সংস্করণ
Bangla

ছোট শহরে বড় ভাবনার ‘জয়’যাত্রা

ছবি তোলা মানেই সিনারির মাঝে আপনি। রং, চাকচিক্যের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া। কিংবা বিজ্ঞাপন বললে সুলভে পাওয়া যায়, পরীক্ষা প্রার্থনীয় এই জাতীয় শব্দবন্ধ। ক্যানিং-এর মতো মফস্বল শহরে গজিয়ে ওঠা স্টুডিও বা প্রকাশনা সংস্থাগুলো এই লক্ষ্মণরেখায বরাবর আটকে থাকে। ছবি ও বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় বদ্ধ এই অবস্থাকে নিঃশব্দে বদলানোর কাজটা শুরু করলেন মাস কমিউনিকেশনের এক ছাত্র। জয়দীপ চৌধুরী। তাঁর স্টার্ট আপ ‘দ্য ফোকাস’-এর দৌলতে ছবি, বিজ্ঞাপনের ভাষাই বদলে গিয়েছে সুন্দরবনের প্রবেশদারে। ‘ক্যান্ডিড ওয়েডিং’ আর ভারী শব্দ নয় এখানে। ফোটগ্রাফি ও বিজ্ঞাপনের নতুন দিক নিয়ে ক্যানিং থেকে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন জয়দীপ।

28th Feb 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

মা-বাবা শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। একমাত্র ছেলে সেই পথেই হাঁটবে এমন স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল চৌধুরী দম্পতির। তার জন্য ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে জয়দীপের পড়াশোনা, ডব্লুবিসিএসের প্রস্তুতি। সবই চলছিল তরতরিয়ে। সিভিল সার্ভিসের ঐচ্ছিক বিষয় থেকে লিঙ্গুয়েস্টিকস, পিআর সরিয়ে নেওয়ার পরই তাতে তাল কাটে। পছন্দের বিষয়গুলি বাদ যাওয়ায় জয় ঠিক করেন এমন কিছু করতে হবে যাতে পেটও ভরবে, মনের ইচ্ছেও পূরণ হবে। সেই ভাবনার খোঁজে ফটোগ্রাফি নিয়ে শুরু হল পড়াশোনা, সমান তালে অনুশীলন। পাশাপাশি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস কমিউনিশন নিয়ে পড়াশোনা। এভাবেই অ্যাডভার্টাইজিং আর ফটোগ্রাফি একসঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে শুরু করে। এই অনিশ্চয়তার পথে বাবার একেবারেই সায় ছিল না। মা অবশ্য পাশে ছিলেন। এই দোদুল্যমানতার মধ্যেই একদিন মৃণাল সেনের সঙ্গে দেখা করেন স্বপ্নসন্ধানী। খনিকের সাক্ষাত। জয়ের সঙ্গে থাকা অ্যালবাম উল্টোপাল্টে দেখার পর বাড়ির দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলেন পরিচালক। বিদায়ের সময় জয়কে বলেছিলেন, কোনওদিন চাকরির চেষ্টা কোরো না। নিজের ব্র্যান্ড তৈরিতে মন দাও। কিংবন্তীর কয়েকটা লাইন এমনভাবে জয়ের হৃদয়ে ছুঁয়ে যায় যে, ঠিক করে ফেলেন নিজেকে চেনাতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মৃণাল সেনের কথাগুলোই পরবর্তীতে তাঁর কাছে হয়ে ওঠে জীবনবেদের মতো।

image


image


চাকরির পথ ভুলে অন্য সরণি খোঁজার সেই শুরু জয়ের। সময়টা ২০০৫। আত্মপ্রকাশ করল ‘দ্য ফোকাস’। তখন ক্যানিং মহকুমায় ফটোগ্রাফি বলতে গতে বাঁধা স্টুডিও, বিজ্ঞাপন মানে চেনা গণ্ডীর মধ্যে কিছু লাইন, ছবি। বিশাল ফাঁকটা প্রথমেই ধরেছিলেন জয়। ফ্রিলান্সিং দিয়ে শুরু করলেন। বছর দুয়েকের মধ্যে অফিস তৈরি করে গতি, পরিধি বাড়ানো। ক্রেতাদের জয় বোঝাতে থাকেন বিজ্ঞাপনের কপি ও ছবির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। ভাষা এমন হবে যা ভাবনার খোরাক দেবে। লেখা হবে সংক্ষেপে, শানিত। নিজেকে সবথেকে সুন্দর দেখতে চাওয়াই ছবি তোলার লক্ষ্য। তার জন্য ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে জব্বর রং-এর ভিড় নয়, স্নিগ্ধতাই আসল কথা। দ্বিধা নিয়ে যারা এগিয়ে এসেছিলেন তারা দ্রুত বুঝতে পারেন কোয়ালিটির সঙ্গে একেবারেই কম্প্রোমাইজ করে না ‘দ্য ফোকাস’।

গুয়াহাটি, মণিপুর থেকে উত্তর পূর্বের একটা বড় অংশ। টাটানগর থেকে পটনা। জয়ের হাতযশ পৌঁছে গিয়েছে রাজ্যে ছাড়িয়ে বহু দূরে। কোথাও ফ্লেক্স, কোথাও ব্যানার, কোথাও ছবি। ই এম বাইপাসের ধারে মুকুন্দপুর এলাকায় জয়ের তৈরি বিজ্ঞাপন জানায় ‘দক্ষিণ ২৪ পরগনায়‌’ আপনি সুরক্ষি‌ত। এক বিমা এজেন্টের বিজ্ঞাপনে এমন ‘ক্যাচলাইন’ এক কথায় অনেকগুলো বার্তা দিয়েছে। সমান্তরাল শব্দের বাইরে যেমন নতুন ধারা এনেছেন জয়, তেমনই বিয়ের ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে তাঁর আধুনিক ভাবনার সঙ্গে ধীরে ধীরে সড়গড় হচ্ছে এই প্রান্তিক শহর। ‘ক্যান্ডিড ওয়েডিং’-এর সঙ্গে আর তেমন দূরত্ব নেই দ্বীপ এলাকার বাসিন্দাদের। ভাল মানের লোভে বিয়ের ছবি, ভিডিওগ্রাফির জন্য ৩০ হাজার টাকা খরচ করতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না অনেকেই। বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি ছবি নিয়েও বেশ খুঁতখুঁতে জয়। পারফেকশন হওয়ার স্বীকৃতিও মিলেছে।‘বেটার ফোটোগ্রাফি’-র মতো ম্যাগাজিনে দু’বার জায়গা পেয়েছে এই আলোকচিত্রীর ছবি। একবার কভার পেজে জায়গা পেয়েছে।‘সানন্দা’ পত্রিকাতেও তাঁর ছবি বেরিয়েছে। ফটোগ্রাফির প্রতিযোগিতা সালোনেও পুরস্কৃত হয়েছেন।

image


পেশা থেকে কয়েক দিন ডুব দিয়ে ছবির নেশায় মাঝেমধ্যে উড়নচণ্ডীর মতো বেরিয়ে পড়েন জয়। অধিকাংশ সময়েই তাঁর গন্তব্য হয় পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডি। আদিবাসীপাড়ায় তাদের মতো করে কয়েকটা দিন কাটানো। তরতাজা হয়ে ফিরে আসা। আবার কাজে ডুব। এভাবেই ক্যানিং, বাসন্তী, গোসাবা, বারুইপুরের একটা বড় অংশের মনন বদলে দিয়েছে জয়ের স্টার্ট আপ ‘দ্য ফোকাস’। কাজের ফাঁকেই ‘ফোকাস অ্যাড’ নামে একটি ম্যাগাজিনও চালান জয়। খবরের বদলে যাওয়া দিকগুলো যেখানে তুলে ধরা হয়। শুরুয়াতিতে ভালই লক্ষ্মীলাভ হলেও কর্পোরেট জগতকে এখনও সেভাবে ধরতে না পারার আক্ষেপ তাঁর রয়েছে। সেই ব্যবধান ঘোচাতে দ্রুত ওয়েবসাইট করার ইচ্ছে আছে জয়ের। যেখানে ফুটে উঠবে তাঁর স্বপ্নের ছবিগুলো।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags