সংস্করণ
Bangla

ঝুমুরকে আঁকড়ে ধরে আশীর্বাদের গান

tiasa biswas
23rd Nov 2015
Add to
Shares
10
Comments
Share This
Add to
Shares
10
Comments
Share

ঝাড়খণ্ড আর তার গা ঘেঁষা পশ্চিমবঙ্গের একটা অংশ। ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া, সিংভূম, ঘাটশিলা, ধানবাদ আর পশ্চিমবঙ্গে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূমের সঙ্গে বর্ধমান জেলার পশ্চিমভাগের বেশ কিছুটা অঞ্চলের পরিচিতি মালভূম এলাকা বলে। অনুর্বর, রুক্ষ জমি, উঁচু উঁচু টিলা, পাহাড় আর জঙ্গল। মাটির ওপরটা যতটাই অনুর্বর, নীচে আবার সম্পদের খনি-কয়লা, মিথেন গ্যাস আরও কত কী। দামোদর নদীর আববাহিকা এই বিস্তীর্ণ এলাকায় ঝুমুরগান দারুণ জনপ্রিয় ছিল। গ্রামেগঞ্জে এমননকী ছোটছোট শহরেও উৎসবে-অনুষ্ঠানে মেলায় আসত ঝুমুরগানের দল। গ্রামের মানুষের জমায়েতে, হাটে-বাজারে ভেসে বেড়াত তারই সুর। সেই সময়টা আজ আর নেই। দিন পালটেছে, বদলে গিয়েছে মানুষের চাহিদা আর রুচি। ঝুমুরগানের শিল্পীরা অনেকেই এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে। এমন দুর্দিনেও ঝুমুরগানকে ছেড়ে যাননি আশীর্বাদ। আশীর্বাদ কর্মকার। প্রখ্যাত ঝুমুর গায়ক ও রচয়িতা চামু কর্মকারের নাতি। দাদুর হাত ধরে যে গানে তালিম, যাকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠা, রুটি-রুজি, সেই ঝুমুরগানকে আবার স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনার ব্রত নিয়েছেন চামুর এই সুযোগ্য বংশধর।

image


আশীর্বাদের বাস আসানসোল শহর থেকে খানিকটা দূরে বারাবনি থানার গৌরন্ডি এলাকার মীর্জাপুর গ্রামে। ঝুমুরগান নিয়েই দিন কাটে বৃদ্ধর। দাদুর লেখা গানের খাতা, পুরনো পেপার কাটিং বুকে আঁকড়ে ঘাঁটি গেড়েছেন শহর থেকে দূরে। আশীর্বাদ বলেন, ‘ঝুমুর গানের সমঝদার শ্রোতা আর কদর করার লোকের সংখ্য কমে গিয়েছে ঠিকই, তবে হারিয়ে যায়নি’। এটা ঠিক, আসানসোল শিল্পাঞ্চলে এই গান আর কেউ শুনতে চায় না। এটাই আক্ষেপ প্রবীন ঝুমুরশিল্পীর। আশীর্বাদের গলায় হতাশা, ‘যেখানে চামু কর্মকারের জন্ম, সেখানকার মানুষেরই আজ ঝুমুরের প্রতি কোনও আগ্রহ নেই। অথচ বাইরে এর কদর রয়েছে অনেকখানি’।

ঝুমুরগানের অনুষ্ঠান এখনও হয় ঝাড়খণ্ড, বিহারে। ডাক পড়ে অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে আশীর্বাদ আর তাঁর দলের। প্রতিবেশী রাজ্যে গিয়ে সেখানকার শ্রোতাদের মন মাতিয়ে আসেন। ছবিটা একেবারে উলটো নিজের এলাকায়। ‘অথচ কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না। পুরুলিয়া-বাঁকুড়া তো বটেই, আসানসোল শিল্পাঞ্চলের গ্রামীণ জীবনেও ঝুমুর গানের একটা জায়গা সবসময় ছিল। আজ সেটা দূরবীণ দিয়ে খুঁজলেও মিলবে না’, বলার সময় চোখে জলের রেখা চিকচিক করে ওঠে আশীর্বাদের। এই অবস্থাতেও ঝুমুরগানকে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে চলেছেন । একচিলতে ঘরে দিনরাত চলে সাধনা। অনেক দূর থেকেও শোনা যায় গানে গানে আশীর্বাদের আকুল আর্তি।

image


ঝুমুর গান কিন্তু নিছক বিনোদন নয়। গ্রামীণ জনজীবনের নানা সমস্যা, অনুষঙ্গ, প্রতিবাদ উঠে আসে মাটির সুর আর আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় এই গানের কথার মাধ্যমে। ইংরেজ আমলে ঝুমুর গানে প্রতিবাদের কথা লিখে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছিল চামু কর্মকারকে। চামু ছিল জামতাড়া রাজার আশ্রিত। সেকালে রাজারা, বড় বড় জমিদাররা কবি, শিল্পী, গায়কদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। একালে তো রাজা নেই। আছে সরকার। সেই সরকার চালায় কোনও না কোনও দল। দলীয় রাজনীতি অনেক সময় অনেক কিছুর মাপকাঠি ঠিক করে দেয়। সেই স্রোতে ভেসে যান অভাবী শিল্পীরা। বর্তমান রাজ্য সরকার বিভিন্ন জেলার লোকশিল্পীদের জন্য অনুদান, আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছে বটে। তাতে আর কতটাই বা অভাব মেটে।

থাক অভাব। তবু সংষ্কৃতির একটা ধারা হারিয়ে যাবে মানতে পারেন না আশীর্বাদ। তাই যত কষ্টই হোক না কেন ঝুমুর গানে জীবনের কথা শুনিয়ে যাবেন। উৎসাহ দেবেন পরবর্তী প্রজন্মকে। কারণ, ঝুমুর শুধু গান নয়, ঝুমুর গ্রামবাংলার মানুষের প্রতিচ্ছবি। সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর একটু বিনোদন। আনন্দ, বেদনা, সুখ, দুখ, প্রতিবাদের জমাট বুনন মালভূমের ঝুমুর।

Add to
Shares
10
Comments
Share This
Add to
Shares
10
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags