সংস্করণ
Bangla

নীতি বিসর্জন দিয়ে নয়, ন্যায়ের পথেই সফল উদ্যোক্তা সচিন

YS Bengali
28th Nov 2015
Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share

আট বছর আগের কথা মনে করে এখন আর লজ্জা পান না সচিন ভরদ্বাজ। সেই সময় প্রায় দু বছর দেয়াশলাই বাক্সের মতো ঘরে থাকতেন, সেটাই ছিল অফিস। ব্যাঙ্গালুরু থেকে বাবা মা-কে এসে কদিন পুনেতে থাকতে বলবেন, তাও লজ্জা করত সচিনের। এটা সেই সময়ের কথা যখন, নিজের ফুড-ডেলিভারি স্টার্টআপ সবে শহরে এক আধটু নাম ছড়াতে শুরু করেছে। টাকার অভাব প্রতিদিনের অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। যত পুরস্কার পেয়েছিলেন একে একে সব বিক্রি করে দেন। বাড়ির ভাড়া দিতে শেষ পর্যন্ত নিজের হিরো হোন্ডা স্প্লেন্ডারও মাত্র ১৩ হাজার টাকায় বেচে দেন...সেই দিনগুলিই যেন শিক্ষা দিয়েছিল সচিনকে। স্প্লেন্ডার বেচে ভাড়া দেওয়ার দিন আর নেই। সচিন এখন বিএমডব্লিউর মালিক। এক মাসের শিশুপুত্রের গর্বিত বাবা। এবার পা বাড়াচ্ছেন নতুন ভেঞ্চার স্মিঙ্কের দিকে।

image


গত কয়েক বছরে সচিনের আশেপাশের ছবিটা একেবারে পালটে গিয়েছে। গতবছর নভেম্বরে তাঁর ফুড স্টার্টআপ টেস্টিখানা প্রায় ১২০ কোটি টাকায় অধিগগ্রহণ করে নেয় ফুডপান্ডা। অধিগ্রহণের কথাবার্তা শুরু হয় অগস্টে। শিগগিরই সব ঠিকঠাকও হয়ে যায়। কেউ কোনওরকম নাক গলানোর আগেই ডিল পাক্কা। বার্লিনের ফুড ডেলিভারি স্টার্টআপ ডেলিভারি হিরো ২০১১ য় ৫০লক্ষ ডলার বিনিয়োগ করে টেস্টিখানার বেশিরভাগ শেয়ার নিয়ে নেয়। তবে ফুডপান্ডার সঙ্গে নতুন ডিলে তারা কোনও আপত্তি জানায়নি। সচিন এবং শেলডন চূড়ান্ত ডিল নিয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিলেন। কয়েকটা এনজেল ইনভেস্টরকে কিছু টাকাও দিতে পেরেছিলেন। আর বড় অংকের পুরস্কার মিলেছিল সেই সব টিম সদস্যদের যারা প্রথম থেকে টেস্টিখানার লড়াইয়ে ছিলেন।

কিন্তু অধিগ্রহণের কিছুদিন পর থেকে সমস্যা শুরু হয়। যেভাবে সব চলবে মনে হচ্ছিল সেভাবে চলছিল না। দুটি সংস্থার ম্যানেজমেন্টের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ঠিক কোথায় সমস্যা হচ্ছিল সেটা নিয়ে আর তেমন কিছু বলতে চাইলেন না সচিন। শুধু বললেন, গত সাত বছর ধরে টেস্টিখানার ১০০ জন কর্মী যেভাবে কাজ করছিলেন তার চাইতে ফুডপান্ডার কাজের পরিবেশ আর পদ্ধতিতে আকাশ-পাতাল তফাৎ। ফুডপান্ডা কীভাবে ব্যবসা সামলায় তা নিয়ে কোনও রকম মন্তব্যে নারাজ সচিন। তাঁর সংযোজন, ‘শুধু আমার কাজের ধরনই সঠিক এটা ভাবা সমিচীন হবে না’। এইভাবে বেশিদিন চালানো গেল না। এই বছরের গোড়ায় মার্চ নাগাদ সচিন এবং টেস্টিখানার ম্যনেজমেন্ট টিম ফুডপান্ডা থেকে সরে আসেন। শোনা যায়, ফাউন্ডার টিম কোটি কোটি টাকা ছেড়ে দেয়, যা ফুডপান্ডার শেয়ারে আটকে ছিল। ‘আমাদের কাছে ব্যবসা গড়ার ক্ষেত্রে নীতিটাই ছিল মূল, যার সঙ্গে কোনওভাবেই আপোষের রাস্তায় হাঁটতে রাজি ছিলাম না। ধীরে এগোব তবু, অন্যায়ের রাস্তায় যাব না। আমি তেমন মানুষ যে কিনা জীবনে পুলিশকেও কোনও দিন ঘুষ দিইনি। নিজের ভুলের জন্য একবার প্রায় ৬ মাসের জন্য আমার লাইসেন্স সাসপেন্ড হয়ে গিয়েছিল। তবু ঘুষ দিয়ে সেই সমস্যা মেটানোর কথা ভাবিনি’, বলেন সচিন। ফুডপান্ডা ছেড়ে বেরিয়ে কী পেয়েছিলেন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার যেটুকু আছে তাই নিয়ে আমি খুশি। বেশি চাই না। যে যে কর্মীর ক্ষতি হয়েছে আমাদের (শেলডন এবং সচিন)নিজের পকেট থেকে দিয়ে পুষিয়ে দিয়েছি’।

ফুডপান্ডার সঙ্গে সম্পর্ক চুকে যাওয়ার পর সচিনের সামনে এবার আরও একটা মাইলস্টোন। বাবা হবেন। মনে পড়ে সেই সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত আলট্রাসনোগ্রাফি আর গাইনেকোলজিস্টের কাছে লাইন দিতে দিতে। ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা অপেক্ষায় থেকেছি। যদি অভিজ্ঞতা থেকে থাকে তাহলে জানবেন এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা। ভাবতে শুরু করলাম এই অপেক্ষার সময়টা কীভাবে কমানো যায়’, বলেন সচিন। বার বার চেষ্টা করেও সচিন এবং তাঁর স্ত্রী অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতেন না বেশিরভাগ সময়। ‘কেন এইসব জায়গায় লাইন ঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। হতে পারে প্রযুক্তি এই কাজ ঠিকভাবে করে দিতে পারে’, ভাবতে থাকেন সচিন। পুরনো সহযোদ্ধা শেলডন এবং টেস্টিখানার চিফ সেলস অফিসার সন্তোষকে নিয়ে স্মিঙ্ক লঞ্চ করেন সচিন। পুনের আটটি ক্লিনিকের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে নতুন সংস্থা।

স্মিঙ্ক আসলে একটি অ্যাপ যা নানা সংস্থাকে গ্রাহক সামলানোয় সাহায্য করে। অপেক্ষারত গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেয় কখন কার টার্ম আসছে কিংবা যা অর্ডার হয়েছিল সেটা ডেলিভারির জন্য তৈরি কিনা। লাইনের কী অবস্থা লাইভ স্টেটাস জানায় এই অ্যাপ। দূরদূরান্ত থেকে ডাক্তারদের সঙ্গে মাসে প্রায় হাজার খানেক অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দেয়। কীভাবে ইন্টারভিউ ফেস করবে সে বিষয়ে সাহায্যের জন্য একটা এইচআর ফার্মও খোলার চেষ্টা চলছে। সচিন বলেন, ‘স্মিঙ্কের সুযোগ অনেক। হাসপাতালের লাইন থেকে চাকরির ইন্টারভিউ, সরকারি চাকরি যেমন আরটিও এবং পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্রগুলি থেক গাড়ি বাইক সার্ভিস স্টেশনেও স্মিঙ্কের অ্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে’। ভেন্ডারদের ক্ষেত্রে গ্রাহক পরিষেবার প্রক্রিয়া সামলাতে এই অ্যাপ ব্যবহার করা হয়। গ্রাহকের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে মোটামুটি মাসে ২০০০ টাকা করে চার্জ নেওয়া হয় অ্যাপের জন্য। সারা বিশ্বে অনেক স্টার্টআপই কিউ ম্যানেজমেন্টের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনওটা হাসপাতালের লাইনের জন্য, কোনওটা রেস্তোরাঁর লাইনের জন্য। মাত্র দুটি সংস্থা MyTime এবং Q-Less নানা ক্ষেত্রের লাইন সামলায়।

‘এই পর্যন্ত অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে আমাকে, শিখেছিও অনেক। আমি এবং আমার টিম টেস্টিখানার মতো সফল ব্যবসা করে খুশি। এবার স্মিঙ্ককেও সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে দিতে চাই’, আশাবাদী সচিন। যেতে যেতে বুঝিয়ে দিয়ে যান বাধা এলেও থামানো যাবে না তরুণ উদ্যোক্তাকে। নতুন নতুন আইডিয়া নতুন নতুন উদ্যোগ চলতেই থাকবে।

লেখক-অপর্ণা ঘোষ

অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস

Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags