সংস্করণ
Bangla

লুকিয়ে কাজ শিখেছেন প্রতিমা শিল্পী সুদীপ কর্মকার

15th Oct 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

ছোটবেলা থেকে দেখে শেখার একটা ঝোঁক ছিলই। আর ছিল আঁকার অসাধারণ হাত। কাঁটাতার থেকে এক কিলোমিটার।বনগাঁর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে সুদীপ কর্মকার। চলুন শোনা যাক তার প্রতিমা শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প।

image


বাবা সুকুমার কর্মকারের এক ফালি জমি। তাতে চাষবাস করে টেনেটুনে সংসার চলে। আর রামায়নের গান বাঁধেন। রামায়ন শিল্পী নামেও পরিচিতি আছে তাঁর। যা রোজগার তাতে স্ত্রী, এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে কোনওরকমে চলে যায়। ছেলে সুদীপ ছোট বেলা থেকে আর দশটা ছেলেমেয়ের থেকে একটু যেন আলাদা। কাগজ আর পেন্সিল পেলেই আর কিছু চাই না। দিন কেটে যায় ওই নিয়েই। আর ঝোঁক ছিল তাল তাল মাটি নিয়ে কীসব বানিয়ে ফেলত মন থেকে। ঘাটবাউড়ি আদর্শ উচ্চবিদ্যালে সুদীপ তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। বনগাঁয় টিউশন নিতে যেতে হত। পথেই পড়ত বনগাঁর বিখ্যাত প্রতিমা শিল্পী স্বপণ ভট্টাচার্যের স্টুডিও। পুজোর আগে আগে নানা মূর্তি গড়ে চলেছেন স্বপণবাবু। আর সুদীপের পড়া তখন মাথায়। স্টুডিওর এক চিলতে ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকত শিল্পীর হাতের দিকে। দেখত কীভাবে খড়, কাঠামো আর মাটির তাল শিল্পীর হাতে নানা রূপ পাচ্ছে। কোনও রকমে বাড়ি ছুটে এসে বইপত্র ফেলেই বসে পড়ত কাদা মাটি নিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত দেখে আসা সেই শিল্পীর মতো করে প্রতিমা তৈরির চেষ্টায়। সেই শুরু। চেষ্টা বৃথা যায়নি সুদীপের। বছর উনিশের যুবক সুদীপ এখন পেশাদার প্রতিমা শিল্পী।

পেশাদার শিল্পী হলেও পড়শোনায় ছেদ পড়েনি। বনগাঁর চড়ুইগাছি এলাকার বাসিন্দা সুদীপ দীনবন্ধু মহাবিদ্যালয়ে বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র। ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময় থেকে প্রতিমা গড়ছেন। মাকেও শিখিয়েছেন প্রতিমা গড়া। দাদার হাতেই মূর্তি বানানোয় হাতেখড়ি বোন সুপর্ণা কর্মকারের। বাবা সুকুমার কর্মকার ছেলের আদেশের অপেক্ষায় থাকেন। প্রতিমা তৈরির জন্য কাঠামোটা উনিই তৈরি বানিয়ে দেন। ছেলেকে গুরু হিসেবে পেয়ে গর্বিত মা পাঁচি কর্মকার। বলেন, ‘আমি ছেলের কাছে প্রতিমা গড়ার কাজ শিখেছি। ছোটবেলা থেকে ভালো আঁকতে পারত ছেলে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল ও নিজে কিছু বানাক। আজ ছেলের তৈরি প্রতিমা দেখে সবাই যখন প্রশংসা করে গর্বে বুক ফুলে ওঠে’।

image


পুজো এলেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় বনগাঁর এই যুবকের। শুধু সুদীপ কেন, গোটা কর্মকার পরিবারের তখন নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। এবারের পুজোয় পাঁচটা প্রতিমা গড়েছেন সুদীপ। জায়গার অভাবে বেশি প্রতিমার বরাত নিতে পারেন না। একটা ঘরেই সবার থাকা। বারান্দায় রান্না। বাড়ির দুপাশে ছোট দুটুকরো ফাঁকা জায়গায় কোনও রকমে কাজ করেন সুদীপ আর তাঁর মা। সুদীপ বলেন, ‘বাড়িতে জায়গা কম। ইচ্ছে হলেও বেশি কাজ নিতে পারি না। একটু জায়গা পেলে স্টুডিওটা আরও বড় করার ইচ্ছে আছে’। বাবার চাষবাস আর সুদীপের খান কয়েক প্রতিমা বানানো ছাড়া বাড়িতে তেমন আর রোজগার নেই। তাই পরিবারে স্বচ্ছলতা আনতে প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি আলোকসজ্জার ডিজাইন আঁকার কাজও করছেন সুদীপ। ছোট বোন সুপর্ণা প্রতিমার শাড়িতে কল্কা আঁকে। ক্লাস টেনের ছাত্রী সুপর্ণার কথায়, ‘দাদাকে ঠাকুর বানাতে সাহায্য করতে বেশ লাগে আমার’। এর মধ্যেই সময়করে আঁকা শেখান খুদেদের। ২৫ থেকে ৩০ জন ছাত্রছাত্রী আঁকা শেখে সুদীপ্তর কাছে।

সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠান থেকে শিল্পকলায় ডিগ্রি কোর্স করার ইচ্ছে আছে বনগাঁর এই তরুণ শিল্পীর। সুদীপ বলেন, ‘আমি পড়তে গিয়ে প্রতিমা শিল্পী স্বপণ ভট্টাচার্যের প্রতিমা গড়া দেখতাম। উনিই আমার গুরু। এখন সবাই যখন আমার প্রতিমা দেখে প্রশংসা করে মনে হয় সেই দিনের লুকিয়ে শেখাটা সার্থক হয়েছে’। শিল্পী সুদীপ কর্মকার বনগাঁ এমনকী রাজ্যের সেরা প্রতিমা শিল্পীদের একজন। প্রতিমার চোখ আঁকায় এই শিল্পীর হাতযশ কারও অজানা নয়। লুকিয়ে তাঁর কাজ দেখে প্রতিমা বানানো শেখা শিল্পী স্বপণ ভট্টাচার্যকেও রীতিমতো অবাক করে দিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘আমার থেকেও বড় শিল্পী হোক সুদীপ। লোকে আরও বেশি করে চিনুক ওকে’।

মা ও ছেলের যুগলবন্দিতে ফুটে ওঠে দেবীর মৃণ্ময়ী রূপ। প্রতিম গড়ার মধ্যে দিয়েই একলব্য সুদীপ যেন গুরুদক্ষিণা দেন দ্রোণাচার্য স্বপণ ভট্টাচার্যকে।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags