সংস্করণ
Bangla

কল্কির নতুন 'অবতার'

হৃদয়ের কথাই শোনেন কল্কি। প্রকৃতিকে পরাজিত করে এখন তিনি গর্বিত নারী, রূপান্তরকামীদের প্রতিনিধি এবং লিঙ্গ বৈষম্যের বিরোধী হিসেবে পরিচয় দেন।

24th Aug 2015
Add to
Shares
13
Comments
Share This
Add to
Shares
13
Comments
Share
কল্কি সুব্রহ্মণ্যম

কল্কি সুব্রহ্মণ্যম


নিজের লিঙ্গগত পরিচয় নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত এক কিশোর থেকে এক সফল উদ্যোগপতি, আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় থাকা এক ব্যক্তিত্ব। সর্বোপরি সমাজে অবহেলিত এক শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধি, তাদের ভরসার নাম - কল্কি সুব্রহ্মণ্যম। একটা নয়, তাঁর অনেকগুলো পরিচয়। একাধারে অভিনেত্রী, লেখিকা, উদ্যোগপতি, অন্যদিকে রূপান্তরকামীদের সমানাধিকারের দাবিতে সরব আন্দোলনকারী। এহেন কল্কির নিজের কোন পরিচয়টা সবচেয়ে পছন্দের ? প্রশ্নটা করতেই চটজলদি উত্তর আসে – কল্কি সেই মহিলা, যিনি গর্বের সঙ্গে নিজেকে রূপান্তরকামীদের প্রতিনিধি এবং লিঙ্গ বৈষম্যের বিরোধী হিসেবে পরিচয় দেন।

আলাপ শুরুর সময় তাকে দাম্ভিক মনে হয়েছিল। তবে কথা এগোতেই টের পাওয়া গেল, মনের দিক থেকে কল্কি সুব্রহ্মণ্যম যেন সহজ, সরল এক সাধারণ মেয়ে।

এক তামিল পরিবারে বড় হয়ে ওঠা কল্কি হঠাৎই একদিন আবিস্কার করেন, শারীরিক গঠনের দিক থেকে ছেলে হলেও তাঁর মন, ভাবনাচিন্তা এক নারীর মতো। মেয়েলি বলে, স্কুলে সহপাঠীদের ঠাট্টা-তামাসার পাত্র হয়ে ওঠাটা প্রায় রোজকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর পাঁচজনের চেয়ে আলাদা বলে বড় হয়েও কি এভাবে বিদ্রুপের পাত্র হয়ে উঠতে হবে ! এই সব ভেবে শিউরে উঠতেন বছর ষোলোর কল্কি, হীনমন্যতা এমনভাবে মাথায় চেপে বসেছিল যে আত্মহ্ত্যার কথা পর্যন্ত ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন। 

তারপর একদিন সমস্ত সাহসকে সম্বল করে মা-বাবার কাছে নিজের সমস্যার কথা বললেন। 'আমার কথা শুনে মা-বাবা কেঁদে ফেললেন, আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে ওঁরা আতঙ্কিত ছিলেন। এই দৃশ্য দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল, কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি ওঁদের কথা দিই – আমাকে আমার মতো করে বড় হতে দিলে আমি ওঁদের গর্বিতই করব। মা-বাবা আমার ইচ্ছেপূরণ করেছিলেন। অনেক কঠোর পরিশ্রমের পর আমিও আমার কথা রেখেছি’, আবেগতাড়িত গলায় বলেন কল্কি।


image


কল্কির সাফল্যের তালিকাটা বেশ লম্বা। তিনি ডাকসাইটে লেখক। বিগত এক দশক ধরে তিনি রূপান্তরকামীদের সমানাধিকার নিয়ে লেখালেখি করছেন। রূপান্তর নিয়ে তামিল ভাষায় তাঁর লেখা একটি কবিতার বইও আছে, নাম – কুরি আরুথিয়ান। এই বইটিই লেখক হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে। ইংরেজি ও তামিল, দুই ভাষাতেই লেখেন তিনি।

শিল্পী মানুষ, তাই কল্পনার জগতের সঙ্গে কল্কির আত্মীয়তাটা বড়ই নিবিড়। কিন্তু চমকে যেতে হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের কঠিন দুনিয়ায় নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করতে কল্কির একাগ্রতা দেখে। আগামী দিনে কল্কি অর্গ্যানিক্স নামে রূপচর্চার ভেষজ পণ্যে সংস্থা খুলতে চান। কল্কি সম্পর্কে এত কথা জানার পর তাঁকে অত্যন্ত হিসেবি মানুষ ভাবাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি এমন সিদ্ধান্তে এলে ভুল করবেন। তাঁর একটা অগছালো দিকও আছে। খামখেয়ালি, হঠাৎ হঠাৎ প্রসঙ্গ হারিয়ে ফেলেন, রান্নাটাও ভাল পারেন না, আবার মেজাজও আছে বেশ।

এক বন্ধুকে সাহায্য করতে গিয়েই তাঁর ব্যবসার দুনিয়ায় পদার্পণ। কল্কির সেই শিল্পী বন্ধুটি নিজের তৈরি বাদ্যযন্ত্রের বিপণনের কাজে কল্কির সাহায্য চান। কল্কি নিজের পুঁজি দিয়ে সেই বাদ্যযন্ত্র অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করেন। সেই থেকে শুরু হল কল্কি এন্টারপ্রাইজেস। ‘আয় করা শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই আমি লাভের মুখ দেখলাম, এই সাফল্যে খুব উৎসাহ পেয়েছিলাম। আজ কল্কি এন্টারপ্রাইজ ভাল ব্যবসা করছে, আমার বন্ধুটিও স্বাধীনভাবে কাজ করছে’।

কল্কির মতে, ‘আমাদের মতো বেশিরভাগই ঘরছাড়া, সমাজ আমাদের স্বীকৃতি দেয় না বলেই আমাদের থাকা, খাওয়া, লেখাপড়া – সব বিষয়েই আমরা অবহেলিত’। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই সারা দেশের আপামর রূপান্তরকামীদের দুঃখ, যন্ত্রণা, তাদের প্রতি অবিচারের কথা বুঝতে পারেন কল্কি। তাই রূপান্তরকামীদের সামাজিক স্বীকৃতি দিতে আইন আদালত কম করেননি তিনি। সমাজের এই শ্রেণির জন্য যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেন। রূপান্তরকামীদের ক্ষমতায়ণের লক্ষ্যে কাজ করা স্বেচ্ছেসবী সংস্থা সহদোরী ফাউন্ডেশেনর সঙ্গেও তিনি যুক্ত।

রূপান্তরকামীদের জন্য ২০০৯ সাল থেকে একটি পাত্র-পাত্রী ওয়েবসাইটও চালু করেছেন কল্কি। ২০১১ সালে তামিল ছবি নর্তকী দিয়ে তাঁর সিনেমায় হাতেখড়ি। রূপান্তরকামীদের জীবনীমূলক এই ছবিতে মুখ্য চরিত্রে কল্কির অভিনয় বিশ্বজোড়া সমালোচক ও দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

কল্কি জানেন তিনি আলাদা, কিন্তু তাঁর কাছে জীবনের মন্ত্র খুব সহজ – নিজেকে উজাড় করে দিয়ে নিজের সেরাটা দেওয়া। রূপান্তরকামীদের নিয়ে সমাজের বাঁধাগতের চিন্তাধারা বদলাতে চান তিনি। কল্কির দৃঢ় বিশ্বাস – ‘আমার মতো দ্বিধাগ্রস্ত এক কিশোর নায়িকা হয়ে উঠতে পারলে দুনিয়ায় কোনও কিছুই অসম্ভব নয়’। শুধু প্রয়োজন দৃঢ় সঙ্কল্প আর সাহসিকতা। 

নিজের সাফল্যের পিছনে তাঁর পরিবারের অবদান সবচেয়ে বেশি মনে করেন কল্কি, তাঁর পরিবারই তাঁর চালিকা শক্তি। তাঁর মতে, ব্যর্থতা থেকে হতাশা জন্মায় না, ব্যর্থ হওয়ার ভয়েই হতাশার উৎস।

Add to
Shares
13
Comments
Share This
Add to
Shares
13
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags