সংস্করণ
Bangla

শচীনকে সফল করেছে ব্যবসার লড়াকু ইনিংস

YS Bengali
6th Jan 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

আট বছর আগে এতটাই দৈন্যদশা ছিল, যে মাত্র ১৩০০০ টাকায় নিজের হিরো হন্ডা স্প্লেন্ডার বাইকটা বিক্রি করে দিয়ে নিজেকে ধনী মনে হয়েছিল শচীনের। একটা পায়রার খোপের মত অফিসবাড়ি লাগোয়া ঘর। আট বছর আগেও শচীনের দিন গুজরান হত এই স্বল্পায়তন চৌহদ্দির মধ্যে। বেঙ্গালুরুতে যেখানে থাকতেন সেখানে নিজের মা-বাবাকে আসতে বলতেও লজ্জা পেতেন। ইনি তেণ্ডুলকর নন ভরদ্বাজ। এটা ছিল সেইসময়ের কথা, যখন খাবার ডেলিভারির ব্যবসায় শুরুয়াতি সংস্থা ‘টেস্টিখানা’ সবে বেঙ্গালুরুর বুকে অল্প অল্প করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করেছে।

সেইসময় তাঁকে এতটাই টানাটানির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছিল যে নিজের অত্যন্ত পছন্দের মোটরবাইকটাও তাঁকে মাত্র ১৩০০০ টাকায় বিক্রি করে দিতে হয় শুধু বাড়ি ভাড়ার টাকা মেটানোর জন্য।

কিন্তু টানাপোড়েনের সেইসব দিন এখন অতীত। আজকে শচীনের গ্যারাজে ঝাঁ চকচকে BMW। মাত্র একমাস আগে পুত্রসন্তানের বাবা হয়েছেন, এবং সেরে ফেলেছেন নিজের দ্বিতীয় উদ্যোগ ‘স্মিঙ্ক’ এর যাবতীয় প্রস্তুতিও।

বিগত কয়েকবছরের মধ্যে বদলে গিয়েছে অনেককিছুই। গতবছর নম্ভেম্বরে ১২০ কোটি টাকায় ফুডপান্ডা অধিগ্রহণ করেছে ‘টেস্টিখানা’।

অধিগ্রহণ খুব সহজ খেলা নয়

অধিগ্রহণ সংক্রান্ত আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল ওই বছরেরই অগাস্ট মাসে এবং আলোচনা দ্রুতই ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছিল। খুবই দ্রুত ওনাদের মধ্যে চুক্তিও সম্পাদন হয়ে গিয়েছিল।

২০১১ সালে পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগকারী, টেস্টিখানার গরিষ্ঠসংখ্যক শেয়ারের মালিক, বার্লিন নির্ভর ডেলিভারি স্টার্টআপ ‘ডেলিভারি হিরো’র স্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা এই চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে সহমত ছিলেন। নিজেদের সংস্থার অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টরদের ১০ গুণ রিটার্ন সহ সংস্থার গোড়ার দিকের বিনিয়োগকারীদের হাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লভ্যাঙ্ক তুলে দিতে পারায় শচীন ও শেলডন রীতিমত খুশি ছিলেন এই চুক্তি নিয়ে।

কিন্তু অধিগ্রহণের কয়েকমাস যেতে না যেতেই দেখা গেল যে ওনারা যেমনটা আশা করেছিলেন, তেমনটা হচ্ছেনা। দুই সংস্থার ম্যানেজমেন্ট টিমের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে দ্বিমত দেখা দিচ্ছিল।

“আমি সমস্যার বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওনারা কোনোরকম আলোচনায় যেতে রাজি হননি। এবং আমাদের বলা হয়েছিল যে সাতবছর ধরে আমরা টেস্টিখানার যে ব্যবসা গড়ে তুলেছি, একশো কর্মচারী নিয়ে গড়ে ওঠা সেই সংস্থার তুলনায় ফুডপান্ডার কর্মসংস্কৃতির ধাঁচা অনেকটাই আলাদা,” জানালেন সচিন। তিনি আরো বললেন যে, ফুডপান্ডা কিভাবে নিজেদের ব্যবসা চালাবে, সেই নিয়ে উনি কোনো মতামত দিতে চাননি। “আমি যেভাবে ভাবছি, শুধু সেটাই একমাত্র সঠিক পন্থা এমন ভাবলে সেটা ভুল করা হত,” জানালেন তিনি।

উনি এবং ম্যানেজমেন্টের আরো কয়েকজন সদস্য মার্চ মাসের গোড়ার দিকে ফুডপান্ডা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। কিছু সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, যেহেতু প্রচুর টাকা শেয়ারে বিনিয়োগ করা ছিল, তাই এভাবে সংস্থা ছেড়ে বেরিয়ে আসার ফলে ওনাদেরকে নিজেদের অংশের একটা বড় পরিমাণ বিনিয়োগ ছেড়ে আসতে হয়।

“সঠিকভাবে একটা ব্যবসাকে গড়ে তোলার নীতি আমাদের কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনো মর্মেই সেটার সাথে আপোষ করা সম্ভব ছিলনা। ব্যবসাকে বাড়িয়ে তোলার জন্য কোনো অনৈতিক চটজলদি পন্থা বেছে নেওয়ার চেয়ে বরং কম লাভে চলাটাও আমার কাছে শ্রেয়। আমি এমন একজন মানুষ যে কখনো পুলিশকে পর্যন্ত ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেনি। একবার আমার নিজের ভুল ছিল বলে আমি ছয়মাসের জন্য নিজের লাইসেন্স সাসপেন্ড করিয়েছিলাম। ঘুষ দিয়ে নিজের কাজ উশুল করে নেওয়ার চেষ্টা আমি কোনোদিনও করিনি,” বলছিলেন শচীন।

সংস্থা ছেড়ে এভাবে বেরিয়ে আসার ফলে ওনাদের কি মূল্য দিতে হয়েছে সেটা জানতে চাওয়ায় উনি বললেন, “আমার যেটুকু রয়েছে আমি তাতেই খুশি। আমাদের কিছু কর্মচারীর ক্ষেত্রে ESOPS এর পেপারওয়ার্ক করা ছিলনা। সেক্ষেত্রে আমরা ( শচীন ও শেলডন) নিজেদের অংশ থেকে টাকা দিয়ে তাঁদের প্রাপ্য মিটিয়েছি। যাদের উপর নির্ভর করে আমাদের ব্যবসা দাঁড়িয়েছে, তাদেরকে ছেঁটে ফেলাটা কোনোভাবেই আমার পক্ষে সম্ভব নয়,”।

যেভাবে তৈরি হয়েছে ‘সি মি ইন নো কিউ’ সংস্থাটি -

image


ফুডপান্ডা নিয়ে সাময়িক দোলাচলের পর হঠাৎ করেই শচীন পৌঁছে গিয়েছিলেন নিজের জীবনের এক উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে - শীঘ্রই তিনি বাবা হতে চলেছিলেন। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি ও গাইনোকোলজিস্টের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট জাতীয় বিষয়গুলি আচমকাই কিভাবে তাঁর নিত্যদিনের জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল সে সময়, সেটা আমাদের বলছিলেন শচীন।

“এই সমস্ত জায়গায় আমাদেরকে বহুক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই আপনারা জানেন যে এই ধরনের প্রতীক্ষা কতটা দীর্ঘ হতে পারে। এবং এই লাইন দেওয়ার বিষয়টাতে কিভাবে রদবদল আনা যায়, এই সময় থেকেই সেই নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছিল,” জানালেন শচীন।

শচীন এবং ওনার স্ত্রী বেশ অনেকবার নিজেদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস করেছিলেন।

“ক্লিনিকগুলো চাইলে প্রতীক্ষার সারিগুলিকে আরো ভালোভাবে সামলাতে পারে। প্রযুক্তিই পারে এই কাজটা করতে,” ভেবেছিলেন উনি।

ইতিমধ্যেই কিন্তু উনি, ওনার প্রাক্তন সংস্থা টেস্টিখানার সহ-প্রতিষ্ঠাতা শেলডন এবং ওই সংস্থারই চিফ সেলফ অফিসার সন্তোষ মিলে ‘স্মিঙ্ক’ নামক সংস্থাটি তৈরি করে ফেলেছিলেন এবং গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন পুণের আটটি ক্লিনিকের সাথে।

স্মিঙ্ক যেভাবে কাজ করে –

স্মিঙ্ক হল একটা মোবাইল অ্যাপ যেটা সংস্থাগুলিকে গ্রাহকদের সামলাতে সাহায্য করে। এই অ্যাপ ‘লাইভ কিউ’ তৈরি করে, সেটাকে বজায় রাখে এবং যেমস্ত গ্রাহক ‘কিউ’ এর সামনে চলে এসেছেন বা যাদের অর্ডার করা পণ্য চলে এসেছে, তাঁদেরকে এস এম এস মারফত জানিয়ে দেয়। ‘কিউ’ কি অবস্থায় রয়েছে সেটা দেখার সুযোগ করে দেবার পাশাপাশি এটা গ্রাহকদের প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত না থেকেও ‘কিউ’ তে নিজেদের জায়গা বুক করার সুযোগ করে দেয়।

বিভিন্ন ডাক্তার, যাঁরা স্মিঙ্ক এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন, তাঁদের মারফত প্রতিমাসে প্রায় ১০০০ রিমোট বুকিং হচ্ছে। সম্প্রতি ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ সামলানোর জন্য তাঁরা কাজ শুরু করেছেন একটি HR সংস্থার সাথে।

শচীনের মতে, স্মিঙ্কের সম্ভাবনা অনেক। ক্লিনিক থেকে শুরু করে ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ কিংবা আরটিও অথবা পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্রর মত সরকারি অফিসে কিংবা গাড়ি বা বাইক সার্ভিস স্টেশানের মত জায়গাতেও এটাকে ব্যবহার করা সম্ভব।

পণ্য বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে এই অ্যাপ ‘CRM’ হিসাবে কাজ করতে পারে এবং গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগের বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। গ্রাহকসংখ্যার উপর নির্ভর করে মাস-প্রতি এই অ্যাপ ব্যবহারের জন্য খরচ পড়ে প্রায় ২০০০ টাকা মত।

গোটা পৃথিবী জুড়েই একাধিক শুরুয়াতি সংস্থা কাস্টমার কিউ ম্যানেজমেন্ট এর ব্যবসা করলেও, এই সংস্থাগুলির পরিষেবা নির্দিষ্ট কিছু ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিছু সংস্থা যেমন ক্লিনিকের কিউ সামলানোর জন্য পরিষেবা দেয়, তেমনই কিছু সংস্থা রেস্তোরাঁর কিউ সামলায়। কেবলমাত্র ‘মাইটাইম’ ও ‘কিউ লেস’ নামক দুটি সংস্থা একইসাথে বিবিধরকম ক্ষেত্রে পরিষেবা দেয়।

কি বলছে ভবিষ্যৎ ?

“অনেককিছু দেখতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু অনেককিছু শিখেওছি আমি। এটা ভেবে ভালো লাগে যে, আমি ও আমার সহকর্মীরা মিলে যেভাবে টেস্টিখানার মত একটা সফল ব্যবসা গড়ে তুলেছিলাম, ঠিক সেইভাবেই আবারও শূন্য থেকে গড়ে তুলব নতুন একটা সংস্থাকে,” বললেন শচীন।

তবে শূন্য থেকে শুরু করা বলতে যে আবার সেই পায়রার খোপের মত বাসায় ফিরে যাওয়া নয় কিংবা বাড়িভাড়ার জন্য মোটোরবাইক বিক্রি করা নয়, সেটা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখেনা। বরং উনি এটা বোঝালেন যে, উদ্যোগপতি হিসাবে ওনার পথ চলা জারি থাকবে।

(লেখা – অপর্ণা ঘোষ, অনুবাদ – সন্মিত চ্যাটার্জী)

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags