সংস্করণ
Bangla

ঘরে ঘরে শৌচালয়-জল! লাগে টাকা দেয় ‘গার্ডিয়ান’

1st Sep 2015
Add to
Shares
6
Comments
Share This
Add to
Shares
6
Comments
Share
image


কবি অডেন লিখেছিলেন, ‘ভালোবাসা ছাড়া বাঁচা যায়, জল ছাড়া নয়’। এর সঙ্গে আরও খানিকটা জুড়ে বলা যায়, বেঁচে থাকার জন্য চাই জল, আর অনেক দিন বেঁচে থাকার জন্য চাই পরিশ্রুত জল। এই উপলব্ধিই স্বাস্থ্যকর এবং অস্বস্থ্যকর জলের মধ্যে পার্থক্যের রেখা টেনে দেয়। 

আপাত সরল ধারনাটা দিনে দিনে কঠিন হয়ে পড়ছে জনবহুল এবং আধুনিক বাড়িঘরে চাহিদা মতো জলের ব্যবস্থা করতে গিয়ে। অজ্ঞানতা এবং দুর্বল আর্থিক সামর্থ্যের জন্য গ্রামের দিকে বিষয়টি রীতিমতো সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পরিশ্রুত জল, শৌচাগার এইসব কিছু ভাবিয়ে তুলেছিল পল সাথিয়ানাথানকে। সেই ভাবনা থেকে জন্ম গার্ডিয়ানের।

ইচ্ছে থাকলেও আর্থিক সঙ্গতির কারণে যারা বাড়িতে জলের লাইন আনাতে পারছেন না বা শৌচাগার তৈরি করতে পারছেন না, তাদের জন্য মুশকিল আসান গার্ডিয়ান। ক্ষুদ্র লগ্নিকারী এই অলাভজনক আর্থিক সংস্থা গৃহস্থকে জলের লাইন আনা অথবা শৈচাগার তৈরির জন্য টাকা ধার দেয়।

image


২০ বছর সরকারি চাকরি এবং ৫ বছর বিভিন্ন এনজিওতে কাজ করে ক্ষুদ্রঋণ সংক্রান্ত বিষয়ে ভালই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন দক্ষিণের এই উদ্যোক্তা। দেশজুড়ে যে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে গার্ডিয়ানের জন্ম দেন তিনি।

‘ভারতের প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র লগ্নিকারী আর্থিক সংস্থাগুলির লোনের কনসেপ্ট ছোট দোকান, সবজি বিক্রেতা, হস্তশিল্প, দুধেল পশু কেনা, চাষবাস, ব্যক্তিগত প্রয়োজন এইসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদের আকাশ ছোঁয়া সুদের কারণে নিম্নবিত্তদের পক্ষে সেই ঋণের ভার বয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না’। ফলে, পল বলেন, ‘যারা এই সংস্থাগুলির সঙ্গে লেনদেন করেন, তারা আরও গরিব হওয়ার পথে পা বাড়ান’। বাস্তবিক পক্ষে, বড় অংকের সুদের বোঝা জমতে জমতে ঋণের অংক আরও বেড়ে যায়। টাকা শোধে ঘটি বাটি হারিয়ে ভিটেহারা হতে হয় কত মানুষকে।

‘যদিও ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে অন্ধ্রপ্রদেশে সঙ্কট তৈরি হওয়ার পর, ঋণের সুদে লাগাম পরানো এবং ক্রেডিট ব্যুরো রিপোর্টের মাধ্যমে একাধিক লোন নেওয়াকে ঠেকানোর মতো কিছু পদক্ষেপ করেছে সরকার’, পল বলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ক্ষুদ্রঋণে কোনও সমস্যা নেই, যে পদ্ধতিতে বিষয়টিকে ভাবা হয়েছে এবং যেভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, সমস্যা সেখানেই। 

‘এখনও পর্য়ন্ত কোনও ভারতীয় সংস্থা নিম্নবিত্তদের জন্য পানীয় জলের লাইন এবং শৌচাগার নির্মান করতে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করতে এগিয়ে আসেনি। বেশির ভাগই লাভের গুড় খেতে ব্যস্ত। আমি যে ক্ষেত্রটির কথা ভাবছি, আসলে এই ধরণের ঋণ খুব একটা বাস্তবোচিত নয়, কেন না ঋণের টাকা তোলা খুব একটা সহজ নয়’,বলেন পল। সম্প্রতি কিছু সংস্থা তাদের ব্যবসারই অংশ হিসেবে জলের লাইন এবং শৌচাগার নির্মানের জন্য লোনের ব্যবস্থা রেখেছে। গার্ডিয়ান অবশ্য একমাত্র ক্ষুদ্র লগ্লিকারী সংস্থা যারা শুধুমাত্র জলের লাইন এবং শৌচাগার নির্মাণের জন্য লোন দেয়। পল মনে করিয়ে দেন, এধরণের সংস্থা বিশ্বে প্রথম।

গার্ডিয়ানে দুই সদস্যের অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপক দল, যাতে রয়েছন পল সাথিয়ানাথান নিজে এবং এম সেন্থিকুমার। তাছাড়া, ৬ সদস্যের পরিচালন টিম রয়েছে যারা সব রকম কাজেই হাত লাগান। তামিলনাড়ুর ৬টি জেলার (ট্রিচি, পুডুকোট্টাই, নামাক্কাল, পিরামব্লার, কারুর এবং সালেম) ২২টি ব্লকে গার্ডিয়ান কাজ করছে। প্রত্যেক শাখার একজন করে ম্যানেজার, একজন কম্পিউটার অপারেটর এবং পাঁচজন ক্রেডিট অফিসার আছেন।

image


মূলত ৬টি ক্ষেত্রে গার্ডিয়ান লোন দেয়। এগুলি হল-নতুন শৌচাগার নির্মান, নতুন জলের লাইন নেওয়া, বাড়ির পুরনো পাইপলাইন বা শৌচাগার সংস্কার, জল শুদ্ধিকরণের ব্যবস্থা করা, বৃষ্টির জল চাষে ব্যবহারের ব্যবস্থা এবং বায়ো-প্ল্যান্ট তৈরি। প্রত্যেক ক্ষেত্রে আলাদা লোন স্কিম ‌যা ৫০০০ থেকে ১৪০০০ টাকার মধ্যে। ১৮ মাসের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে।

সব ক্ষেত্রেই বছরে মাত্র ২১ শতাংশ হারে সুদ। এবং ঋণের নথির জন্য ১ শতাংশ প্রসেসিং ফি নেওয়া হয়। এধরণের ঋণের ক্ষেত্রে অগ্রদূত হিসেবে গার্ডিয়ানকে অনেক চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন হতে হয়। ‘লোন বরাদ্দ বাড়াতে আর্থিক সংস্থাগুলি এখনও উদাসীন। ভারতের ক্ষুদ্রঋণ নেটওয়ার্ককে জায়গা ধরতে রিজার্ভ ব্যঙ্ক অব ইন্ডিয়া, নাভার্ড এর মতো নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুঝতে হয়েছে’, ব্যাখ্যা দেন পল। ‘তার উপর মানুষকে প্রতিদিনের স্বাস্থ্য বিধি নিয়ে সচেতন করা সহজ নয়। এমন অনেকে আছেন যারা কোনও দিন শৌচালয় ব্যবহার করেননি। এই অভ্যেস যে জীবন বদলে দিতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর, তার উপর খুব বেশি টাকা খরচও হবে না-এই সব বোঝাতে তাদের সংস্কৃতিতে বদল আনতে হবে’, বলে চলেন দক্ষিণী উদ্যোক্তা।

এত ঝক্কিতেও পিছু হটার নয় গার্ডিয়ান।আরও যাতে বেশি জায়গায় পৌঁছে যাওয়া যায় এবং আরও অনেক বেশি সুযোগ তৈরি হয়,তার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর আবেদনে সুর মিলিয়ে গার্ডিয়ানও লক্ষ্য স্থির করেছে, ২০২০ র মধ্যে তামিলনাড়ুর এক লক্ষ বাড়িতে লোনের মাধ্যমে শৌচালয়ের সুবিধা পৌঁছে দেবে। ‘আরও ১০টি জেলায় ৫টি শাখা খুলতে চাই আমরা। স্থানীয়দের মধ্যে যারা অন্যকে উৎসাহিত করতে পারেন, সচেতনতা তৈরি করেন, গ্রামে নানা অলোচনা সভায় থাকেন, জন প্রতিনিধিদের ভালো যোগাযোগ তার ওপর ভিত্তি করে নিয়োগ করি। শৌচাগারের জন্য লোনের প্রচার করে চাহিদা বাড়াতে চাই। বাড়িতে শৌচাগার তৈরি এবং জলের লাইন নিয়ে্ দেওয়ার জন্য গার্ডিয়ানের কর্মীরা গ্রাহক, স্থানীয় রাজমিস্ত্রি এবং পঞ্চায়েত প্রধানের সঙ্গে, যোগাযোগ রাখবেন। পাশাপাশি নিয়মিতভাবে সেগুলির ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণের দিকেও নজর রাখবেন’, শেষ করলেন পল। গার্ডিয়ানের দক্ষ টিম জানে কীভাবে স্বপ্নকে তাড়া করে লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রত্যেকে জানেন,অগ্রদূত হওয়ার এটাই মজা, প্রতিটা মুহূর্তের অভিজ্ঞতা শিক্ষনীয়। কী জানা হয়ে গেল তা নয়, কী এখনও শেখার বাকি, আদতে সবচেয়ে বড় বদল ঘটাতে পারে সেটাই।

Add to
Shares
6
Comments
Share This
Add to
Shares
6
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags