সংস্করণ
Bangla

সামান্য জীবন থেকে শুভদীপের মহাজীবন

22nd Dec 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

আজ লক আউট। কাল ছাঁটাই। পরশু সাসপেনশন অব ওয়ার্কের নোটিস। ধুঁকতে ধুঁকতে একেবারে দাঁড়ি। যার ফল অনাহার। মৃত্যুর মিছিল। ডুয়ার্স-তরাই জুড়ে চা বাগানগুলো যত ফ্যাকাসে হচ্ছে তত সক্রিয় হচ্ছে মানব পাচারকারীরা। ঝোপ বুঝে কোপ মারার জন্য তাদের নজরে থাকে সর্বহারা পরিবারগুলো। অভিভাবকদের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের তারা পাঠিয়ে দিচ্ছে দিল্লি, মুম্বই বা কানপুরের কোনও অন্ধগলিতে। এভাবেই একটু একটু করে বিপথগামী হচ্ছে শৈশব। একটি দৈনিক সংবাদপত্রে এই অন্ধকারের বারোমাস্যার খবর বিদ্ধ করেছিল বছর আঠাশের প্রাণবন্তশুভদীপ কে। শুভদীপ মুখার্জি একজন সোশ্যাল আন্ত্রেপ্রেনিওর।

রোজই কত সামাজিক অবক্ষয়ের ছবি আমাদের চোখে ধরা পড়ে। সেগুলোকে কি আমরা কখনও গুরুত্ব দিয়ে দেখি ? নিজের গ্রাম-শহর দূরের কথা, পাশের বাড়ির ছেলে বা মেয়েটা পাচারের কানাগলিতে চলে গেলে আমরা আর কতটা বিচলিত হই। শুভদীপ কখনওই চোখ উল্টে থাকেননি। রাতারাতি সমাজের ছবি বদলে দেওয়ার মতো তাঁর সামর্থ্য নেই জেনেও পিছিয়ে পরেননি। মুখ ফিরিয়ে থাকায় সায় দেয়নি তাঁর বিবেক। গুটি গুটি পায়ে চেষ্টা করেছেন সমস্যার গোড়াটাকে ধরতে। পথভোলা শৈশবকে মূলস্রোতে ফেরাতে তথাকথিত অর্থ দিয়ে ‘সাহায্য’ নয়, তাদের আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দিতে ওই সমস্ত অসহায়দের অন্তরের শক্তিতেই আলো জ্বালিয়েছেন শুভদীপ।

image


সময়টা ছিল ২০১২। পথহারা শৈশবকে মূলস্রোতে ফেরানোর তাগিদ থাকলেও কোনও পথে এগোতে হবে তা নিয়ে রীতিমতো ধন্দে ছিলেন শুভদীপ মুখার্জি। আইবিএমে চাকরির সময় একদিন সল্টলেকের ডিএলএফ বিল্ডিং-এর সামনে একজনকে বাঁশ দিয়ে বানানো নানারকম সামগ্রী বিক্রি করতে দেখেন ওই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। জানতে পারেন ওই বিক্রেতাই সৃষ্টির মূলে। শুভদীপের ম‌নে হয়েছিল উত্তরবঙ্গে তো বাঁশের রমরমা। বনবস্তির ছেলেমেয়েরা নাগালে থাকা বাঁশ দিয়ে কাজ শিখলে স্বনির্ভরতার ভিত তৈরি হতেই পারে। শিল্পীর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান শুভদীপ। একদিন ওই শিল্পীকে নিয়ে অচেনা পথে গা ভাসান তথ্য প্রযুক্তি সংস্থার কর্মী শুভদীপ। জলপাইগুড়ির সাতক্ষীয়া টি গার্ডেন ছিল গন্তব্য। আদিবাসী পরিবারে কয়েক দিসন থেকে শুভদীপ বুঝতে পারেন হারিয়ে যাওয়ার জন্য এপথে নামেননি।

বাঁশ দিয়ে যে এত কিছু করা যায় তা নিয়ে বিস্ময়ের শেষ ছিল না নতুন প্রজন্মের। তাদের হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে ফুলদানি, বাঁশের তৈরি নানারকম অলঙ্কার, মূর্তি, আরও কত কী। এতে কাজের উৎসাহ বেড়ে গেলেও হোঁচট খেতে দেরি হয়নি শুভদীপের। তাঁর ধারণা ছিল হস্তশিল্পের সামগ্রী বিক্রি করতে খুব একটা সমস্যা হবে না। ভাল জিনিস হলেও তাকে বাজারজাত করার পদ্ধতি জানা ছিল না তরুণ উদ্যমীর। বিক্রিটাই যে আসল চ্যালেঞ্জ বুঝতে দেরি হয়নি শুভদীপের। কিন্তু সেটাই ছিল তাঁর কাছে এগিয়ে যাওয়ার মূলধন। এর জন্যল মার্কেটিং—এর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। সবকিছু যাতে সংগঠিতভাবে হয় তার জন্য ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘মহাজীবন’ নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও তিনি তৈরি করেন। পথ চলার শুরুতে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘হে মহাজীবন’ কবিতাই ছিল যার প্রেরণা।

image


‘মহাজীবন’-এর ছাতায়‌ একে একে আসতে শুরু করেন আশিস মিনজ, ওমেগা মিনজরা। মানবতার টানে সেই যে পথ চলা শুরু হল তাতে যোগ দিলেন আরও অনেকে। কেউ বিদেশ থেকে অর্থ দিয়ে সাহায্যে করলেন, কেউ অন্যনভাবে পাশে দাঁড়ালেন। ‘মহাজীবন’—এর ছায়ায় এই মুহূর্তে প্রায় ৫০ জন নানারকম শিল্পকর্ম তুলে ধরেছেন। শিল্পীদের কিছু নতুন ধরনের নকশার হদিশ দিতে হোয়াটসঅ্যা প গ্রুপ করেছেন শুভদীপ। কয়েকজনকে দিয়েছেন ট্যা ব। যে ট্যাশবে ডিজাইনের পাশাপাশি শিক্ষামূলক নানা পরামর্শও থাকে।

আইবিএমের চাকরি ছেড়ে টিএসএসে আসার পর ‘মহাজীবন’ নিয়ে আরও ব্য৪স্ত হয়ে পড়েন শুভদীপ। চালসার পাশাপাশি কালচিনি, আলিপুরদুয়ারের প্রত্য্ন্ত জায়গায় হস্তশিল্পের কাজের প্রসারতা বাড়ে। এমনকী কালিম্পং—এ রাভা উপজাতিদের কাছেও পৌঁছে গিয়েছে ‘মহাজীবন’। এই সব এলাকায় গিয়ে ওমেগা মিনজ প্রশিক্ষণ দেন। আর উৎপাদিত সামগ্রী কলকাতায় এনে বিক্রি করেন তাঁর দাদা আশিস। প্রত্যরন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা আশিসকে কলকাতায় থাকা—খাওয়া—বেতনের ব্যবস্থা করেছেন শুভদীপ। বিক্রির জন্যও নিজস্ব ওয়েবসাইটের পাশাপাশি অনলাইনেও অর্ডার নেয় ‘মহাজীবন’। ডেলিভারির জন্যক বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে যান আশিস, কখনও শুভদীপ। প্রচার ও প্রসারের জন্যা বিভিন্ন সরকারি মেলা, প্রদর্শনীতে পৌঁছে যায় ‘মহাজীবন’—এর টিম। কলকাতার বেশ কিছু নামী হস্তশিল্পের দোকান তাদের সামগ্রী নেয়। পাশাপাশি সরকারি স্তরে পৌঁছাতে নার্বাডের সঙ্গেও যোগাযোগ চলছে।

image


বছর তিনেকের মধ্যে্ চেনা পৃথিবীটা অনেকটা বদলে গিয়েছে আশিস, ওমেগার। আশিসের কথায়, ‘‘আমাদের এলাকায় অনেক চা বাগান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবুও দিল্লি, বম্বে, হরিয়ানায় কাজের জন্য‘ কেউ যাচ্ছে না। হাতের কাজ শিখে সবাই বুঝতে পেরেছে দারুণ কিছু না হলেও খেয়ে পড়ে অন্তত বাঁচতে পারব।’’ ওমেগার বক্তব্যা, ‘‘আমরাও যে কিছু করতে পারি, ‘মহাজীবন’—এর হাত ধরে সেই বিশ্বাসটা জন্মেছে। বহু মানুষ যখন প্রশংসা করেন, তখন বুঝতে পারি ঠিক পথেই এগোচ্ছি।’’

অনেকেই যেমন এগিয়ে এসেছে, তেমন প্রশাসনের কানেও পৌঁছেছে ‘মহাজীবন’—এর উত্তরণের কথা। কিছু দিন আগে জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনের ২৫টি মেশিন দেওয়া হয় শিল্পীদের। যৌথ পরিবারে বড় হওয়ায় শুভদীপ জানেন ভাগ করে থাকার কত আনন্দ। বর্ধমানের ভাতার থেকে চাকরির জন্য এয়ারপোর্ট লাগোয়া এলাকায় চলে এলেও কাকু, জেঠুদের নিয়ে থাকার অভ্যা স বদলায়নি। মূল্যবোধ রয়েছে আগের মতোই। ছকভাঙা পথে নেমে তাই বলে ফেলেন, ‘‘ওদের টাকা—পয়সা দিয়ে পাশে দাঁড়ানো নয়, শিরদাঁড়াটা সোজা হলেই যত শান্তি। মনে হয় কিছুটা পথ পেরোতে পেরেছি।’’ সত্যিতো গদ‍্যের কড়া হাতুড়িকে হানার সময় এসেছে। আজ আর কবিতার স্নিগ্ধতার প্রয়োজন নেই।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags