সংস্করণ
Bangla

বিদেশে রমরমিয়ে উড়ছে ফুলিয়া, শান্তিপুরের ওড়না

6th Dec 2015
Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share

তাঁতের শাড়ি অনেক হয়েছে। হচ্ছেও। বারো হাতের নিপুণ কাজের সুনাম গোটা বিশ্বই কুর্ণিশ করে। ফুলিয়ার হাতযশ এবার একটু অন্যভাবে জানতে পারছে দুনিয়া। এখানকার ওড়না উড়ে যাচ্ছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকায়। দারুণ বিক্রি। এসব ওড়নার সুতো, রং প্রাকৃতিকভাব তৈরি। বুনোটও অত্যন্ত ভাল। তাই বেশি দামেও কিনতে পিছপা হন না সাধারণ ক্রেতা। বাংলার হস্তশিল্পের এই নতুন দিগন্তের খোঁজ দিয়েছেনে ফুলিয়ার তরুণ উদ্যোগপতি অসীম বসাক।

image


কোনওটা চার হাত, কোনওটা আরও একটু বেশি। হাতের ফেরে বদলে যায় চাকচিক্য, জৌলুস। সুতোর ওপর কত আঁকিবুঁকি। আর মেশিনে ওঠার পরই শুরু হয় রূপবদলের গল্প। মাকুর খেল তখন আর দেখে কে। জ্যাকেটের নকশায় বদলে যায় সুতোর ক্যানভাস। একটার পর একটা সুতোর পাক যত এগোয়, তত উজ্জ্বল হতে থাকে সৃষ্টি। মাত্র চার ঘণ্টায় তৈরি হয়ে যার চার হাতি ওড়না।

ফুলিয়া, শান্তিপুরে তাঁতের মানচিত্রে এখন এভাবেই জায়গা করে নিয়েছে ওড়না। শুধু শাড়ির জন্য শান্তিপুর, ফুলিয়াকে সবাই চিনবে সেটা চাইছিলেন না কয়েকজন উদ্যোগপতি। শাড়ি‌ ব্যবসার একঘেয়েমি ও নতুন কিছু করার তাগিদে বছর পাঁচেক আগে অন্য পথে নেমেছিলেন ফুলিয়ার অসীম বসাক। অনেকটা আচমকাই ছিল সেই সিদ্ধান্ত। মেকানিক্যালে ডিপ্লোমা করা অসীমবাবু বাড়ির কাছে ফুলিয়া টাঙ্গাইল সমবায় সমিতিতে এক্সপোর্টের প্রোডাকশন ইনচার্জের চাকরি পান। সময়টা ২০০৫। বছর পাঁচেক কাজ করার পর বেতন নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হচ্ছিল না। নিজে কিছু করার তাগিদটা সবসময়ই তাঁর মনের ভিতরে চাগাড় দিত। কর্মক্ষেত্রের অশান্তিটা বোধহয় তাঁর কাছে শাপে বর হয়ে উঠেছিল। কখনই নেতিবাচক চিন্তাকে প্রশ্রয় দিতেন না। তাই অনেকের কথা কান না দিয়ে শুরু করেন তাঁতের ওড়নার ব্যবসা। সমবায় সমিতিতে কাজের সুবাদে যে জনসংযোগ তৈরি হয়েছিল তা কাজে দিল নতুন পথে। লাখ দেড়েক টাকা নিয়ে যা স্টার্ট দিয়েছিলেন এখন সেটা কোটির ঘরে ঘোরাফেরা করে। প্রায় একশো জন তাঁতিকে তাঁতের নতুন দিগন্তের খোঁজ দিয়েছেন তিনি। ফুলিয়া, শান্তিপুর, বাথনা-কৃত্তিবাস, বাদকুল্লা জুড়ে রয়েছে অসীম বসাকের নিখুঁত কাজের নেটওয়ার্ক। সেই সুবাদে দিনে অন্তত ১০০ টি ওড়না তৈরি হয় অসীম বসাকের তাঁতিদের কাছে। তাঁর ওড়নার কাজ থাকে সারা বছর। সমিতিতে কাজ ক‌রার সময় প্রায় ৩০০ তাঁতিকে পরিচালনা করতেন অসীমবাবু। সেই অভিজ্ঞতাই নতুন পথে তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে।

image


সাধারণ সুতো থেকে শুরু করে রেশম। সবেতেই সমান উজ্জ্বল শান্তিপুর, ফুলিয়ার এই নতুন সাজ। এই মুহূর্তে নদিয়ার দুই প্রতিবেশী জনপ‌দের নানা জায়গায় এখন ওড়নার ঢেউ। এই ওড়নার ইউএসপি হল সুতো। যাতে বিজ্ঞান সম্মতভাবে রং ব্যবহার করা হয়। যা শুধু টেকসই নয়, স্বাস্থ্যসম্মতও। সুতোর বুনোট এতটাই ঠাসা যে ধুলেও রং বদলায় না। গুণবিচারীদের কাছে তাই যথেষ্ট কদর এই ওড়নার। ২০০ টাকা থেকে এখানকার ওড়নার দাম শুরু। যার স‌র্বোচ্চ দর ওঠে ২ থেকে ৩ হাজার টাকায়। শুধু ফুলিয়া থেকে মাসে কয়েক কোটি টাকার ওড়না রফতানি হয়।

image


কলকাতার ল্যান্সডাউন মার্কেট, লর্ড সিনহা রোড, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটে ফুলিয়ার এই উদ্যোগপতির ওড়নার প্রচুর অর্ডার। আর এখান থেকে ওড়না চলে যায় জাপান, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ইতালিতে। বিদেশের চাহিদার সুবাদে ফুলিয়া থেকে মাসে কয়েক কোটি টাকার ওড়না কলকাতার হাত ঘুরে রফতানি হয়। ৩৫ বছরের এই তরুণ যোদ্ধা মধ্যসত্ত্বভোগীদের এই দেওয়ালটা ভাঙতে চাইছেন। তার জন্য দিল্লি, বেঙ্গালুরু, মুম্বইয়ের বাজার ধরার চেষ্টা চলছে। এর জন্য দেশের বড় বড় হস্তশিল্প মেলায় ফুলিয়ার কারুকাজ তুলে ধরতে চান তিনি। বিদেশ জয়ের স্বপ্নও তাঁকে নাড়া দেয়।

শাড়ি তৈরির অনেক হ্যাপা। তুলনায় চার হাতের ওড়নার ঝামেলা অনেক কম। আর মজুরি। শাড়ি বুনলে যেখানে ন্যূনতম ১২০ টাকা মেলে, সেখানে ওড়না পিছু পারিশ্রমিক ৪০-৫০ টাকা। টানা কাজ করলে দিনে একটা শাড়ি হয়। সেখানে দিনে চারটে ওড়না করা কোনও ব্যাপারই নয় তাঁতিদের। তারপর দামি ওড়না বুনলে মোটা পারিশ্রমিকতো আছেই। গতে বাঁধা শাড়ির কাজ ছেড়ে নতুন কাজ মনে ধরেছে অনেকের। ভাল মজুরির টানে মা, বউরাও হেঁশেল সামলে দিব্যি তাঁতে বসে একের পর এক ওড়না বানাচ্ছেন। অর্থনীতির নিয়মে তাই শাড়ি সরিয়ে ওড়নায় মন তাঁতিদের। আর এভাবেই ধীরে ধীরে ভাগীরথীর তীরের জনপদের এসেছে নিঃশব্দ পরিবর্তন।

Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags