সংস্করণ
Bangla

ভারত ও আফ্রিকায় আলো ফুটিয়েছে ‘সান কিং’

17th Sep 2015
Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share

একবিংশ শতকের প্রথমার্ধে দাঁড়িয়ে আধুনিক জীবনে বিদ্যুতের অপরিহার্যতার কথাটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। দৈনন্দিন জীবনে অত্যাধুনিক সব বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের ব্যবহারে মানুষের বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবিটার সঙ্গে কম বেশি আমরা সকলেই পরিচিত। অথচ আমাদের জ্ঞানের পরিধির বাইরে বিশ্বের সার্বিক জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের কাছে এখনও প্রতিটা রাত ডুবে থাকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে। বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের ব্যবহার তো দূরে থাক, সংখ্যার বিচারে প্রায় দেড়শো কোটি মানুষের কাছে রাতেরবেলা চোখ মেলে তাকানোর একমাত্র ভরসা কেরোসিনের এক চিলতে ঝাপসা আলো, যার ধোঁয়া-দূষণে তাদের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে প্রতিদিন। সম্মিলিতভাবে উন্নয়নশীল এশিয়া ও সাহারা সংলগ্ন আফ্রিকার ৯৫ শতাংশেরও বেশি মানুষের কাছে এখনও বিদ্যুত পৌঁছয়নি। স্বাভাবিকভাবেই কেবলমাত্র দুই মহাদেশেরই বিপুল পরিমাণ মানুষ এই শক্তি ব্যবহারের অন্তরালেই থেকে গিয়েছেন। 

পরিসংখ্যানের নিরিখে উন্নয়নশীল দেশগুলির ৭৭ শতাংশ মানুষের কাছে এখনও পর্যন্ত বিদ্যুৎ পৌঁছতে পেরেছে। শহরগুলিতে এই হারটা ৯১ শতাংশ ছুঁলেও গ্রামাঞ্চলে তা মাত্র ৬৫ শতাংশ মানুষের নাগালের মধ্যে। শুধুমাত্র ভারতেই ৩৫ কোটি মানুষের কাছে প্রতি রাতে স্যুইচ টিপে ঘর আলো করার বিলাসিতাটা এখনও স্বপ্ন মনে হয়।

‘সান কিং’এর আলোয় খুশির মহল

‘সান কিং’এর আলোয় খুশির মহল


আশার কথা এই যে, ‘সান কিং’-এর দৌলতে ইতিমধ্যেই এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ বিদ্যুতের অভাবটা পূরণ করতে পেরেছেন। আধুনিক জীবনযাপনে সহায়ক না হলেও অন্ততপক্ষে রাতের আঁধারটাকে ফিকে করে ‘সান কিং’ দূর করেছে কেরোসিনের আলোর অস্পষ্টতাকে। ‘সান কিং’ হল অচিরাচরিত সৌর বিদ্যুৎচালিত একটি ছোট এলইডি লন্ঠন, যা সূর্যের আলোতে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করে নেয়। আপনা থেকেই রি-চার্জ হওয়া ছাড়াও ‘সান কিং’ ব্যবহারের সব থেকে ইতিবাচক দিক হল, শর্ট-সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের কোনও সম্ভাবনাই নেই এতে।

শিশুদের পড়াশোনার সাথী ‘সান কিং’

শিশুদের পড়াশোনার সাথী ‘সান কিং’


‘সান কিং’ উদ্ভাবনের ভাবনাটা আসে ২০০৫ সালের গ্রীষ্মকালে। আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্র প্যাট্রিক ওয়ালস, মায়াঙ্ক সেখসারিয়া ও অনীশ ঠক্কর নিজেরাই জানতেন না যে তারা লক্ষ লক্ষ বঞ্চিত মানুষের ঘর আলো করার এক সহজ উপায় খুঁজে বার করতে চলেছেন। ‘সীমাহীন প্রকৌশলী’ প্রকল্পের শরিক হয়ে প্যাট্রিক ওড়িশায় এসেছিলেন কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য বায়ো-ডিজেল জেনারেটরের প্রচলন সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে। কৃষিক্ষেত্রের আঙিনা ছাড়িয়ে শীঘ্রই এই ধরনের জেনারেটরগুলি বিদ্যুতের যোগান দিতে শুরু করেছিল স্থানীয় অধিবাসীদের বাড়িতে। যা দেখে সৌর লন্ঠন উদ্ভাবনের প্রাথমিক ভাবনাটা মাথায় আসে প্যাট্রিকদের। অনীশ ঠক্কর প্রাথমিকভাবে সেই মডেলটিকে আধুনিক রূপে বাজারে আনার জন্য তার প্রাক্তন বস ‘জেডএস অ্যাসসিয়েটস’-এর যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা ডঃ সিনহাকে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। ডঃ সিনহা বিনিয়োগে সম্মত হলে শুরু হয় সৌর লন্ঠন উৎপাদক সংস্থা ‘গ্রিনলাইটস প্লানেট’-এর নতুন অধ্যায়। ২০০৮ সালের শীতের সময় সংস্থার সিইও অনীশ ও মায়াঙ্ককে ভারতে পাঠানো হয় ‘গ্রিনলাইটস প্লানেট’-এর ব্যবসায়িক যাত্রা শুরুর জন্য। চিনের শানঝেন’এ ‘সান কিং’এর উৎপাদন ও গুণগত উৎকর্ষতা সাধনের জন্য প্যাট্রিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই থেকে এখনও পর্যন্ত ‘গ্রিনলাইটস প্লানেট’ ৩১টি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বৈদ্যুতিন আলোর চাহিদা পূরণ করে চলেছে।


গ্রামে গ্রামে ‘সান কিং’এর প্রচার

গ্রামে গ্রামে ‘সান কিং’এর প্রচার


বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি ‘গ্রিনলাইটস প্লানেট’এর লক্ষ্য ছিল সাধ্যের মধ্যে সাধ পূরণ। অর্থাৎ স্বল্প মূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে আলো পৌঁছে দেওয়া। মানুষ সচরাচর দান গ্রহণ করতে কুণ্ঠা বোধ করে। তারা চায় নিজেদের সামর্থে কোনও কিছু অর্জন করতে। উন্নয়নশীল এশিয়া ও সাহারা সংলগ্ন আফ্রিকার গ্রামীণ মানুষের ঠিক এই চাহিদাটাই পূরণ করেছে ‘গ্রিনলাইটস প্লানেট’। এই মুহূর্তে সংস্থার উৎপাদিত সামগ্রীর ৫০ শতাংশই বিক্রি হয় আফ্রিকায়। ওই মহাদেশের প্রত্যন্ত কোণায় পৌঁছে যাওয়ার লক্ষ্যে ‘গ্রিনলাইটস প্লানেট’ গাঁটছড়া বেঁধেছে স্থানীয় কিছু সংস্থার সঙ্গে। গোটা আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে দীর্ঘকালীন মেয়াদে নবিকরণযগ্য শক্তির যোগান নিশ্চিত করতে এটাই ছিল সংস্থাটির একটি উচ্চাভিলাসি ও সঠিক পদক্ষেপ।

‘সান কিং’এর ব্যবহার অতি সহজ ও বহুমুখী। এই সৌর লণ্ঠনটিকে দিনের বেলায় সূর্যের আলোয় রেখে দিতে হয়। সূর্যের আলোয় নিজে থেকেই চার্জ হয় লণ্ঠনটি। রাতে একে আলোর উৎস হিসাবে অথবা মোবাইল ফোনের চার্জার হিসাবে ব্যবহার করা যায়। ‘গ্রিনলাইটস প্লানেট’ মোট চার ধরনের ‘সান কিং’ লণ্ঠন বাজারে এনেছে, যার প্রত্যেকটিকে তিনটি আলাদা পদ্ধতিতে ব্যবহার করা যায়। প্রথমত, একদিন চার্জ দিয়ে কম পাওয়ারের টর্চ হিসাবে এটাকে ১৬ ঘণ্টা ব্যবহার করা যায়। দ্বিতীয়ত, মধ্যম পাওয়ারের লণ্ঠন হিসাবে দৈনন্দিন ১৬ ঘণ্টা আলো পাওয়া যায়। সবশেষে, উচ্চ মাত্রায় ৪ ঘণ্টার উজ্জ্বল আলো পাওয়া যেতে পারে এই লণ্ঠনটি থেকে। এর গঠনটাও এমনই সুবিধাজনক যে, এটাকে সহজেই বহন করা যায় নিজের সঙ্গে। ঝড়-বৃষ্টির মতো আপতকালীন পরিস্থিতিতেও নিশ্চিন্তে ব্যবহারযোগ্য ‘সান কিং’। এটাকে যেমন ডেস্ক ল্যাম্প হিসাবে ব্যবহার করা যায়, তেমনই দেওয়াল বা ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখারও ব্যবস্থা রয়েছে ‘সান কিং’এ। হাঁটার সময় টর্চ হিসাবে সঙ্গে নেওয়া যায় অনায়াসে। এর ব্যাটারি চলে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর্যন্ত।

শুধু রাতের অন্ধকার ঘোঁচানো নয়, ‘সান কিং’-এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে দুই মহাদেশ জুড়ে। ‘গ্রিনলাইটস প্লানেট’ প্রাথমিকভাবে ‘সান কিং’এর বিক্রি শুরু করেছিল ৬৫০ টাকায়। কেরোসিন আলোর খরচের থেকে যা অনেক বেশি সাশ্রয়কারী। তাছাড়া ‘সান কিং’-এর ব্যবহার একেবারেই দূষণমুক্ত। কেরোসিন আলোর ধোঁয়া ঘরের বাতাসকে যতটা দূষিত করে, তা মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে কাঠ ও কেরোসিন পোড়ানোর ফলে যে দূষণ হয়, তাতে অসুস্থ হয়ে প্রতি বছর ৩৫ লক্ষ মানুষ মারা যান। মৃত্যুর এই হারটা ম্যালেরিয়া অথবা এইচআইভি-র প্রকোপের থেকেও দ্বিগুণ।

‘সান কিং’ যেহেতু বাড়ি বাড়ি পৌঁছে গ্রাহকদের সরাসরি বিক্রি করা হয়, তাই একটা বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে এর বিপণনের জন্য। ডিস্ট্রিবিউটর থেকে শুরু করে এজেন্ট পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলের বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে ‘সান কিং’এর প্রচার ও প্রসারে। এতে কর্মরত মানুষের বার্ষিক আয়টাও বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ হারে। ভারত ও আফ্রিকার লক্ষ লক্ষ মানুষকে শুধুমাত্র আলোর উৎস জুগিয়েই নয়, তাদেরকে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে ফেরানোর পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়েও স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে ‘গ্রিনলাইটস প্লানেট’এর অনবদ্য উপহার ‘সান কিং’ সৌর লণ্ঠনটি।

Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags