সংস্করণ
Bangla

জীবনকে সহজ করে দেখতে শেখান স্বপ্না ভাবনানি

Bidisha Banerjee
16th Sep 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

তাঁর কাছে সৌন্দর্য মানে, নিজেকে অন্যরকমভাবে দেখতে এবং দেখাতে শেখা। মাথার ছোট চুল থেকে শুরু করে গায়ে হরেক ডিজাইনের ট্যাটু - স্বপ্না ভাবনানির কোনওকিছুই যেন আর পাঁচজনের মতো নয়। আর ঠিক এই কারণেই তিনি আলাদা। অন্যরকমভাবে সুন্দর। সদাহাস্য, প্রতিভাবান, চঞ্চল, উন্মত্ত - এর কোনও একটি বিশেষণ বৈচিত্র্যময়ী এই মহিলাকে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয়। স্বপ্নার স্টাইলের মতোই অন্যরকম তাঁর জীবনের কাহিনীও। সেই কারণেই তাঁর বিষয়ে আরও জানতে চাইলাম আমরা। মুম্বইয়ে বেড়ে ওঠা স্বপ্নার। ব্রিচ ক্যান্ডি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর বান্দ্রা চলে আসেন তিনি। এই বান্দ্রার অলিতে গলিতে সাইকেল চালিয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েই স্বপ্নার বেড়ে ওঠা। 'সত্তরের দশকে বড় হওয়ার জন্য বেশ সুন্দর জায়গা ছিল বান্দ্রা,' বললেন স্বপ্না। সেই সময় থেকেই তিনি সকলের চেয়ে আলাদা। ছোট করে চুল কাটতেন, শর্ট স্কার্ট পড়তেন, ধূমপান করতেন। বহু ছেলে তাঁর বন্ধু ছিল। তখনকার দিনে মেয়েরা যা যা করার সাহস পেতেন না, সেই সবই করতেন স্বপ্না। তাঁর মতে, এভাবেই তাঁর নিজেকে চিনতে শেখার শুরু।

image


যে সারল্যের সঙ্গে স্বপ্না কোনও কিছুর পরোয়া না করেই জীবনের সহজপাঠ শিখেছিলেন তা-ই তাঁর ব্যক্তিত্বকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। স্বপ্না জানালেন,'মেয়েদের স্কুলে পড়লেও ছেলেদের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব ছিল আমার। ওদের কাছ থেকে যখন বাইক চালাতে শিখলাম তখনই প্রথম বুঝলাম জীবনে কত কী জানার আছে!'

স্বপ্নার কাছে জীবন একটা গল্পের মতো। 'দিদিমা আমাকে অনেক গল্প বলতেন। আমি জানিনা সেগুলো আদৌ সত্যি কিনা। কিন্তু আমার সেগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগতো।' দিদিমার বলা অনেক গল্প তিনি ভুলতে পারেননি। তখন থেকেই স্বপ্না বহু নাটুকে এবং উত্তেজনাপূর্ণ কাজ করতে চাইতেন, যাতে তাঁর জীবনের গল্পও চমকপ্রদ হয়ে উঠতে পারে। এরই মাঝে স্বপ্না বলে ওঠেন,'জানেন, এখন আমার মনে হয় আমি ঠিক যা ভাবতাম তাই-ই হয়েছে। এই যে আমার ট্যাটুগুলো, এগুলোর প্রত্যেকটাই তো আসলে একটা করে গল্প বলে। দিদিমা কেবলমাত্র গল্প বলতেন। আর আমার জীবনের প্রত্যেকটা অভিজ্ঞতাই তো এক একটা গল্প।'

১৯৮৯ সালের একটি ঘটনা স্বপ্না ভাবনানির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বাবাকে হারান স্বপ্না। প্রচণ্ড জেদী, বিদ্রোহী এই মেয়েটিকে একা বড় করতে ভরসা পাননি তাঁর মা। মাসির সঙ্গে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অনেকেরই ধারণা, বিদেশে ১৪ বছর কাটানোর ফলেই স্বপ্নার ভাবনাচিন্তা, জীবনযাপন এত অন্যরকম। যদিও স্বপ্নার ধারণা, শিকাগোয় থাকার ফলে তাঁর এমন অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে যা হয়তো এদেশে থাকলে হত না। তবে তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, ভেতরের মানুষটা কোনওদিনই বদলাতো না। শিকাগোয় থাকাকালীনই স্বপ্না ফ্যাশন নিয়ে পড়াশুনো করেন এবং স্টাইলিস্ট হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। এরপর মুম্বই ফেরেন তিনি।

image


সেই সময় ভারতে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এভাবে বেড়ে ওঠেনি। স্বপ্নাও বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী করবেন। নিজের চুলের স্টাইল নিয়ে চিরকাল নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাই হঠাৎই মনে হল, হেয়ার স্টাইলিংই তাঁর জন্য আদর্শ কাজ। ভারতের অন্যতম খ্যাতনামা হেয়ার স্টাইলিস্ট অধুনা আখতারের কাছে কাজ শিখতে শুরু করলেন। আরও ভালো করে কাজ শিখতে ফের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ট্রেনিং নিলেন। তবে স্বপ্না ভাবনানির নিজের স্যালোঁ খুলতে চাওয়ার কারণটাও বেশ অন্যরকম। 'একদিন অধুনা ঠিক করলেন তাঁর সঙ্গে যারা কাজ করেন সেই সব স্টাইলিস্টকে ইউনিফর্ম পরতে হবে। কথাটা আমার মোটেই পছন্দ হয়নি। এরপরই ঠিক করি, আর কারও অধীনে নয়, আমি নিজের স্যালোঁ করব।' এভাবেই তাঁর স্যালোঁ 'ম্যাড ও ওয়াট'-এর জন্ম। যদিও স্বপ্না বোঝেন, কেন অধিকাংশ বড় স্যালোঁয় নির্দিষ্ট ড্রেস কোড রয়েছে, তবে তাঁর মতে কোনও সৃজনশীল ব্যক্তিকে এভাবে নিয়মে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়।

আজ স্বপ্না এদেশের অন্যতম জনপ্রিয় হেয়ার স্টাইলিস্টদের একজন। মহেন্দ্র সিং ধোনি, প্রিয়ঙ্কা চোপড়া, রনবীর সিংয়ের মতো বহু তারকাই তাঁর ক্লায়েন্ট।

image


স্বপ্না মনে করেন 'নিজের প্রতি সৎ থাকাই সবচেয়ে বড় উদাহরণ যা আপনি তৈরি করতে পারেন।' মহিলাদের স্বাবলম্বী করে তোলার বহু প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। অ্যাসিড হামলার শিকার মহিলাদের নিয়ে গড়ে তোলা ক্যাফে 'শিরোজ'(Sheroes)-এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন স্বপ্না ভাবনানি। মহারাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি পিছিয়ে পড়া গ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন তিনি। এইসব গ্রামে তিনি নিজ উদ্যোগে শিশুদের জন্য স্কুল এবং মহিলাদের স্বনির্ভর করে তোলার বেশ কিছু প্রকল্প গড়ে তুলেছেন। কিছুদিনের মধ্যেই 'I have a dream' নামের একটি ক্যাম্পেন শুরু করতে চলেছেন স্বপ্না ভাবনানি। অ্যাসিড হামলার শিকার তরুণীরা যাতে কারও সাহায্য ছাড়াই মাথা উঁচু করে সমাজে বাঁচতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই এই ক্যাম্পেনের উদ্দেশ্য।

ছোট থেকেই এমন কিছু ঘটনা তাঁর সঙ্গে ঘটেছে যা স্বপ্নাকে আজও তাড়া করে বেড়ায়। তিনি চিরকালই নিজের মতো। অন্যদের থেকে একটু অন্যরকম। সেই কারণেই কি তাঁকে এদেশে 'অবাঞ্ছিত' বলা হয়েছিল? শুনতে হয়েছিল তিনি আসলে একজন 'পতিতা'? এর কোনওটারই উত্তর স্বপ্না ভাবনানির জানা নেই। তবে এখন আর কে কী বলল তা নিয়ে ভাবেন না তিনি। সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণার বিদ্রোহ করা আর অন্যরকম কিছু করতে চাওয়া, দুয়ের মধ্যে যে তফাত রয়েছে তা অনেকেই বোঝেন না। তবে স্বপ্না এজগতের কোনও নিয়মে পরিবর্তন চান না। তিনি শুধু জানেন, 'ভালো কাজ করে যেতে হবে। তাহলেই ভালো ফল মিলবে।' তাঁর জীবনে একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার পিছনে যোগাসনের অনেকখানি ভূমিকা আছে বলে মনে করেন স্বপ্না।

ভালো-মন্দ মিশিয়ে নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। সেগুলোকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন স্বপ্না। তিনি নিজেকে এবং অন্যদের ভালোবাসতে শেখান, নতুনকে খুঁজতে শেখান। তিনি বিশ্বাস করেন, 'ঈশ্বরকে আলাদা করে খুঁজে নিতে হয় না। নিজের মধ্যে যে ঈশ্বর বাস করছেন তাঁকে খুঁজে পাওয়াই আসল।'

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags