। ‘পর্বত আমার ভালোবাসা, ভালোবাসি প্রকৃতির নির্মলতাকে। পর্বত আমাদের কাছে পবিত্র। নিরাপদে লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার জন্য প্রত্যেকবার চড়ার আগে প্রার্থণা করি’, বলেন পেমবা। ২০ বছর ধরে পেমবার পর্বতারোহণ চলছে। পেমবা বিশ্বাস করেন প্রতিবারই পাহাড় তাঁকে নতুন কিছু শেখায়। ‘আমি এখনও পর্বতের ছাত্র’, বলেন পেমবা। প্রতি বারই নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। ‘একই পথে বারবার গেলেও চ্যালেঞ্জ প্রতিবারই নতুন, নতুন শিক্ষা, নতুন সৌন্দর্য’, বলে চলেন টাইগার অব দ্য ডেথ জোন।

পেমবা বলেন, পর্বত এবং প্রকৃতিকে বিশ্বাস করতে হবে। নিজের শারীরিক ক্ষমতার সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে। মানুষ আজকাল শুধু সামিটে যেতে চান, কিন্তু যে জিনিসগুলিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন যেমন, মন এবং শারীরিক প্রশিক্ষণ, সেদিকে খেয়ালই রাখেন না।

পর্বতারেহণ নিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্পর্কে পেমবা বলেন, ‘পর্বতে ওঠা আজকাল বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে গিয়েছে। যদিও আমার জন্য, এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য ভালোই হয়েছে, কিন্তু কোথায় যেন অনেক কিছু হারিয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে জরুরি নিরাপত্তা। অত উঁচুতে যদি যাবেন ঠিক করেন তাহলে তার জন্য প্রস্তুত হন। একবিন্দুও অভিজ্ঞতা নেই এমন লোকও আসেন এস্কপিডিশনে। এটা খুব বিপজ্জনক’, বলেন পেমবা।

২০০৯ এ মাউন্টেন গাইড হিসেবে UIAGM এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান। হিমালয়ে সুস্থ আরোহণের প্রচারে কাজ করছেন। বিভিন্ন পর্বতে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকে হিমালয়ে নানা পরিবর্তন তাঁর চোখে পড়ে। সব পর্বতারোহীদের পেমবা একটা কথা বলেন, ‘সঠিক প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ এবং মন ও শরীরের সঙ্গে বোঝাপড়া থাকলে পর্বতারোহণ হল সবচাইতে শ্রেষ্ঠ যেটা তুমি করতে পার’।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags