সংস্করণ
Bangla

টালমাটাল রিওয় দারুণ জমেছে অলিম্পিকের সাম্বা

25th Jun 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

ডিওডোরো। রিও দে জেনেইরোর পশ্চিমের একটি শহরতলি। চারদিকে দারিদ্রের ছাপ। সরু সরু গলি। ঢালাই করা রাস্তার কোনায় কোনায় আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে। রাস্তার পাড়ে বাড়ি গুলোর হালও তথৈবচ। কোনওটার মাথায় টিনের চালা। কোথাও আবার ঢেউ খেলানো টালি। বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টও আছে যেগুলোর দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘরে গোটা পরিবার রাতে মাথা গোঁজে। সারাদিন খেটে মরে। সন্ধ্যায় নেশায় বুঁদ হয়ে ফেরে। ঘরের জানলা থেকে জামা কাপড় কেপ্রি ঝুলতে থাকে। কারও কারও জানালায় ছেড়া পর্দা। কিন্তু সাদা ক্রচেটের কাজ করা সেই সব ঝালরের মতো ঝোলে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর। রাস্তার আকাশ ঢেকে রেখেছে ইলেকট্রিকের তার, টেলিফোনের কেবল, টেলিভিশনের কেবল, ইন্টারনেটের লাইন। কোথাও কোথাও সারা বছরই ঝোলানো ব্রাজিলের পতাকা। এসব রাস্তা দিয়েই কার্নিভালের জন্যে মেয়েরা সেজে গুজে যায় রিও। খেলা থাকলে ব্রাজিলের জন্যে গলা ফাটায় এসব গলির রোমিওরাই। সারাদিনই পায়ে ফুটবল নিয়ে ছেলেরা ছুটছে। আর এই সব গলি গুলো ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে প্রধান রাস্তায়। বড় রাস্তাগুলো ঢেউ তুলে দৌড়চ্ছে রিওর দিকে।

image


দিগন্ত রেখায় পাহাড়ের উঁচুনিচু মাথা। নীল আকাশে, গাঢ় নীলের সেই কোরাস কেউ আর আলাদা করে নজর করে না। আর এই সবের ফাঁক ফোকর গলে ডিওডোরোর ফুসফুসে সমুদ্রের হাওয়া ঢোকে হুহু করে। সারাদিন সাম্বা নাচছে ঝিরিঝিরি পাতার পথতরু। শনশন আওয়াজ করে সঙ্গত দিচ্ছে লম্বা লম্বা পাম ট্রি। আর টানা টানা ইলেকট্রিকের তার একের পর এক গলিতে আলো জ্বালতে জ্বালতে দৌড়চ্ছে গোটা শহরটায়। এই শহরের মেয়ে এলজা কোহেন। ছবি তোলার শখ সেই ছোট্ট বেলা থেকেই। রঙ, রঙের কারুকার্য, ছবির নানা রকম এফেক্ট এসব নিয়েই তাঁর যত পরীক্ষা নিরীক্ষা। ভারতে বহুবার এসেছেন। ভারত তাঁর আকর্ষণের অন্যতম বিন্দু। বন্ধুদের নিয়ে এবার এসেছেন ভারতকে চিনবেন। কথা হচ্ছিল। জানলাম রিওর হাল হকিকত।

২০১৪ সালের ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলে ডিওডোরোর স্টেডিয়াম গমগম করেছে। এবার অলিম্পিকের জন্যে ফের তৈরি হচ্ছে ডিওডোরো। এলজা বলছিলেন কাজ দারুণ এগোচ্ছে। অগাস্টেই সামার অলিম্পিক। বাররার অলিম্পিক ভিলেজের থেকেও ডিওডোরোর কাজের গতি অনেকটাই বেশি। কারণ ৬০ শতাংশ বাড়ি আগে থেকেই এখানে ছিল। নতুন করে কিছু রেসিডেন্সিয়াল অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি হচ্ছে। ব্রাজিল সরকার সেগুলো অলিম্পিক মিটে গেলে সাধারণ মানুষের থাকার জন্যে দেবে বলে কথা দিয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্র বন্দরটাও নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। গুয়ানাবারা বে কে পরিষ্কার করা হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনা আর দূষণে নষ্ট হতে থাকা এই খাড়ির বাস্তুতন্ত্র ফের ফিরিয়ে দেওয়া যায় কিনা তার চেষ্টাও করছে ব্রাজিল সরকার।

image


এলজা আশাবাদী। বলছিলেন মেয়র এডুয়ার্ডো পেজও ভীষণ আশাবাদী। তবে বাস্তব ছবিটাও ভুললে চলবে না। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় কোমর ভেঙে গিয়েছিল ব্রাজিলের। সাড়ে আটশ কোটি ইউরো খরচ হয়েছিল। রিওর রাস্তায় হুড়মুড়িয়ে নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছিল গোটা ব্রাজিল। এখনও সেই ঘা শুকোয়নি। তার ওপর অলিম্পিক। এখনও পর্যন্ত যা বোঝা যাচ্ছে খরচ প্রায় ন’শ কোটি ইউরোর ধাক্কা। তার ওপর মারণ ব্যাধি জাইকাও উঁকি দিচ্ছে। চ্যালেঞ্জটা নিচ্ছেন মেয়র সাহেব। বলছেন অলিম্পিক একটা টাইমলাইন বেঁধে দিয়েছে। উন্নয়ন আমাদের করতেই হত। একটা অলিম্পিক মানে ব্রাজিলের অনেক বাইরে মানুষের আনাগোনা। একটা স্পোর্টস ইভেন্ট মানে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ঢুকবে। আর তাই চ্যালেঞ্জটা নিতে তৈরি হচ্ছে ব্রাজিল। 

কিন্তু জানবেন রিও এমন একটা শহর যেখানে অনেক রকম মতের মানুষ আছেন। রাজনৈতিক ভাবে, অর্থনৈতিক ভাবে এবং সামাজিকভাবে রিও দে জেনেইরো শতধা বিভক্ত। সবসময় উত্তেজনা রয়েছে। এলজার শহর ডিওডোরোর কথাই ধরুন। বলছিলেন, “এখানে বন্দুকের আওয়াজটা পাড়ার লোকেদের গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। খুন প্রায়ই হয়। জখম রোজ হচ্ছেন কেউ না কেউ। ড্রাগের প্রকোপ এখনও আছে। ম্যাক্সিকোর মত না হলেও এখানেও গ্যাংস্টারে গ্যাংস্টারে ফাইট অতি রোমহর্ষক দৃশ্য যা বাড়ির জানাল দিয়ে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখেন ডিওডোরোর মানুষ। আর কোনও আন্দোলনের গন্ধ পেলে। কোনও আপাত যুক্তিগ্রাহ্য কোনও কারণ পেলে তো আর কোনও কথাই নেই, ব্রাজিলের রাস্তায় আগুন ঝরবে। সবসময় সেই ছুতোই খুঁজছে একদল দুষ্কৃতি।” এলজা জানালেন কয়েক হাজার বস্তি রিওর আঁচলেই লুকোনো রয়েছে। এই বস্তিগুলোই যেকোনও মুহূর্তে ভিসুভিয়াসের মতো আগুন ঢেকুর তুলবে। সেই আতঙ্কেই শান্তি প্রিয় মানুষ দিন কাটান। পাশাপাশি পুলিশের এনকাউন্টারের একটা ভয় সব সময় বস্তি গুলোয় ঘুরে বেড়ায়। কমপ্লেক্সো দো অ্যালেমাও বা কমপ্লেক্সো দা মারের মতো ফ্যাভেলা গুলোতে পুলিশ পোস্টিং দিন কে দিন আতঙ্কিত করে তুলছে। ওই রকম একটি ফ্যাভেলায় থাকেন ইসমায়েল ট্রাবুকো। এলজার সঙ্গেই ভারত দেখতে এসেছেন ব্রাজিলের গায়ক ইসমায়েল। বলছিলেন ড্রাগ ব়্যাকেট ধরার নামে যাকে তাকে দিনে দুপুরে গুলি করে দেয় পুলিশ। উল্টে পুলিশও গুলি খায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলতে কিচ্ছু নেই। গোটাটাই ঢক্কা নিনাদ সার। এক সময় ব্রাজিলের এক তরুণ ব্যবসায়ী ধনকুবেরও বলতে পারেন, আইকে বাতিস্তা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করতে পঞ্চাশ লক্ষ ইউরো দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলন। কিন্তু ২০১৩ সালে দেখা গেল সেই ধনকুবের নিজেই দেউলিয়া হয়ে গেলেন। আর কেউ নিরাপত্তার মত অলাভ দায়ক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে চায়নি। ফলে গোটাটাই মান্ধাতা আমলের অস্ত্র শস্ত্রে চলছে। যখন আপনার কাছে কেবল হাতুড়ি আছে তখন দুনিয়ার সমস্ত সমস্যাকেই পেরেক উঠে আছে মনে হবে। সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই বেহাল দশায় পুলিশের তরুণ অফিসারদের হাতে পিস্তল তুলে দেওয়া সহজ হয়েছে। তাই মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। শুধু মাত্র রাজধানী শহর রিওয় হানাহানির ঘটনা বেড়েছে ২৬ শতাংশ। খুনের ঘটনা বেড়েছে গত বছরের তুলনায় এবছর ২৩ শতাংশ। তার মধ্যে অলিম্পিকের জন্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে প্রয়োজনীয় বাড়তি গুরুত্ব দরকার তা করার ক্ষমতা নেই সরকারের। সেটা স্পষ্ট করে জানিয়েও দিয়েছেন রিওর আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক সেনেটর হোশে বেলতামে। তাঁর মতে অলিম্পিকের জন্যে নতুন করে পুলিশ ফোর্স বাড়ানো সম্ভব নয়। অফিসারদের বেতন বাড়ানো হবে না। বাড়তি কাজ করার জন্যে ওভার টাইমের কথা ভুলে যান। পাশাপাশি বস্তি এলাকা গুলি থেকে নিরাপত্তা রক্ষীর পিকেটিংও তুলে নেওয়া হবে। ফলে অসামাজিক কার্যকলাপে দেদার ছাড় থাকবে সেটা অনুমান করাই যায়।

image


এ থেকে ছবিটা স্পষ্ট। ব্রাজিলের সমাজব্যবস্থা খাদের ধারে এসে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনীতির হালও সঙ্গিন। কিন্তু বছর পাঁচেক আগেও ছবিটা এরকম ছিল না। BRIC-এর দেশ ব্রাজিল তখন উঠছে। ২০১১ সালে লুইস ইনাসিও লুলা ডি সিলভা যখন প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেন তখন ব্রাজিলের দুর্দান্ত স্পেল। ল্যাটিন আমেরিকার অন্য দেশগুলির মধ্যে ব্রাজিলেরই তখন সোনালি দিন। আর এই পাঁচ বছরে হাল বেহাল হয়ে গিয়েছে। বলছিলেন ট্রাবুকো। কোনও রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়াই ট্রাবুকো কথা বলেন। পড়াশুনো করেছেন অর্থনীতি নিয়ে। ভারতের সেলফ হেল্প গ্রুপগুলি কীভাবে উন্নয়নের কাজ করে সেটা নিজে চোখে দেখতেই আগামী তিন মাস ভারতের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াবেন ট্রাবুকো। শিখতে চান ভারতীয় লোকগীতি। সদর স্ট্রিটের সস্তার একটি চায়ের দোকানে আলাপ হল। আবদার করছিলেন একটি বাউল গান যেন আমি গেয়ে শোনাই। আমি গাইতে পারি না শুনে আকাশ থেকে পড়লেন ট্রাবুকো। কারণ ওর দেশে নাকি সকলেই গাইতে পারে গান। কথায় কথায় নেচে দিতে পারেন। ওরা বলেন সাম্বা নো পে। মানে পায়ের সাম্বা। উদ্দাম যৌবনের তালে তালে পা মেলানোর মানে যৌবনকে স্বাগত। এবং জীবনকে অভিবাদন।

ট্রাবুকো বলছিলেন, সাম্বার মতই দোদুল্যমান আর আকর্ষক আমাদের ভবিতব্য। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডিলমা রুসেফের প্রতি বিন্দু বিসর্গ প্রেম নেই ট্রাবুকোর। এলজাও মনে করেন চূড়ান্ত ভাবে ব্যর্থ ডিলমা। লুলার নীতিতে ভরসা থাকলেও এলজা বলছেন, দেশ চালানোর ক্ষমতাই নেই ডিলমার। ফলে তাঁর সাসপেনশন এবং ইমপিচমেন্টের বিষয় নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন ওরা কেউই।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags