সংস্করণ
Bangla

মুখের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে ভাই-বোনের জেহাদ

Tanmay Mukherjee
5th Sep 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

ভাই ইঞ্জিনিয়ার, বোন ডাক্তার। চাইলেই সারাটা জীবন বাতানুকূল অফিস আর গদিওয়ালা চেয়ারের নিশ্চিত চাকরিতেই কাটিয়ে দিতে পারতেন ছত্তিসগঢ়ের ভাইবোন। কিন্তু প্রীতি আদিল চন্দ্রকর এবং প্রবীন আদিল যেন ছকভাঙা গল্পের দুই চরিত্র। সেকেন্ড হ্যান্ড ট্রাকে ডেন্টাল ক্লিনিক গড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে চলেছেন। একটা সময় অনেকেই তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিলেন, তাদের হাসি থামিয়ে ওই ট্রাক হয়ে উঠেছে মুখের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে চলমান জেহাদ। কিংবা দারুন এক স্বপ্ন।

২০০৮ সালে রাজনন্দাগাঁওয়ের সিডিসিআরআই থেকে বিডিএস পাস করেন প্রীতি। ভাই প্রবীন আইআইটি কানপুর থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে কাজ করেন বহুজাতিক সংস্থায়। বেশ কিছু দিন সিঙ্গাপুরে কাটিয়ে দেশে ফিরতেই যেন গল্পে এল নতুন বাঁক। ভাইবোন মিলে ঠিক করলেন, অনেক হয়েছে, এবার ছত্তিসগঢ়ের গরিবগুর্বোদের জন্য ভাল কিছু করা দরকার। প্রবীনের কথায়, ‘‘আমাদের অনেক আত্মীয় যেহেতু গ্রামে থাকেন, তাই ছত্তিসগঢ়ের গ্রামগুলো আমরা ভালই জানতাম। আমাদের বেশ কয়েকজন আত্মীয় মুখের ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলেন। তাই ঠিক করলাম, গ্রামে গিয়ে আমরা মুখের ক্যান্সার এবং দাঁতের চিকিৎসা করব।’’

image


কেনা হল সেকেন্ড হ্যান্ড ট্রাক। তাতে ক্লিনিক গড়ে শুধুই ছুটে বেড়ানো। কাজটা শুনতে হয়তো সোজা, কিন্তু আসলে ভীষণ কঠিন। প্রথমত শহুরে ভাইবোনকে দেখে গ্রামের লোকজন ভয়ে যেন সিঁটিয়ে গেল। কেউ আবার সন্দেহের চোখে বলল, গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার তো দাঁতের ব্যাথা সারাতে ২০ টাকা নেয়। তোমাদের বেশি দেব কেন?

তবুও চেষ্টা। একটু একটু করে যেন খুলতে থাকল বন্ধ দরজাগুলো। একবার যারা চিকিৎসা করালেন, তারা দ্বিতীয়বার এলেন। ছড়াল ভাইবোনের নাম। প্রীতি এবং প্রবীন তাঁদের নিজেদের সংস্থার নাম রেখেছেন ‘ইতিদিরখা’। সংস্কৃত এবং ছত্তিসগঢ়ি ভাষা মেশানো এই শব্দের মানে – ভবিষ্যতের জানালা।

image


গত ২ বছর একটানা কাজ করার সুবাদে প্রবীনের ধারণা, ‘ভারতের গ্রামগুলো মুখের ক্যান্সারের স্বর্গরাজ্য।’ বেশিরভাগ মানুষ দাঁতের যত্ন নেন না। তার ওপর তামাক সেবন। ক্যান্সার যখন শেষ পর্যায়ে, তখন তাঁরা দাক্তারের কাছে যান। গ্রামে-গ্রামে গিয়ে প্রীতি-প্রবীনের গড়া ইতিদিরেখা বলছে, ‘‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর।’’ মুখের ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে হলে তামাক ছাড়ো। দাঁতের যন্ত্রণা হলে এস চিকিসৎকদের কাছে।

image


সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে আসছে হতাশার ছবি। এই বিশাল দেশের বেশিরভাগই গ্রাম, অথচ গ্রামে কাজ করেন দন্তরোগ বিশেষজ্ঞদের মাত্র ১.৫ শতাংশ। বাকি ৯৮.৫ শতাংশ শহরে। প্রশ্ন উঠতে পারে, গ্রামীণ এলাকায় তো সরকারি হাসপাতাল রয়েছে, হয় ক্যাম্প। তবু কেন লাভ হচ্ছে না? প্রবীন বলছেন, দূর-দূরান্তের ক্যাম্প কিংবা হাসপাতালে গিয়ে গ্রামের মানুষেরা তাৎক্ষণিক চিকৎসা পান না। দিন কয়েক ওষুধ খাওয়ার পর, আবার এসে দেখেন যে চিকিৎসকরা বদলে গিয়েছেন। ফলে সরকারি চিকিৎসার প্রতি তাদের আস্থা টলে যায়।

আস্থা অর্জনের জন্য অন্য কৌশল নিয়েছিল ইতিদিরখা।শুরুতেই গ্রামীণ এলাকায় শিবির না করে মফস্বলে খোলা হল ক্লিনিক। খ্যাতি ছড়াতে শুরু করল। বাড়ল অভিজ্ঞতা। এরপর মোবাইল ক্লিনিক নিয়ে ট্রাক ছুটল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। চিকিৎসার খরচ নামমাত্র। গ্রামের মানুষদের দেওয়া হয় কার্ড। চাইলে তারা মফস্বলে ইতিদিরখার ক্লিনিকে যেতে পারেন, আসতে পারেন শিবিরেও।

image


ইতিদির‌খায় যারা চিকিৎসা নিতে আসেন, তাদের বাড়িতে ভাত বাড়ন্ত। সেজন্য চিকিৎসার খরচ কম রাখা হয়েছে। সম্প্রতি তাদের কম দামে ওষুধ দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। প্রবীন জানিয়েছেন, তাদের সঙ্গে বেশ কয়েকটা ওষুধ কোম্পানি এবং অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে কথা চলছে। ইতিমধ্যে সাহায্যও করছে বেশ কয়েকটি সংস্থা। তবে কম খরচে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ইতিদিরখা দরকারে আরও গাঁটছাড়া বাঁধতে রাজি আছে।

মূল্যবৃদ্ধি রয়েছে, তেলের খরচ বাড়ছে। সঙ্গে এবড়ো-খেবড়ো পথের সমস্যা। ছোট-বড় টিলার পাশ দিয়ে প্রবীন এবং প্রতীর স্বপ্নের ট্রাক যখন ছোটে, সে সময় পথের ধুলো যেন হয়ে ওঠে স্বপ্নের রেনু হয়ে। ইতিদিরখা মানেই তো ভবিষ্যতের জানালা। হয়তো, সেই জানালা দিয়েই ছত্তিসগঢ়ের ভাই-বোন দেখতে পান ক্যান্সারহীন পৃথিবীর স্বপ্ন।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags