সংস্করণ
Bangla

‘খুঁজতে খুঁজতে এত দূর’

12th Oct 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

বিজ্ঞানী স্বপন সেন। আজীবন বিজ্ঞান সাধনায সঁপে দিয়েছেন নিজেকে। পদার্থ বিজ্ঞান চর্চার পাশাপাশি পাখির প্রতি স্বপন সেনের আগ্রহ এবং ভালবাসা সেই ছোটবেলা থেকে। উত্তর বিহারের পাহাড়ি বনাঞ্চলে প্রকৃতির কোলে বড় হতে হতেই চিনে নিয়েছিলেন নিজের জগ। কলকাতার নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও আজও প্রকৃতি পাঠে অবিচল অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী। অবসরের আগে পর্যন্ত নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন গবেষণার কাজে। কলকাতার সাহা ইন্সটিউটে গবেষণার বিষয় ছিল নিউক্লিয়র ইলেট্রনিকস। ১৯৯৩ সালে ভারত এবং সার্ন ( জেনেভা)-এর যৌথ উদ্যোগে ডিটেক্টর চিফ ডেভলেপমেন্ট-এর দায়িত্ব পান। যার সুবাদে ‘মানাস চিফ ডেভেলপমেন্ট’-এর ডিজাইনিং এর ভার সামলেছিলেন তিনি। তাঁর হাতেই ভারতে প্রথম মিক্সড অ্যানালগ - ডিজিটাল চিপ, এখনও যা বিগ ব্যাঙ নামে পরীক্ষায় কাজ করে চলেছে।


image


সল্টলেকের সাহা ইন্সটিটিউটের জানলা দিযে বহু বার তাঁর চোখ খুঁজে নিত সবুজ গাছ-গাছালি। তখন পদার্থ ছেড়ে মন যেত প্রাণের কাছে। সবুজ গাছ শুধু নয়, গাছের ডালে ডালে দেখা যেত রঙবেরঙের পাখি। তখনই কিছুক্ষণের জন্য তুলে নিতেন দূরবীন বা ক্যামেরা। দূরবীনে চোখ লাগিযে দেখতেন বসন্তগৌরী কিংবা কন্ঠীঘুঘু। দূরবীনে পাখি দেখতে দেখতে কখনও পৌঁছে যেতেন দূর অতীতে। ছেলেবেলায়। মুঙ্গের জেলার জামালপুরে জন্ম। রুক্ষ্ম, শুষ্ক জায়াগাতেই বেড়ে ওঠা। ছিল না পুকুর। তাই পাখির আনাগোনা তেমন ছিল না। দু-একটি যা ছিল তাদের ঘিরেই কচি মনে তোলপাড় শুরু হয় শিশু বয়সেই। স্বপনবাবুর কথায় আমায় টানতো তাদের বিচিত্র ওড়ার ভঙ্গি। পাখির ভঙ্গি, পাখির ডাক, তাদের ছলাকলা, সবই ছিল তাঁর বিস্ময়ের কারণ। ক্লাস এইটে পড়ার সময বাবাকে হারালেন। কাক-চড়াই বাদ দিয়ে বাবাই তাঁকে প্রথম চিনিয়ে ছিলেন নীলকণ্ঠ পাখি।


image


বাবার মৃত্যুর পর মাইগ্রেট পাখির মতো এবার যাযাবার হওয়া। জামালপুর থেকে নৈহাটি। রুক্ষ্ম মাটি ছেড়ে, সবুজ ভেজা মাটিতে। স্যাঁতস্যাঁতে শ্যাওলা ধরা গাছের কাণ্ডে ঠক ঠক শব্দ করে কাঠঠোকরা। পুকুরে পানকৌড়ির ডুব সাঁতার। এসবেই ডুব দিতেন সেদিনের অঙ্কের প্রিয় ছাত্র স্বপন সেন। অঙ্কই তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল। কলেজে পছন্দের অঙ্ক নিয়ে ভর্তি হতে যান। বাদ সাধেন অধ্যাপক মহাশয়। ‘বেশি নম্বর পেয়েছ বলেই অঙ্ক নিযে পড়তে হবে। অঙ্ক নয় তুমি পড়বে ফিজিক্স নিয়ে।’ সেই শুরু পদার্থ বিদ্যার অন্দরে ঢোকা। শুরু জীবনের সঙ্গে লড়াই। বর্ধমানে এমএসসি পড়ার সময নৈহাটি থেকে বর্ধমানে যাতায়াত করতেন তিনি। এখানে বাধা হয়েছিল অর্থ। বিশ্ববিদ্যালয যাওয়ার পথে নিজের পড়ার খরচ তোলার জন্য ট্রেনের কামরাতেই লজেন্স বিক্রি করতেন। এভাবে ৬ মাস। অধ্যাপকগণ সেদিনের স্বপনকে কল্যাণীতে স্থানান্ত‌রিত করে দেন। এরপর এমএসসি পাশ করে ব্যাঙ্কের চাকরি নিলেন। না হলে সংসারের কী হবে? পাখিদের মতো পরিবারের সঙ্গে তিনি মিলেমিশে থাকতে ভালোবসেন যে। ততদিনে তাঁর মাথার মধ্যে পদার্থ বিদ্যার অণু-পরমাণু বিস্তার করে ফেলেছে। ব্যাঙ্কের সহকর্মীরা সেকথা বুঝতে পারছিলেন। তাঁরাও বলতেন ব্যাঙ্কের চাকরি তোমার জন্য নয়। স্বপনের ভিতরটাও ছটফট করছিল। ডানা ঝাপটাছিল পাখির মতোই। একদিন ডাক এল সাহা ইন্সটটিউট থেকে। গবেষণার কাজে যোগ দেওয়ার জন্য। একদিকে সংসার, অন্যদিকে মনের তাগিদ। দুয়ের টানাপোড়নে শেষ পর্যন্ত জিতল মন। শুরু করলেন গবেষণার কাজ। মাঝে সে কাজেও বাধা পড়েছিল। পাঁচ বছর শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতার কাজ করেছিলেন। সকালে শিক্ষা ভবনে অধ্যাপনার কাজ শেষ হলেই, দুপুরে সাইকেল নিযে টোটো। যেন বিশঅভারতীর ছাত্র তিনি। স্বপন সেনের নিজের কথায, ‘ছাত্র-ই তো’।


image


আসলে বিশ্ব প্রকৃতির ছাত্র তিনি। পাখির সঙ্গে দিন যাপন শুরু। ফটিকজল, দুধরাজ বা শা-বুলবুল দেখাচ্ছিল বড় এক অভিজ্ঞতা। এ জীবনে সব ঋতুকে চেটেপুটে তিনি দেখেছেন শান্তিনিকেতনে। লাল মাটির দেশে পাঁচ বছর কাটিযে ফের ফিরে এলেন সাহা ইন্সটিউটে। এরপর খানিকটা থিতু জীবন। বাগুইআটির বাড়ি থেকে সল্টলেকের কর্মজীবনে। যাতায়াতের পথেই দেখতে শুরু করলেন ফিঙে, হাঁড়িচাচা, বুলবুলি, দুর্গা টুনটনি, দোয়েল, কখনও পথ ভোলা বসন্তগৌরী। পদার্থ বিদ্যা নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি চলল পাখি নিয়ে গবেষনার কাজ। প্রথম বিদেশ ভ্রমণে কিনেছিলেন দূরবীন। তারপর ক্যামেরা। ডার্করুমের কাজেও হাত পাকিয়ে ছিলেন কিছুদিন। তবে অ্যানলগ-ডিজিটাল চিপ নিয়ে যে মানুষ কাজ করেছেন তিনি তো জানেন ডিজিটাল ক্যামেরার সুবিধা কী কী? সংসার সামলে কিনে ফেললেন ডিজিটাল ক্যামেরা। শুরু হল পুরোমাত্রায় পাখির ছবি তোলার কাজ। যা তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রে কাজে লাগল। ছুটির দিনগুলোয় বেরিয়ে পড়তেন ক্যামেরা কাঁধে করে। কখনও কুলিক, কখনও বা ভরতপুর। বহু বছর এভাবেই সামলেছেন দুটি বিষয়কে। আসলে বিজ্ঞানী স্বপন সেনের কথায়, ‘ছোটবেলা থেকেই একটা অনুসন্ধিৎসু মন ছিল আমার। সেই মনই বিষয়ের গভীরে নিয়ে যাই। যা আলাদা করে ভাবতে শেখায়। বিষয়কে কেন্দ্র করেই শুরু হয় খোঁজার পর্ব।’ কবি অরুন মিত্রের ভাষায ‘খুঁজতে খুঁজতে এত দূর’।


image


অবসরগ্রহণের পর পাখি নিয়ে তাঁর জীবন শুরু হল। পাখি দেখা আর ছবি তোলার কারণে ছুটে যেতে হয় গুজরাট, উত্তরাখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, অসম, কর্নাটক বহু জায়গাতেই। এর সঙ্গে এ রাজ্য তো আছেই। শুধু নিজের রাজ্য নয়, নিজের বাড়িতেও ছাদে, বারা‌ন্দায় সাজিয়ে রেখেছেন পাখিদের উপযোগী যাবতীয় ব্যবস্থা। তারা ইচ্ছেমতো আসে যায়। কেউ কেউ ডিমও পাড়ে। প্রায় হারিয়ে যাওয়া চড়াই বেড়েছে স্বপনবাবুর আশ্রয়ে। তাঁরই জন্য। এভাবে কাজ করতে করতে প্রচুর পরিশ্রম করে লিখে ফেললেন ‘পাখির বই’। বাংলার পাখি দেখার পূর্নাঙ্গ ফিল্ড গাইড। যা প্রকাশিত হয়েছে ইউব্যাক থেকে। এই প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে প্রায় ১০টি বার্ড ক্যাম্পেও গেছেন স্বপনবাবু। এ বইয়ে মোট ২১০টি প্রজাতির পাখির বর্ণনা আছে‌। প্রতিটি প্রজাতির আচরণ পরিচায়ক চিহ্ন, উড়ানের ভঙ্গি, বিশেষ করে তাদের ডাকও গানের কম্পাঙ্ক অনুসারে বিশ্লেষণ আর বর্ণনা দেওযা হয়েছে। কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ৬৭ বছর বয়সেও পরিবার ও নাতনির সঙ্গে কাটিয়ে বাকি সমযটা তিনি বরাদ্দ রেখেছেন পাখির জন্যই। গবেষণার কাজ আজ তার ঘরের ভিতরেই। পাখির ডানায় ভর করে মুঙ্গের থেকে যে ছুট শুরু হয়েছিল সে দৌড় আজও থামেনি মনের ভিতর। নতুন পাখি দেখলেই দ্রুত ছবি এঁকে ফেলেন হুবহু। তোলেন ছবি। শুরু হয় বহু বই নিযে পড়াশোনা। এর মধ্যেই পরবর্তী বইয়ের প্রস্তুতির কাজ করে চলেছেন এভাবেই। বিজ্ঞানী স্বপন সেন, পদার্থ বিদ্যায তাঁর কাজ পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্ব দরবারে। এবার বিশ্ব প্রকৃতির আঙিনায় মেলে ধরেছেন নিজেকে। ছোট ছোট পাখি গুলোর ডানা ঝাপটানোর শব্দতেই তিনি রেখে দিয়েছেন সযত্নে তাঁর ছোটবেলাকে।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags