সংস্করণ
Bangla

কানসাট: বাংলার মিষ্টি ব্র্যান্ডিংয়ের প্রাচীন স্ট্র্যাটেজি

Tanmay Mukherjee
9th Dec 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

নকুড়ের সন্দেশ। রসগোল্লা মানে কেসি দাশ। অধর দাসের সরভাজা, সরপুরিয়া। ফেলু মোদকের জলভরা তালশাঁস। গাঙ্গুরামের শুকনো সন্দেশ। কলসের দই। মিষ্টির এক এক জগতে এক একজন দড়। কিন্তু রসগোল্লা, সন্দেশ বা দই দিয়ে নিজের দোকানের নাম কখনও কি কেউ দিয়েছেন? কিংবা দোকানে একটি মিষ্টি‌কে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্যদের অচ্ছুৎ করার সাহস দেখিয়েছেন কি কেউ? 

image


আমের রাজ্য মালদহে আছে এমনই এক ঠিকানা। যেখানে মিষ্টির নামেই দোকানের নাম কানসাট। 

ইংরেজবাজারের বিশ্বজিৎ সাহা ও জয়দেব সাহার দোকানে কানসাটেই যত গুরুত্ব। বাকি মিষ্টিরা সেখানে কোণঠাসা। আর এই দোকানে কেবলমাত্র নানা দাম, নানা সাইজের কানসাট পাওয়া যায়। মিষ্টি ব্যবসায় ব্র্যান্ডিং-এর এমন নজির ভূ-ভারতে দ্বিতীয়টা আছে কিনা সন্দেহ। 

ইংরেজবাজারের বিজি রোডের মকদমপুরে কানসাট নিয়ে এমনই কেরামতি দেখিয়েছেন এই দুই ভাই। এই ছকভাঙা পথে নামার পিছনে রয়েছে তাঁদের বাপ-ঠাকুরদার প্রেরণা।

ওপার বাংলার শিবগঞ্জ জেলায় এই মিষ্টির নামে আস্ত একটা জনপদ আছে। নাম কানসাট। পরিচিত চমচম যেমন হয়, অনেকটা তেমনই। সেই কথা পরে আসব। একটু অতীতের কথা বলি। মহেন্দ্রনাথ সাহা তখন শিবগঞ্জের মস্ত মিষ্টি ব্যবসায়ী। বাবার শেখানো পথে এপার বাংলার মালদহে এসে কানসাটের যাত্রা শুরু করেন বিজয় কুমার সাহা। মিষ্টির নাম দিয়ে দোকানের নাম রাখার ভাবনা তাঁরই। সেই ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর দুই পুত্র বিশ্বজিৎ আর জয়দেব।

image


বিজয়কুমারের নিজস্ব রেসিপির কানসাট দ্রুত মালদহের মানুষের মন জয় করে নেয়। যার সুবাদে কানসাট দোকানের নাম ছড়িয়ে পড়ে জেলার বাইরেও। বিজয়বাবুর এই সাফল্য কানসাট তৈরিতে টেনে আনে আরও মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীকে। কিন্তু অনেকে এলেও সেরা থেকে গিয়েছে সাহা ময়রার কানসাট। এই ব্র্যান্ডিং এর পিছনে আছে অনেক রহস্য। বিশ্বজিতবাবুর কথায়, ‘‘তৈরি করার সময় থেকেই অন্য মিষ্টির সঙ্গে কানসাটের পার্থক্য শুরু হয়। উৎকৃষ্ট কানসাটের জন্য হাট থেকে নিজে হাতে ক্ষীর কিনি। ভাল ক্ষীর ছাড়া ভাল কানসাট হয় না।’’ শুধু ক্ষীর জোগাড় করলেই হয় না, আসল রহস্য ‌রয়েছে নাকি আরও এক জায়গায়। বিশ্বজিতবাবুর কথায় শোনা গেল সেই কাহিনি। কাঠের আগুনের উপর নির্ভর করে ছানার তৈরি জালটা কেমন হবে। তার ওপর ভাজা ক্ষীর ছড়িয়ে দিলে তৈরি হয়ে যায় কানসাট। এর জন্যই নাকি সাহাদের দোকানের কানসাট ভাঙলে মৌমাছির জালের মতো অজস্র চাক দেখা যায়। তবে আঁচ ‌কতটা গরম বা ঠান্ডা সেটা বিশ্বজিতবাবুর অভিজ্ঞতায় গাঁথা আছে।

দোকানে গিয়ে দেখা গেল যাঁরা কিনছেন, তাঁরা সাবধানে ভেঙে মুখের ভিতর ফেলছেন। তারপর তৃপ্তির ছোঁয়া। মুষ্টিমেয় কিছু আগন্তুক ছাড়া শহরের বেশিরভাগ মানুষ এই ঘরানার মিষ্টির সঙ্গে পরিচিত। ইংরেজবাজারের অজস্র দোকানে কানসাট পাওয়া যায়। তবে নামের জন্যই এই দোকানের ধার এবং ভার অনে‌কটাই বেশি বলে মানেন এলাকার মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরা। বলা ভাল মালদার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এই দোকান। মালদহে কানসাটের প্রবর্তনও সাহা পরিবারের হাত ধরে।

কানসাটের দৌলতে মালদহের নাম এখন দেশের গণ্ডি ছড়িয়েছে বলে জানান বিশ্বজিতবাবু। তাঁর কথায়, ‘‘এই শহরের বহু মানুষ বিদেশে থাকেন। এদেশের আত্মীয় মারফত আমাদের দোকানের কানসাট তাঁদের কাছে পৌঁছে যায়। এমনকী ইন্দিরা গান্ধিও আমাদের দোকানের কানসাটের স্বাদ পেয়েছেন। গনি খান পরিবারে কোনও ভিআইপি অতিথি এলে কানসাট যায়। গনি সাহেবও কানসাট দারুণ পছন্দ করতেন।’’

তবে সাবেক আমলের দোকানের হাল পাল্টাতে আধুনিকীকরণে কেন নজর দেননি। প্রশ্ন শুনে কিছুটা থেমে তাঁর মন্তব্য, ইচ্ছা করেই করিনি। চেহারা যেমনই হোক না কেন মানুষ তো কানসাটেই মজবে। সত্যিই তো কানসাটের রসে মজে সবাই।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags