সংস্করণ
Bangla

জঞ্জাল সামলাতে মার্কিন মুলুক ছেড়ে দেশে দুই তরুণ

আবর্জনাই ভারতের বিভীষিকা। অথচ সেই জঞ্জাল নিয়েই সুন্দর স্বপ্ন দেখছেন দুই কৃতী টেক্‌নোক্র্যাট। আমেরিকার নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ভারতে খুলে বসেছেন জঞ্জাল সামলানোর ব্যবসা।

Rajdulal Mukherjee
17th Aug 2015
Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share
image


এটাও কি একটা ব্যবসা হতে পারে! প্রথাগত ব্যবসায়িক উদ্যোগের বাইরে, একটু অন্যরকম ভাবনা থেকেই 'বানিয়ান'। বর্জ্য পদার্থ, এর রিসাইক্লিং, ভূমি ভরাট -উচ্চ প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে সেই কাজটাই করা। বর্জ্য পদার্থ যদি সমস্যা হয়, বানিয়ান এর একটা সমাধান। প্রথাগত ব্যবসায়িক মডেলের বাইরেও একটা ব্যবসা। কিন্তু সামাজিক উদ্যোগ।

রিসাইক্লিং চক্রের মধ্যেই একটা ফাঁক রয়ে গিয়েছে। রিসাইক্লিং প্রসেসে সেই অদক্ষতার ফাঁক পূরণ করার ভাবনা থেকেই স্টার্টআপ 'বানিয়ান'। বর্জ্য পদার্থকে বাছাই করা, বাছাই পরবর্তী সময়ে সংগ্রহ এবং সবশেষে রিসাইক্লিং।

'বানিয়ান' গড়ে উঠার শুরুটা হল কীভাবে?

একবার ভারত সফরের সময় চারদিকের নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখে বিষয়টা নাড়া দেয় মণিকে। বিষয়টা তাঁকে যতটা বিব্রত করেছিল, ঠিক ততটাই অনুপ্রাণিত করেছিল। এমন একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে যা ভারতের কঠিন বর্জ্য পদার্থের সমস্যা মেটাবে উচ্চ প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে এবং তৃণমূলস্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণে। এই ভাবনা থেকে জন্ম নেয় বানিয়ান। স্টিভ ব্ল্যাঙ্কের লিন লঞ্চ প্যাড প্রোগ্যাম আর কলম্বিয়া বিজনেস স্কুলের গ্রিনহাউস ইনকিউবেটরে বিষয়টা নিয়ে নাড়াঘাটা করে বানিয়ানের বিজনেস মডেল তৈরি করে ফেলেন মণি।

তবে মণি একা ছিলেন না। ছিলেন আর একজন। রাজ মদনগোপাল। প্রযুক্তিবিদ। প্রযু্ক্তিকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত ভারতকে কীভাবে পথ দেখান যায়, সেটাই তাড়িয়ে বেড়াত রাজকে। ঘটনাচক্রে মণির পা রাখার ৬ মাস পরে বিদেশে যান রাজও। ২০০২ সালে ডেলাওয়ারে আলাপ হল দুজনের। ইউনিভার্সিটি টাউন নেওয়ারে দুজনের বন্ধুত্বও বাড়ল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা। সেই সময় ডেলওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ওয়্যারলেস কমিউনিকেশনস) নিয়ে পি এইচ ডি করছেন মণি। আর রোবোটিক্স নিয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স করছেন রাজ। পড়াশোনা শেষ হলে দুজনের পথও আলাদা হল। সান ডিয়েগোর কুয়ালকমে যোগ দিলেন মণি। আর রাজ গেলেন সিয়াটলের একটি মোবাইল স্টার্টআপে। গল্পটার হয়তো এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু হয়নি।

এর বছর দশেক পরে টেলিফোনে কথায়-কথায় ভারতে কঠিন বর্জ্য পদার্থের সমস্যা এবং তাঁর সেই বিজনেস মডেলের কথা রাজের কাছে পাড়েন মণি। সাড়া দেন রাজও। কলম্বিয়া বিজনেস স্কুলের সেই গ্রিনহাউস ইনকিউবিটর প্রজেক্টে হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরু যান দুই বন্ধু। সম্ভাব্য ক্রেতা খুঁজে বের করা থেকে বর্জ্য পদার্থের অ্যাক্টিভেশন, সবকিছুই খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হল। মণির কথায়, "আমরা বেশ কয়েকজন বহুজাতিক সংস্থার ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললাম, ঘুরে দেখলাম হায়দরাবাদের বেশ কয়েকটা টাউনশিপ। দেখা করলাম পুরসভাগুলির কমিশনার, আবর্জনা সাফাইয়ের ঠিকাদার থেকে শুরু করে কাগজ কুড়ানি ও আবর্জনার খরিদ্দার কাবাড়িওয়ালাদের সঙ্গে।" তিন মাস ধরে এভাবেই মার্কেট রিসার্চ আর অসংখ্য লোকের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা বুঝলেন, দেশে সম্পূর্ণ কঠিন বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনের (ইন্টিগ্রেটেড সলিড ওয়াস্ট ম্যানেজমেন্ট) জন্য কোম্পানি বা সংস্থার একান্তই প্রয়োজন। এমন একটা কোম্পানি যা কঠিন বর্জ্য পদার্থ সংগ্রহ, পরিবহণ, ভূমি ভরাটের কাজটা করবে। পাশাপাশি রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে কঠিন বর্জ্য পদার্থকে কীভাবে শক্তি বা এনার্জিতে রূপান্তরিত করবে সেটাও দেখবে।

আমেরিকায় ফিরে দুই বন্ধু তিনমাস কাটালেন সেখানকার কঠিন বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনের বিষয়টা আরও ভালো করে বুঝতে। বানিয়ানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও মণি ভাজিপে বলেন, "আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রথাগত ক্ষেত্রের বাইরে এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা এবং তাঁদের হাতে উপযোগী এমন একটা প্রযুক্তি তুলে দেওয়া, যার মাধ্যমে তাঁদের রোজগার ও কাজের সুযোগ বাড়বে।"

বিদেশের চাকরি ছেড়ে দুই বন্ধুই দেশে ফিরে এলেন এবং ২০১৩ সালের জুলাইয়ে তৈরি করে ফেললেন বানিয়ান। প্রথমদিকে পুরএলাকার কঠিন বর্জ্য পদার্থ নিয়ে কাজ শুরু হল। "আমরা তখন দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রান্তের পুরসভাগুলির টেন্ডার খতিয়ে দেখতাম। বর্জ্য পদার্থ থেকে শক্তি রূপান্তর নিয়ে রাউরকেলা স্টিল প্ল্যান্টের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হল। সান ফ্রান্সিসকোর একটি জৈব গ্যাস থেকে শক্তি রূপান্তর সংস্থার সঙ্গে পার্টনারশিপও গড়ে উঠল", কথার মাঝে জানালেন রাজ।

লাল ফিতের ফাঁসে ভারতীয় স্টার্টআপস

একদিকে লাল ফিতের ফাঁস। অন্যদিকে প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে স্বশাসনের অভাব। দুইয়ে মিলে টেন্ডার প্রক্রিয়াগুলি এতটাই দীর্ঘায়িত হল যে পাঁচ মাস পার হয়ে গেল। অবস্থা এমনই যে রাউরকেলা স্টিল প্ল্যান্ট ২০১৩ সালের জুন মাসে যে দরপত্র প্রকাশ করেছিল তা এখনও খোলাই রয়েছে। এইসব ঘটনা থেকে তাঁরা একটা মূল্যবান শিক্ষা লাভ করেন বলে জানান মণি। শিক্ষাটা এই যে, সম্পূর্ণ কঠিন বর্জ্য পদার্থের নিষ্কাসন কোম্পানির অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে এটা তারা উপলব্ধি করেন। সঙ্গে এটাও বুঝতে পারেন, এমন একটা কাজের জন্য যেটুকু ঝুঁকি নেওয়ার দরকার তার খুবই অভাব রয়েছে শহররাঞ্চলের পৌরসভাগুলির।

রিসাইক্লিংয়ে ভারতে বহু কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেখা গিয়েছে প্রতি বছর ভারতে প্রায় ৬৭ লক্ষ টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পদার্থ (যার মূল্য প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা) জমা হয় । যার ফলে পরিবেশের বিপুল ক্ষতি হয়। রিসাইক্লিংয়ের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ। যা বিশ্বে খুব কম দেশেই জমা হয়। কিন্তু এখানেই একটা করুণ ছবি লুকিয়ে রয়েছে। ভারতে যারা আবর্জনা কুড়িয়ে ও বিক্রি করে দিনযাপন করেন, তাদের সামাজিক ভাবে খারাপ চোখে দেখা হয়। রিসাইক্লিং ভ্যালু চেনের ক্ষেত্রে এইসব কাগজ কুড়ানি, কাবাড়িওয়ালাদের অবস্থান একদম নীচের দিকে। বেঁচে থাকার জন্য এরা একান্তই নির্ভরশীল মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের (অপেক্ষাকৃত বড় ব্যবসায়ী) ওপর। এইসব মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা নানাভাবে তাদের বাধ্য করেন বাজার দরের অনেক কম দামে সেইসব বর্জ্য পদার্থ তাদের কাছে বিক্রি করতে। ভারতে রিসাইক্লিং ভ্যালু চেনের এই ব্যবস্থাকে ভাঙার মধ্য দিয়েই নতুন একটা বিজনেস মডেল গড়ে তোলেন মণি-রাজ। কিন্তু কিছু করতে গেলে যে টাকাও লাগবে? তাতেও সাড়া মেলে। তহবিল সংগ্রহের প্রথম এক সপ্তাহের মধ্যেই দুজনকে ১ লক্ষ পাউন্ড তুলে দেন পরিবার ও বন্ধুবান্ধবরা।

'বানিয়ান' ও প্রযুক্তি

বেনিয়ানের সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম দাঁড়িয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি ভিতের ওপর। ইনফর্মাল সেক্টরের উপযোগী অ্যান্ড্রয়েড ভিত্তিক লিড জেনারেটর অ্যাপ, এসএমএস ভিত্তিক ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম, ডেটা অ্যানালেকটিক ইঞ্জিন। দৈনন্দিন কাজের দিকে নজর রাখতে বিশেষ উপযোগী ডেটা অ্যানালেটিক ইঞ্জিন। বর্জ্য পদার্থ সংগ্রহ ও পরিবহণ খরচ কমিয়ে আনার জন্য রয়েছে জিপিএস ভিত্তিক ট্রাকিং ইঞ্জিন। ভ্যালু চেন সিস্টেমে প্রতিটি পয়েন্টে সংগৃহীত ডেটা বিশ্লেষণ করে বেনিয়ান সময় ভিত্তিক বর্জ্য রিপোর্ট তৈরি করে থাকে। সেই রিপোর্ট নিয়েই চলে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেও পর্যালোচনা হয় ওই রিপোর্ট। বাদ যায় না পৌরসভাগুলিও। রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে উঠে আসা তথ্য তাদের হাতেও তুলে দেওয়া হয়। যাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটা ব্যবস্থায় নীতিগত পরিবর্তন আনা যায়।

রেভিনিউ মডেল

বর্জ্য পদার্থ রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব। সেটাও একটা দিক। বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনের মাধ্যমে যে প্রক্রিয়াজাত রিসাইক্লেটস উতপন্ন হয়, মূলত তা বিক্রি করেই মেলে টাকা। এর বাজার শুধু স্থানীয় মার্কেট নয়, ছড়িয়ে রয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কমোডিটি মার্কেটে।

'বানিয়ান'-এর ইউনিক সেলিং পয়েন্ট (ইউএসপি)

বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিক্রি -শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পেশাদারি সহায়তা। প্রতিযোগিতায় অন্যদের থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা। এটাই এই কোম্পানির ইউএসপি। চাহিদা ও যোগানের প্রতিটি পর্যায়ে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। সাপ্লাই নেটওয়ার্কের মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়া অসংগঠিত ক্ষেত্রের সেইসব পিছিয়ে পড়া মানুষদেরও। ইতিমধ্যে দেড় হাজারের বেশি কাবাড়িওয়ালাকে সাপ্লাই নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে স্টার্টআপটি। অক্টোবরের মধ্যেই অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার বড় শহরগুলিতে দেখা মিলবে বানিয়ানের।

Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags